অভিবাসীদের জন্য বাজেট ভাবনা
অভিবাসীদের সামাজিক নিরাপত্তা বা পুনর্বাসনের জন্য তথাকথিত ঋণ সহায়তা বাদে অভ্যন্তরীন কর্মসংস্থানের জন্য কি ধরণের উদ্যোগ বা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়।

অভিবাসীদের জন্য বাজেট ভাবনা

আমিনুল হক তুষার :

বিএমইটির বিগত পাঁচ বছরের (২০১৭- ২০২১) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ হতে গড়ে প্রতি বছর ৫,৪৯,০০০ জন অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন, যার ভিতর নারী অভিবাসীকে শ্রমিক ছিল গড়ে ৭২,০০০ জন। যদিও এই বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে খুবই কম সংখ্যক শ্রমিক অভিবাসন করতে পেরেছেন বা পারছেন। তারপরেও বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুসারে বাংলাদেশ হতে শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তার উপর প্রতিবেশী দেশ ভারতে কোভিড সংক্রমণ বেড়ে যাওয়াতে, বাংলাদেশে হতে শ্রমিক অভিবাসন বা নিয়োগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেই সুযোগ অবশ্যই আমাদের কাজে লাগানো উচিত।

বর্তমানে যদি বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রায় ১ কোটির উপর কর্মী কর্মরত থাকে, তবে নির্দ্বিধায় বলা যায় তাদের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল কমপক্ষে ৩-৪ কোটি মানুষ। এই সকল স্বল্প শিক্ষিত বা আধা দক্ষ শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের জন্য আজ আমাদের ফরেন কারেন্সী রিসার্ভ পূর্বের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে এবং উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সরকার করোনা মহামারীর প্রকোপ থেকে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য নানান ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা অবশ্যই অত্যাবশকীয় ছিল- বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্থ ও বিদেশ ফেতর শ্রমিকদের জন্য। তাদের জন্য ত্রাণ ও জরুরি উপহার সামগ্রী বিতরণ, জরুরি আর্থিক সহায়তা, এমনকি ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ প্যাকেজ ও বঙ্গবন্ধু অভিবাসী বৃহৎ পরিবার ঋণ প্যাকেজ চালু করেছে সরকার। কিন্তু সমস্যা সেখানে নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে তার সুষ্ঠূ বন্টন ব্যবস্থাপনায় ও কল্যাণার্থে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়ন কৌশল। তাছাড়া সরকারি বরাদ্দের উৎস সমূহ ও একটি বিষয়, যা সম্পর্কে অভিবাসীদের ধারণা থাকা জরুরি ।

অভিবাসী শ্রমিকরা ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স নেয়ার জন্য সরকারি তহবিলে একটি নির্দিষ্ট অংকের ফী দেয় – যা কল্যাণ ফী নামে পরিচিত। যদিও বেশির ভাগ অভিবাসী শ্রমিকরা জানেন না এই টাকা তাদের কল্যাণের জন্যেই নেয়া হয়। এছাড়া অনেক অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবার অভিবাসীদের কল্যাণে সরকার জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণব্যুরো (বিএমইটি) ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এর মাধ্যমে কি কি সেবা দিয়ে থাকে সেই ব্যাপারেও বলতে গেলে খুব কম ধারণা রাখেন তারা। যদিও কিছু কিছু এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে তারা সেই সহায়তা বা সেবা গুলো পেয়ে থাকেন, কিন্তু সিংহভাগের কাছেই তা বলতে গেলে অজানা বা তারা তা প্রাপ্তির জন্য খুব একটা আগ্রহী থাকেন না।

বিগত কিছু বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেই এই সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। আমরা জানি অভিবাসী শ্রমিকরা কল্যাণ ফী হিসেবে জন প্রতি ৩,৫০০ টাকা সরকারি তহবিলে জমা দেন, হয় নিজে অথবা তাদের এজেন্সী কর্তৃক, যা বার্ষিক অভিবাসীদের সংখ্যার বিচারে বিশাল অংকের টাকা। বিএমইটি ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড- এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ২০১৫ হতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অভিবাসীদের কল্যাণ তহবিলে জমাকৃত অর্থ তাদের কল্যাণার্থে (মৃত কর্মীর মৃতদেহ আনয়ন, দাফন ও সৎকার ব্যয়, আর্থিক সহায়তা, সন্তানদের শিক্ষা বৃত্তি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত) ব্যয়কৃত অর্থের চেয়েও বেশি। সত্যিকার অর্থে অভিবাসীরা যতটা কল্যাণ ফী হিসেবে দিচ্ছেন সরকারি তহবিলে, তা দিয়েই মূলত তাদের কল্যাণ ব্যয় মিটানো হচ্ছে। আবার বিদেশে অবস্থিত মিশন সমূহের জন্য বরাদ্দ ও এই তহবিল থেকেই দেয়া হয়। পারত পক্ষে, সরকারি পৃথক কোনো বরাদ্দ (রেমিট্যান্সে ২% প্রণোদনা ব্যতীত) তাদের কল্যাণে রাখা হচ্ছে না বা তার প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে না।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণ ও করা হচ্ছে প্রবাসীদের কল্যাণ বোর্ডের টাকা থেকে, তাও ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায় প্রবাসী বা বিদেশ ফেরত কর্মীদের কোনো কাজে আসছে না বা ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া জটিল হওয়াতে তারা তা গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছে না। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে কোভিড মহামারীর কারণে প্রত্যাগত কর্মীদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার সফ্ট লোন (যার ৪০% বিতরণ ও এখন পর্যন্ত অর্জন হয়নি), ৩০০০ নারী কর্মীদের জন্য ২০,০০০ টাকার বিশেষ সহায়তা বা বঙ্গবন্ধু বৃহৎ পরিবার ঋণ তহবিল থেকে ৪ কোটি টাকা বিতরণ ইত্যাদি ছাড়া অভিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য খুব একটা উদ্যোগ গোচরে আসেনি।

২০১৭ -২০১৮ অর্থ বছর পর্যন্ত দেখা যায়, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার তহবিলের ভিতর ৩৮০ কোটি টাকাই প্রবাসী কল্যাণ ফান্ডের দেয়া। এছাড়াও দেখা যায়, প্রবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় লিগ্যাল এইড সহায়তার জন্য খুবই কম বরাদ্ধ রাখা হয় প্রতি বছর বাজেটে। উপরন্তু, যে সকল ডকুমেন্টেশন বা ফর্ম তাদের ওই সকল সেবা প্রাপ্তির জন্য পূরণ করতে হচ্ছে, তার উপরও তাদের অনেক সময় পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই বা প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে ভরসা করতে হচ্ছে অন্যদের উপর। ফলে এখানে অনুপ্রবেশ ঘটেছে একশ্রেণীর দালালদের ও লংঘিত ও বিলম্ব হচ্ছে সেবা প্রাপ্তিতে। তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে কল্যাণ সহায়তা প্রাপ্তিতে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সত্যিকার অর্থে সরকারের উদ্যোগ খুবই সীমিত। ফলে তারা বঞ্চিত হচ্ছে সরাসরি সরকারি কল্যাণ সেবা প্রাপ্তি হতে।  

জাতীয় বাজেট-এ বরাবরই প্রবাসীদের কল্যাণে স্বল্প বরাদ্দ থাকে, যাও থাকে তার সিংহভাগই ব্যয় হয় প্রশাসনিক বা অবকাঠামোগত খাতে। যেমন ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৪১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ০.১১৩ শতাংশ। এবারও কি সেই রকমই বরাদ্দ দেখতে পাবো? রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কিছু বরাদ্দ রাখা হয় অবকাঠামোগত উন্নয়নে, যেমন: উপজেলা পর্যায়ে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন, ডেমো বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ইত্যাদি। এবার যদিও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় রেমিট্যান্স প্রণোদনা ২% হতে বাড়িয়ে ৪% করার প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে, কিন্তু অভিবাসীদের সামাজিক নিরাপত্তা বা পুনর্বাসনের জন্য তথাকথিত ঋণ সহায়তা বাদে অভ্যন্তরীন কর্মসংস্থানের জন্য কি ধরণের উদ্যোগ বা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়।

কোভিড পরবর্তী বিশ্বে শ্রমিকদের অতিরিক্ত কি ধরণের মানসিক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নিতে হবে বা এই জন্য সরকার কোনো বরাদ্দ দিচ্ছেন কিনা তাও পরিষ্কার নয়। কোভিড অতিমারী পরবর্তী বিশ্বে যে ধরণের কর্মীর প্রয়োজন পড়বে (যেমন; স্বাস্থ্য কর্মী, ল্যাব টেকনিসিয়ান, মেশিনে অপারেটর, নার্স, বা হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মী ইত্যাদি) বিভিন্ন দেশে, তার জন্য কি আমার আমাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত করেছি, বা তার জন্য কি বরাদ্দ রেখেছি?

যারা দেশের অর্থনীতিতে করোনাকালীন সময়ে এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছে বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক (ব্যালান্স অফ পেমেন্ট) ভারসাম্য রক্ষার্থে, তাদের জন্য কি রাষ্ট্র কিছুই করবে না মহামারীর এই ক্রান্তি লগ্নে? তাই আজ একটি প্রশ্ন থেকেই যায়-এই সকল কল্যাণ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য কি শুধু অভিবাসীদেরই অর্থের যোগান দিতে হবে, নাকি সরকার তার রাজস্ব তহবিল থেকেও দিবে?

আমিনুল হক তুষার : শ্রম অভিবাসন বিশ্লেষক ও উন্নয়ন কর্মী

Leave a Reply