আমেরিকান ড্রিম : পরিশ্রমী অভিবাসীরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন স্বপ্ন
পরিশ্রমী অভিবাসীরাই এখনো আমেরিকান স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

আমেরিকান ড্রিম : পরিশ্রমী অভিবাসীরাই বাঁচিয়ে রেখেছেন স্বপ্ন

ইব্রাহীম চৌধুরী , নিউইয়র্ক :

টানা যুদ্ধ, অপশাসন ও করোনা মহামারির তাণ্ডব পেরিয়েও যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বের স্বপ্ন দেখা মানুষের গন্তব্য হিসেবে অবস্থান অব্যাহত রেখেছে। গত ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এখানে জন্ম নেওয়া লোকজনের কাছে ‘আমেরিকান ড্রিম’ ক্রমশ ফিকে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া লোকজন তাঁদের ৩০ বছর বয়সে আমেরিকান মা-বাবার চেয়ে কম আয় করছেন। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীরা তাঁদের মা-বাবার চেয়ে আয় করছেন বেশি। এসব পরিশ্রমী অভিবাসীরাই এখনো আমেরিকান স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

‘আমেরিকান ড্রিম’ বলতে মনে করা হতো, বাড়ির মালিক হওয়া, সন্তানদের কলেজে পাঠানো, বাড়িতে কুকুর বা বিড়াল পোষা, বাড়ির সামনে একটি নয়, দুটি গাড়ি রাখতে পারা—যার একটি কাজে যাওয়ার জন্য ও অন্যটি পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, এ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের লোকজন আমেরিকান স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাফল্যের ক্ষেত্রে তাদের পূর্বসূরিদের থেকে পিছিয়ে আছে। ১৯৪০ সালের দিকে জন্ম নেওয়া লোকজনের মধ্যে ৯০ শতাংশই ৩০ বছর বয়সে তাঁদের সন্তানদের চেয়ে বেশি আয় করেছেন। ১৯৮৪ সালের দিকে জন্ম নেওয়া লোকজনের মাত্র ৫০ শতাংশ তাঁদের মা-বাবার চেয়ে বেশি আয় করতে সক্ষম হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে আগের প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মের আয় ও সাফল্যের এ ক্ষতিটি পুষিয়ে দিচ্ছে অভিবাসীরা। গত ৪০ বছরের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অভিবাসীদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে আমেরিকান স্বপ্নের জীবনযাপন করছে। যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করার কয়েক বছরের মধ্যেই এমন জীবনের হাতছানি তাঁদের এগিয়ে নিচ্ছে। কঠোর পরিশ্রম, পারিবারিক বন্ধন এবং আমেরিকার স্বপ্ন ছোঁয়ার তীব্র বাসনাই এ জনগোষ্ঠীকে তাড়িত করছে। অর্জিত হচ্ছে আমেরিকান স্বপ্ন। অভিবাসীদের সাফল্যের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে এক ধরনের ভারসাম্যের সৃষ্টি হচ্ছে।

মার্কিন ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ সম্প্রতি এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করে তথ্য প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আসা কয়েক লাখ অভিবাসী পরিবারের ওপর পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসী সন্তানেরা যুক্তরাষ্ট্রের লোকজনের সন্তানদের চেয়ে সাফল্য বেশি দেখাচ্ছে। অভিবাসী মা-বাবারা প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিচের দিকের ২৫ শতাংশে অবস্থান করলেও তাঁদের সন্তানেরা দ্রুত শীর্ষের ২৫ শতাংশে অবস্থান করতে পারছে।

গবেষণায় অভিবাসীদের তৃতীয় প্রজন্মের সাফল্য নিয়ে জটিল অবস্থার পরিচয় পাওয়া গেছে। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা প্রায় শূন্য হাতে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর কঠোর পরিশ্রম করে থাকে। এর জের দ্বিতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। প্রথম প্রজন্মের সঞ্চয় এবং সাফল্যের সংগ্রামের সুফল ভোগ করে দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য আমেরিকার স্বপ্নের জীবন সহজেই ধরা দেয়। তৃতীয় প্রজন্মে এসে এ সাফল্যে ভিন্ন মোড় নেয় বলে ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণায় দেখা গেছে।

২০০৫ সাল থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ কোটি ১৭ লাখ লোকজনের অভিবাসন ঘটবে দেশটির অভিবাসন পদ্ধতির কারণে। এর মধ্যে সাড়ে ছয় কোটির মতো মূল অভিবাসী, সাড়ে চার কোটির কিছু বেশি থাকবে অভিবাসীদের সন্তান এবং প্রায় ৩০ লাখের মতো থাকবে অভিবাসীদের নাতি-নাতনি। এসব অভিবাসীরাই যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনের সমাজ কাঠামো নির্মাণ করবে বলে বলা হচ্ছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বিবরণে যে সমাজ গড়ে উঠেছে এ সমাজের ভিত্তিতেই সাফল্যের হাত বদল ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী মার্কিন মধ্যবিত্ত জীবন যাপনের যে কল্পচিত্র এঁকেছে গত এক শতাব্দীর বেশি সময় থেকে, অভিবাসীরাই এ স্বপ্নের সাফল্যকে ধরে রেখেছে। আমেরিকার স্বপ্নকে অভিবাসীরাই এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

প্রভাবশালী গণমাধ্যম ভক্স ডটকম এ নিয়ে গত ২৮ জুন একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সেখানে এলি নামের বাংলাদেশি দ্বিতীয় প্রজন্মের এক অভিবাসীসহ ছয়জনের বক্তব্য প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশি দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী এলির পুরো নাম-পরিচয় প্রকাশ না করা হলেও তাঁর বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে ভক্স ডটকম।

৩০ বছর বয়সের এলি মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ১৯৯০ সালের দিকে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসার কথা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে তেলাপোকার অবাধ চলাচলের মধ্যে অভিবাসী জীবনের শুরুর দিকে বসবাসের কথা জানিয়েছেন তিনি। একই অবস্থায় অন্যান্য অভিবাসীরা থাকার কারণে নিজের ওপর কোনো চাপ ছিল বলে মনে করেন না এলি। তাঁর পরিশ্রমী অভিবাসী বাবা একজন পেশাজীবীর মতো উচ্চ উপার্জন করতে পেরেছেন এবং নিজে ও পরিবারকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

নিউইয়র্ক থেকে একপর্যায়ে প্রান্তিক যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শহরে স্থানান্তরিত হলেই এলি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত জীবনের চিত্র প্রকৃত অর্থে দেখার কথা জানিয়েছেন। পার্টি, বড় গাড়ি, সামার ক্যাম্প, ক্রিসমাসে উপহার লেনদেন, বছরে একবার লেকের পাশে বা সমুদ্র সৈকতে পরিবার নিয়ে রাত্রি যাপন—এসবের সংস্পর্শে আসার কথা জানিয়েছেন তিনি।

দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী হওয়ার কারণে সাংস্কৃতিক টানা পোড়েনের বিবরণ দিয়েছেন এলি। তিনি বলেছেন, পরিবারের তখনো নিউইয়র্কে ফেলে আসা অভিবাসী পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। নানা বিধিনিষেধ তখনো চালু থাকে প্রান্তিক যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হওয়ার পরও।

আমেরিকার স্বপ্ন ধরার ধারাবাহিকতার বর্ণনা দিয়েছেন বাংলাদেশি এলি। বলেছেন পুরোনো গাড়ির বদলে নতুন গাড়ির কথা। নিজের ও পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রের জীবনধারা অনুযায়ী ব্যয় করার অভ্যাস বদলের কথা। ছোট অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বড় অ্যাপার্টমেন্ট বা বড় বাড়িতে স্থানান্তর হওয়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন মধ্যবিত্ত জীবন আচারের কথা বলেছেন তিনি।

এলি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য অভিবাসীদের মতোই তাঁরা আমেরিকার স্বপ্ন ধরায় তাড়িত থেকেছেন এবং এ স্বপ্নের সবকিছু ধরার জন্য শিক্ষা অর্জন করেছেন, কঠিন পরিশ্রম করেছেন আমেরিকার স্বপ্ন ধরার সমান্তরাল ধারায়।

অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা বাংলাদেশি বা অন্য যেকোনো দক্ষিণ এশীয়দের গল্প প্রায় একই। নিজেদের দেশ থেকে কোনোক্রমে বেড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। বাইরের জীবন, সে মধ্যপ্রাচ্য হোক বা ইউরোপ-আমেরিকা হোক, জীবন স্বদেশ থেকে উৎকৃষ্টের হবে এমন ধারণা থেকেই অভিবাসীরা নিজের দেশ ত্যাগ করেন।

সারা বিশ্বের অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র কোনো কোনো সময় শূন্য হাতে আসা এসব অভিবাসীদের নিরাশ করেনি। অনেক শিক্ষিত পেশাজীবী যুক্তরাষ্ট্র এসে নিজেদের অর্জিত শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারেন না ঠিকই। কঠোর পরিশ্রম এবং আমেরিকার স্বপ্ন ধরার তাড়নায় এসব অভিবাসীরা নিমগ্ন থাকেন বলেই অধিকাংশ অভিবাসী প্রথম প্রজন্মেই আমেরিকার স্বপ্ন ধরতে পারেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীরা একটা শক্ত ভিত্তির ওপর নিজেদের স্বপ্ন এগিয়ে নিতে পারে। মার্কিন অভিবাসনব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী চক্রের মধ্যেই ‘আমেরিকান ড্রিম’ টিকে আছে এবং টিকে থাকবে বলে মনে করা হয়।

Leave a Reply