আমি যদি যাই মরিয়া : গীতিকার কুতুব আফতাব স্মরণে শোকগাঁথা
প্রয়াত গীতিকার কুতুব আফতাব

আমি যদি যাই মরিয়া : গীতিকার কুতুব আফতাব স্মরণে শোকগাঁথা

জুয়েল রাজ, লন্ডন থেকে

আমি যদি যাই মরিয়া,  আমার বন্ধুয়ারে না দেখাইয়া, দোহাই লাগে আমায় তোমরা মাটি দিওনা জীবনে মরণে আমি বন্ধুর দেওয়ানা। গত ১২ জানুয়ারী  হৃদরোগে  আক্রান্ত হয়ে  অকালে  প্রয়াত হলেন কবি, গীতিকার,  উপন্যাসিক  কুতুব আফতাব। বন্ধুর দেওয়ানা কুতুব আফতাব কে তাঁর বন্ধুরা করোনা মহামারীর কারণে শেষ বিদায়টুকো জানাতে পারেন নি। কবিরা নাকী অন্তর্যামী হয়, কুতুব আফতাব কি  তবে জানতেন তাঁর বিদায়ের এই চিত্র,  তাই তাঁর গানে আগেই বলে গেছেন বন্ধুয়ারে না দেখাইয়া দোহাই লাগে আমায় তোমরা মাটি দিও না!  তাঁর শেষ যাত্রায় শুধু তাঁর বন্ধুরা নয়, দেশ  বিদেশের  হাজার হাজার শুভাকাঙ্ক্ষী অন্তর্জালে শরিক হয়েছিলেন ।  

একই ফ্রেমে গীতিকার জাহাঙ্গীর রানা, সাংবাদিক জুয়েল রাজ ও প্রয়াত গীতিকার কুতুব আফতাব

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের  খনকারি পাড়ায় জন্ম কুতুব আফতাবের। ৯০ এর দশকে দেশ ছেড়েছিলেন তরুণ এই কবি। বসতি গড়েছিলেন লন্ডনের অদূরে সেন্টালবন্স নামক এক শহরে। কিন্তু বুকে বয়ে বেড়াতেন বাংলাদেশের নদী, জল, হাওর জোসনার সুধা গন্ধ।  স্বভাব বাউল এই গীতি কবি  রচনা করেছেন অসংখ্য লোকগান।  
আমরা যখন ভিউজ দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করার প্রতিযোগীতা করি,  সেই প্রতিযোগীতায় ও কুতুব আফতাবের গান  ৬ / ৭ মিলিয়ন ভিউ হয়েছে। কিন্তু সব চেয়ে বড় বিষয় এমন কিছু গান কুতুব আফতাব জন্ম দিয়েছেন, যা  এই সংখ্যা তত্বে বিচার করা যাবে না। তেমনি একটি গান তার। “তুমি কে বাজাইয়া যাওরে বাঁশী ওরে বাঁঁশরীয়া  “রাধা রমনের ধামাইল গানের সাথে মিশে গিয়েছিল তাঁর এই গানটি, এমন কি নাম ভনিতায় অনেকে ভাইবে রাঁধা রমণ বলে গানটি গেয়ে থাকেন।  কুতুব ভাই খুব মর্মাহত  হয়েছিলেন। দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন,  যদিও এখন বিভিন্ন জায়গায় নাম ভনিতায় কুতুব বলে, বলেই গীত হতে শুনেছি আমি। বাংলা ধামাইল যতদিন থাকবে কুতুব আফতাব শুধু এই একটি গানেই বেঁচে থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। 
লন্ডনে একবার একটি অনুষ্ঠান শেষে আক্ষেপ করেছিলেন,  একক গানের একটি অনুষ্ঠান করার খুব ইচ্ছে ছিল হয়তো তাঁর,  আমি মজা করে বলেছিলাম,  আপনাদের সময় তো সামনে আসতেছে ভাই,  আপনি আর জাহাঙ্গীর  রানা ভাই কয়দিন পরে নেতৃত্ব দিবেন।  উনি হেসে হেসে বলেছিলেন,  তোমার  জাহাঙ্গীর  ভাই ঠিক আছে, আমরা, গাও গেরামে থাকি,  গাও গেরামের গান লেখি। বলেছিলাম, কুতুব ভাই উস্তাদ শাহ আব্দুল করিম কিন্তু উজান ধলে থাকতেন… উনি হেসে বলেছিলেন সাংবাদিকের সাথে কথা কইয়া  উপায় নাই। বাঁশীর সুর নিয়ে আপনি চলে গেলেন কুতুব ভাই। কি যে অমায়িক মায়াময় একজন মানুষ ছিলেন। 

লন্ডনে সাহিত্য, সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে এক কর্মশালায় গীতিকার কুতুব আফতাব

২০১১ অথবা ২০১২ সালের কথা, আমরা তখন, আমি বন্ধু উজ্জ্বল, আ স ম মাসুম তখন ব্রিটবাংলা ২৪ নামের অনলাইন চালাই, সেখানে “উড়তে দেই না কষ্টের ধুলোবালি” বইয়ের একটি রিভিউ প্রকাশ করি,  উজ্জ্বল তখন পরিচয় দেয় আমাদের নবীগঞ্জী দেশী ভাই,  চিনিয়া রাখো। সেই আমার  প্রথম চেনা কুতুব আফতাব।  যদি তার আগেই কুতুব আফতাব “কাঁচা বয়সের বন্ধু আমার ” নামের বহুল জনপ্রিয়  এলব্যামের গীতিকার।  কে বাজাইয়া যাও বাঁশরী ওরে বাঁশরীয়া কিংবা, দুঃখ আসমানে জমিনে নাহি ধরে শিরোনামে  বহু জনপ্রিয়  গান শুনেছি। এই কুতুব আফতাব যে সেই কুতুব আফতাব সেটা আমার জানা ছিল না। এরপর তো টেমসের বহমান স্রোতে কত সময় পেরিয়ে গেছে। কুতুব ভাইয়ের সাথে ব্যাক্তিগত হৃদ্যতা তৈরী হয়েছে। ফেইস বুকের বদৌলতে সেই হৃদ্যতা থেকে অভিযোগ অভিমানে রূপ নিয়েছে বহুবার। আবার স্বাভাবিক হয়েছে। আমার বিভিন্ন স্ট্যাটাস  নিয়ে, বিশেষ করে ধর্মীয় কুসংস্কারের সমালোচনা  নিয়ে লেখাগুলো নিয়েই বিতর্ক হত, তিনি বলতেন এইসব বাদ দিয়ে,  একটা কলাম লিখো, একটা কবিতা লিখো। 
কবি শামীম আজাদ একবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন শেক্সপিয়রের  নাটকের সিলেটি অনুবাদ করবেন। সেখানে বিলেতের সাহিত্য সংস্কৃতির অনেকেই যোগ দিয়েছিলন,  কুতুব ভাই  ঘন্টা দুই ড্রাইভ করে লন্ডনে আসতেন, আর সেই টিম ওয়ার্কের জায়গা ছিল আমাদের ব্রিকলেন পত্রিকার অফিস। শেক্সপিয়রের   ইংরেজী শব্দের সিলেটি বাংলা করা নিয়ে  কত হাসাহাসি। এন টিভি ইউরোপে মায়ার সিলেট নামক একটি অনুষ্ঠান  উপস্থাপনা করতেন কুতুব ভাই।  তাঁর মৃত্যুর পর দেখলাম কত মানুষ যে তাঁর মায়ায় বাঁধা পড়েছিলেন তার ইয়াত্তা নেই। দেশে বিদেশে কত মানুষ তাঁর জন্য হাহাকার করেছেন, বেদনা সিক্ত  হয়েছেন।
সর্বশেষ সংগীতা সোমা নামে এক শিল্পীর গাওয়া তাঁর গান এর লাইন  ছিল আঘাত দিলে দিসরে গায়ে,  দিসনা আঘাত কলিজায় গানটি ইনবক্স করেন। আমি মজা করে লিখেছিলাম কুতুব ভাই এই গানের জন্য তো আপনি নারী নির্যাতন মামলায় পরবেন। হেসে বলেছিলেন গান ভাল হয়েছে কী না বলো? মামলা খাইলে কাইমু নে।  তাঁর সর্বশেষ  গান ছিল সেলফি শিরোনামে, কাজের জায়গায় বসে শুনেছিলাম, কিছুটা সিনেমাটিক গান। 

ভেবেছিলাম গান টি নিয়ে মজা করব। সেই সুযোগ আর পাই নি। বাসায়  গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় এসে দেখি তাঁর বন্ধু তমিম ভাইয়ের সেই স্ট্যাটাস আমাদের কুতুব আর আমাদের মাঝে নেই!এমনি ভাবে একমাস আগে আমার বড় ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ যেভাবে আমাকে  থমকে দিয়েছিল  কুতুব ভাইয়ের অবিশ্বাস্য মৃত্যু  সংবাদ আমাকে থমকে দিয়েছিল। কাকে ফোন দিব  তখন ও ফেইস বুক ম্যাসেঞ্জারে সবুজ বাতিটি জ্বলছিল। অবশেষ গীতিকার  জাহাঙ্গীর রানা   ভাইয়ের কাছ থেকে নিশ্চিত হই কুতুব ভাই সত্যি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। 


এমন না যে কুতুব ভাই আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন, কিংবা আমি তাঁর খুব কাছের মানুষ ছিলাম।  আমাদের একটা হৃদ্যিক যোগাযোগ ছিল।  নান বিষয়ে কথা হত। কিন্তু তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমাকে প্রচন্ড  নাড়া দিয়েছে,  আমার মন বলছে বারবার, কুতুব ভাই আমার কাছের মানুষ ছিলেন। কখন যে  মায়া দিয়ে মায়াময় মানুষটি আমাকে বেঁধেছিলেন আমি বুঝিনি। ২০১৭ সালে আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করি। বই মেলার মাত্র কয়েকদিন আগে হঠাৎ করে ইনবক্সে কথা প্রসঙ্গে  বললাম,  কুতুব ভাই কবিতার  বই কি একটা প্রকাশ করে ফেলব নাকী? বলা মাত্র বললেন , আগে কবিতা রেডি করো, তারপর তাড়াহুড়া  করে নিন্দিতা প্রকাশনীর বিভু রঞ্জন দার  সাথে যোগাযোগ  করিয়ে দিলেন এবং একুশের মেলায়ই বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার ফেইস বুকে লেখা কবিতায় অন্তমিল ছন্দমিল নিয়ে পরামর্শ  দিতেন বলতেন এইটার অন্তমিল দেও, তাহলে গান হয়ে যাবে। এই ছিলেন কুতুব ভাই।নবীগঞ্জের ঘরে ঘরে বিবিয়ানার গ্যাসের দাবীতে ব্রিটেনে একটা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত  নবীগঞ্জ প্রবাসী গণ, সেখানে ও সরব ছিলেন তিনি। সর্বশেষ করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশে ত্রাণ বিতরণের উদ্যেগ নেয়া হয়, সেখানেও উদ্যেগীদের একজন ছিলেন কুতুব ভাই। শুধু যে গান সাহিত্য নিয়ে দেশকে লালন করতেন, তা নয়, দেশের প্রয়োজনে মানুষের প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটা মন ছিল তাঁর। 

 গত বছর তাঁর বড় ছেলের বিয়েতে দাওয়াত দিয়েছিলেন, ব্যস্ততা এবং দূরত্বের কারণে যাওয়া হয়নি, বলেছিলেন, ” কিতাবা সাংবাদিক ডিজিটাল দাওয়াত দেওয়ায় আইলায়না না কিতা? পিছনে চেয়ে দেখি এমন   কত শত টুকরো স্মৃতি এই কয় বছরে জমা হয়েছে। 
তাঁর বিখ্যাত জনপ্রিয় গান, লাগাইলে লাগাও কিনারা,  ভাসাইলে ভাসাও , আর মানেনা ধৈর্য্য মনে,  বাইতে ভাঙা নাও….
আপনার ভাঙা নাও কিনারা  খুঁজে পেয়েছে, বাংলা গান যতদিন থাকবে আপনার গান গীত হবে কুতুব ভাই। বাংলা সংগীতকে অনেক কিছু দেয়ার ছিল আপনার। বড় অবেলায় চলে গেলেন আপনি।  

মৃত্যুর আগে সর্বশেষ  শহর শিরোনামে কবিতাটিই ছিল তাঁর   শেষ কবিতা 
একটা শহর ঘুমিয়ে আছে,গভীর ঘুমে,একটা শহর ঘুমিয়ে আছে,সজাগ ঘুমে,একটা শহর অন্ধকারে,তুমুল আঁধার,একটা শহর আলোয় ভাসে,আলোর ধাঁধায়,একটা শহর লোকারণ্য,আনাগোনায়,শহর ঘুরে সবাই খুঁজে, শহর কোথায়? 
-কুতুব আফতাব ০৯/০১/২০২১
কুতুব ভাই, এই শহরে আপনি কোথায়?সব অন্ধকার করে দিয়ে আপনি চলে গেলেন।  আর কোন গান লিখবেন না,  আর কোন কবিতা লিখবেন না। আপনার অভিমান জানাবেন না।মরণঘাতি করোনা জয় করে ও হৃদরোগের  কাছে হেরে গেলেন… লন্ডনে আমাদের আর দেখা হবে না। ইনবক্সে আমাদের আর ঝগড়া হবে না। এতো তাড়াহুড়ো  ছিল কেন ভাই??

Leave a Reply