ইউরোপে ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তন

ইউরোপে ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তন

রাকিব হাসান রাফি, স্লোভেনিয়া থেকে :

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ২৮ শে মার্চ স্থানীয় সময় রাত দুইটা থেকে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় সময় দুইটা থেকে ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তন করে এক ঘণ্টা এগিয়ে রাত তিনটা করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান টাইম জোনে থাকা দেশগুলোর সময়ের ব্যবধান হবে চার ঘণ্টা এবং সারা পৃথিবীতে সময় নির্ণয়ের জন্য প্যারামিটার হিসেবে পরিচিত গ্রিনউইচ মিন টাইম বা জিএমটির সঙ্গে এ দেশগুলোর সময়ের ব্যবধান দুই ঘণ্টায় এসে পৌঁছেছে।

জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, হাঙ্গেরি, স্লোভেনিয়া, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম অর্থাৎ ইউরোপের বেশির দেশই সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান টাইম জোনকে অনুসরণ করে। অন্যদিকে রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, বেলারুশ, ইউক্রেন, গ্রীস অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপিয়ান টাইম জোনে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে আজকের থেকে বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য হবে তিন ঘণ্টা এবং গ্রিনউইচ মিন টাইম বা জিএমটির সাথে এখন থেকে পূর্ব ইউরোপিয়ান টাইম জোনে থাকা দেশগুলোর সময়ের পার্থক্য হবে তিন ঘণ্টা।

গ্রেট ব্রিটেন এবং পর্তুগাল ইউরোপের এ দুই দেশের সঙ্গে আজকের থেকে বাংলাদেশের পার্থক্য হবে পাঁচ ঘণ্টা। উল্লেখ্য, প্রত্যেক বছরের মার্চ মাসের শেষ রোববার এবং অক্টোবর মাসের শেষ রোববার অর্থাৎ বছরে দুইবার ইউরোপের দেশগুলো তাদের সময়ের পরিবর্তন ঘটায়। ২০০১ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এক অধিবেশনে সদস্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তনের বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করে। এ কারণে প্রত্যেক বছরের মার্চ মাসের শেষ রোববার ঘড়ির কাঁটাকে এক ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয় যা ‘সামার টাইম’ হিসেবে পরিচিত।

বিপরীতক্রমে অক্টোবর মাসের শেষ রোববারে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে আবার মূল সময় ধারায় ফিরিয়ে আনা হয় যা ‘উইন্টার টাইম’ হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ইউরোপিয়ান কমিশনের এক বিবৃতিতে মৌসুমভিত্তিকভাবে ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তনের বিপক্ষে এক প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয় যেখানে বলা হয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অধীনে থাকা দেশগুলোর শতকরা ৮৪ ভাগ মানুষ এ পরিবর্তনের বিপক্ষে এবং তারা মনে করেন আদৌতে বছরে দুইবার এ ধরনের সময় পরিবর্তন তাদের প্রাত্যহিক জীবনে খুব বেশি কোনও পরিবর্তন সৃষ্টি করে না।

২০১৯ সালের ২৬ মার্চ কমিশনের পক্ষ থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পার্লামেন্টে অফিসিয়ালি এ বিষয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয় এবং আশা করা যাচ্ছে যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন যদি এ প্রস্তাবনা গ্রহণ করে তাহলে খুব শীঘ্রই হয়তো এরকমভাবে আর সময়ের পরিবর্তন আনা হবে না। সেক্ষেত্রে ‘সামার টাইম’ এবং ‘উইন্টার টাইম’ এ দুটি ধারণা হয়তোবা এ বছরই ইউরোপ থেকে বিদায় নিতে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাতে সামার টাইমকে ‘ডেলাইট সেভিং টাইম’ নামেও অভিহিত করা হয় যদিও এ দুইটি দেশের সব জায়গায় যে সামার টাইম ব্যবহৃত হয় এমনটি নয়।

আমেরিকানদের দাবি, অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার হিসেবে পরিচিত বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিংক এ প্রস্তাবনার উদ্যোক্তা যদিও আধুনিককালে নিউজিল্যান্ডে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত এন্টোমোলজিস্ট জর্জ হাডসনকে ডেলাইট সেভিং টাইমের প্রস্তাবনার মূল কৃতিত্ব দেয়া হয়। ১৯১৬ সালের ১০ এপ্রিল জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যে সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডেলাইট সেভিং টাইমের প্রবর্তন করা শুরু হয়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এ ডেলাইট সেভিং টাইমের ব্যবহার শুরু করা হয় যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় সর্বোত্তমভাবে এখনও ডেলাইট সেভিং টাইমের ব্যবহার গৃহীত হয়নি।

গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে বিশ্বব্যাপী যখন অনবায়নযোগ্য শক্তির ঘাটতি সৃষ্টি হয় তখন পৃথিবীর অনেক জায়গায় ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের এ কনসেপ্টটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। আজকের দিনে যে সকল দেশ এ ডেলাইট সেভিং টাইম ব্যবহার করে তাদের যুক্তি হচ্ছে গ্রীষ্মকালে যখন দিনের দৈর্ঘ্য বেশি থাকে তখন ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে আনলে অধিক পরিমাণে সূর্যের আলোকে কাজে লাগানো যায়; ফলে শক্তির অপচয় অনেকটা কমে আসে। এ

শিয়া এবং আফ্ৰিকার দেশগুলোতে এখনও ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তনের এ ধারণাটি জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞানীদের অনেকে অবশ্য ঘড়ির কাঁটার পরিবর্তনের এ ধারণাকে সমর্থন করেন না, কেননা তাদের মতে প্রকৃতির সকল জীবই একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ধারা বজায় রেখে চলে। এজন্য তাদের মতে মানুষের জীবনে এ ধরনের পরিবর্তন তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করে না।

Leave a Reply