অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ইউরোপ সীমা‌ন্তে`শব্দ কামা‌ন`
অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদেরকে ভিন্ন বার্তা দিতে চাইছে ইউরোপ। সীমা‌ন্তে ব‌্যবহার করা হ‌চ্ছে শব্দ কামান।

অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ইউরোপ সীমা‌ন্তে`শব্দ কামা‌ন`

ই‌মি‌গ্রেশন নিউজ ডেস্ক :
অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদেরকে ভিন্ন বার্তা দিতে চাইছে ইউরোপ। সীমা‌ন্তে ব‌্যবহার করা হ‌চ্ছে শব্দ কামান। গ্রিসের টহল পুলিশ দেশটির তুরস্ক সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলে ডিজিটাল ডিভাইস স্থাপন করেছে। গাড়ির উপরে বাসানো যস্ত্রটিই ‘শব্দ কামান’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ এর মাধ্যমে জেট ইঞ্জিনের মতো উচ্চ শব্দে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় সীমান্তরক্ষীরা।

তুরস্ক সীমান্তের দুইশ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাহারা দেওয়া যন্ত্রটি অভিবাসীদের অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশ ঠেকাতে সতর্কতার কাজে ব্যবহারের জন্য বানানো হয়েছে। তা ছাড়া, দুদেশের এভরোস নদী সংলগ্ন সীমান্তে একটি ইস্পাতের দেয়ালও স্থাপন করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ টাওয়ারগুলোতে শক্তিশালী ক্যামেরাসহ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন যন্ত্র বসানো হয়েছে। যন্ত্রগুলোর থেকে প্রাপ্ত তথ্য কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিশ্লেষণ করে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করছে এমন অভিবাসীদের অবস্থান সর্ম্পকে জানান দেবে। এ অঞ্চলের সীমান্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত পুলিশবাহিনীর প্রধান দিমোনসথেনিস কামারগিউস বার্তাসংস্থা এপিকে বলেন, “এর মাধ্যমে আমরা সীমান্তে কী হচ্ছে তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাব।”

সীমান্তে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারির কাজ করার বিষয়ে র্দীঘদিন ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছে ইইউ কর্তৃপক্ষ। ২০১৫-১৬ সালের শরণার্থী সঙ্কটের পর নিরাপত্তা বিষয়ে প্রযুক্তিখাতে গবেষণার জন্য তিন বিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে তারা। বলা হচ্ছে, তুরস্ক-গ্রীস সীমান্তে পাহারা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত এ প্রযুক্তি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগে থেকে চিহ্নিত করতে পারবে এবং তাদের প্রবেশে বাধা দেবে। সেই সাথে আছে জল ও স্থলপথে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঠেকাতে সার্চলাইট ও শব্দ কামানের ব্যবহার। এ প্রযুক্তির মূল অংশগুলো চলতি বছরের শেষে দিকে চালু করা হবে।

ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে নজরদারির এমন আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি করেছে এবং গ্রিস সীমান্তে অন্তত এক ডজন প্রজেক্টে পরীক্ষামূলকভাবে তা যাচাই করেছে।

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে চিহ্নিতকরণ যন্ত্র এবং ভার্চুয়াল বর্ডার গার্ড প্রযুক্তি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। সেই সাথে রয়েছে ড্রোন থেকে প্রাপ্ত তথ্য, যার মাধ্যমে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের বিষয়ে আগে থেকেই ত্যথ পাওয়া যাবে। হাঙ্গেরি, লাটভিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের সীমান্তেও এমন ডিজিটাল নজরদারির যন্ত্র পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা হয়েছে।

গত পাঁচ বছর ধরে ইউরোপের নীতি-নির্ধারকরা অবৈধ অভিবাসন ঠেকানোর এমন আগ্রাসী কৌশল নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ভূমধ্যসাগর সংলগ্ন ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর সাথে বিভিন্ন অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং ইইউ সীমান্তে নিয়োজিত সুরক্ষা এজেন্সি ফ্রোনটেক্সকে পুনর্গঠন সহ নানা কাজ করছে। তবে অভিবাসন বিষয়ে ইইউর এমন আঞ্চলিক নীতির কারণে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

চলতি মাসের গোড়ার দিকে এক দিনে কয়েক হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী মরক্কো থেকে স্পেনের সিউটাতে প্রবেশ করে। পরিস্থিতি ঠেকাতে সেসময় স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ সেনা মোতায়েন করে। গত বছর গ্রিস-তুরস্ক সীমান্ত কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন ঘটনা ঘটে।
এদিকে গ্রিস সরকার চাইছে ইউরোপের সমুদ্রসীমার বাইরেও ফ্রোন্টেক্সের টহলবাহিনী অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে তৎপর থাকুক। এ লক্ষ্যে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করছে দেশটি।

সীমান্ত টহল কার্যক্রমে ইতিমধ্যে যাচাই করা প্রযুক্তির সবগুলো ব্যবহার করা হবে না। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নতুন এ প্রযুক্তি অভিবাসনপ্রত্যাশীদেরকে সংঘাতপূর্ণ এলাকা ত্যাগে বাধা দেবে। আইন প্রণেতা জার্মানির পাট্রিক ব্রেয়ার এ বিষয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। তার দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার যে পরিকল্পনা ইউরোপ হাতে নিয়েছে তা জনগণকে জানাতে হবে।

তিনি সীমান্তে পাহারার এমন পদ্ধতির নৈতিক বিষয়গুলো বিশদ পর্যবেক্ষণের দাবি জানান। সেই সাথে এমন প্রযুক্তি ইইউ’র বাইরের অগণতান্ত্রিক সরকারগুলোর কাছে সম্ভাব্য বিক্রি বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান৷ বিষয়টির সমালোচনা করে ডিজিটাল রাইটস গ্রুপ ইডিআরই-এর এলা ইয়াকুবোসকা বলেন, মাইগ্রেশনের মতো জটিল ইস্যুতে নৈতিক বিবেচনার বিষয়গুলোকে দূরে রাখতে ইইউ কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাইছে।

মহামারির সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আসার সংখ্যা কমে এসেছে। গ্রিসে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংখ্যা ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে শতকরা ৭৮ ভাগ কমেছে। ২০১৯ সালে ৭৫হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী দেশটিতে এসেছিল অথচ ২০২০ সালে তাদের সংখ্যা মাত্র ১৫ হাজার ৭০০।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত ২০ বছরে অর্থাৎ ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অভিবাসীর সংখ্যা শতকরা ৮০ভাগ বেড়ে ২৭ কোটি ২০ লাখে দাঁড়িয়েছে।

(সূত্র : ইন‌ফোমাই‌গ্রেন্টস)

Leave a Reply