ইউরোপে টিকায় ‘বৈষম্যের’ শিকার অবৈধ অভিবাসীরা
কিছু দেশে টিকার জন্য নিবন্ধনসহ আরো নানান জটিলতার মধ্য দিয়ে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের যেতে হবে।

ইউরোপে টিকায় ‘বৈষম্যের’ শিকার অবৈধ অভিবাসীরা

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

ইতালিতে একজন ব্যক্তি করোনা টিকা নিতে চাইলে তাকে অবশ্যই অনলাইন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট সময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। কিন্তু যখনই একজন ব্যক্তি সরকার নির্ধারিত ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করতে যাবেন তাকে ব্যক্তিগত ট্যাক্স নম্বর দিতে হয়। যেটি অনিয়মিত অভিবাসীদের থাকে না। কেবল বৈধ এবং নিয়মিত অভিবাসীদের ব্যক্তিগত ট্যাক্স নম্বর দেয়া হয়ে থাকে। ফলে বিপাকে পড়ছে অবৈধ অভিবাসীরা। তাঁরা থেকে ‍যাচ্ছেন টিকা কার্যক্রমের বাইরে।

অথচ এটি ইতালি সমাজের জন্যেও ভালো সংবাদ নয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে ভাইরাসের প্রকোপ কমিয়ে আনা এক প্রকার অসম্ভব। জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যার অবসান ঘটাতে চাইলে দ্রুত সবাইকে ভ্যাকসিন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

ইতালির মতো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধ অভিবাসীরা সহজে টিকা পাচ্ছেন না। কিছু দেশে টিকার জন্য নিবন্ধনসহ আরো নানান জটিলতার মধ্য দিয়ে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের যেতে হবে।

করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই করোনা টিকা কার্যক্রমে সমাজের বেশিরভাগ মানুষকে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রত্যেক দেশে অবস্থানরত অভিবাসীরাও গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সুইডেনে ২০২০ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৩২ ভাগ অভিবাসী৷ করোনা প্রকোপ কমিয়ে আনতে এবং পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিন কার্যক্রমের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শুরুতে বিশ্বের ১৫৩ টি দেশ তাদের টিকা কার্যক্রমে শরণার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

রেড়ক্রস জানিয়েছে, ‘এটি অত্যন্ত আশার কথা। একটি সফল টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করতে এবং ভাইরাসের প্রকোপ কমিয়ে আনতে সমাজের বেশিরভাগ মানুষকে টিকা দিতে হবে। এছাড়া যেসব অভিবাসী বিভিন্ন দেশে অনিয়মিত অবস্থায় আছে তাদের সবাইকে অতি দ্রুত টিকা দেয়া উচিত। সাধারণ অধিবাসীদের তুলনায় অনিয়মিত অভিবাসীরা অনেক বেশি সমস্যায় থাকেন৷’

প্রশাসনিক ভাবে বিভিন্ন কাগজপত্র না থাকাটা অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈষম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেমন মে মাসের শেষের দিকে ইতালিতে ১৮ বছরের উপর সকলের জন্য টিকাদান কর্মসূচি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এনজিও কারিতাস ক্যাথলিক রোমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিদিন কমপক্ষে দশ লাখ মানুষকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হলেও ইটালিতে অনিয়মিতভাবে বসবাস করা এবং নিয়মিত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় থাকা প্রায় ৭ লাখ অভিবাসীকে কোন এক অদৃশ্য কারণে তালিকায় রাখা হয়নি। যারা সম্প্রতি ইতালিতে এসেছেন বা কয়েক বছর ধরে আছেন এমন ব্যক্তিদেরও টিকা কার্যক্রমে রাখা হয়নি।

ইতালির জাতীয় স্বাস্থ্য, অভিবাসন এবং দারিদ্র ইনস্টিটিউট (আইএনএমপি) এর স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিচালক গিয়ানফ্রানকো কনস্টানজো বলেন, ‘ইতালির সংবিধান অনুযায়ী, ভূখন্ডে বসবাসরত সকল মানুষের টিকা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কারণ অভিবাসী প্রথম ইটালিতে প্রবেশ করলে তাকে একটি অস্থায়ী আবাসনের অনুমতিপ্ত্র বা টেম্পোরারি রেসিডেন্স পারমিট (এসটিপি) দেয়া হয়। এটি সাধারণত কোন অভিবাসী রাজনৈতিক আশ্রয় না করলেও দেয়া হয়। যেটি দিয়ে একজন ব্যক্তি সব ধরণের চিকিৎসা সেবা নিতে পারে। অর্থাৎ প্রশাসনিকভাবে একজন অভিবাসী যে অবস্থায় থাকুক না কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে টিকা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার কথা৷’

গিয়ানফ্রানকো আরো বলেন, ‘ইটালিতে টিকা কার্যক্রমের সাইটগুলো মূলত বিভিন্ন অঞ্চল কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে থাকে। এখন পর্যন্ত কেবল এমিলি রোমান রিজিওনে ট্যাক্স নম্বর ছাড়া নিবন্ধন করা যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এর ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্যের হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।’

গ্রিসেও অভিবাসীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়াটা বেশ জটিল। দেশটিতে অনিয়মিত অবস্থায় বসবাস করা প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী করোনা টিকা গ্রহণ করতে পারছে না৷ কারণ তাদের কাছে কোন সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর নেয়। যেটি সাধারণ বৈধ অভিবাসীদের কাছে থাকে।

তবে ফ্রান্সে কাগজহী্ন ব্যক্তিদের করোনা টিকা নেওয়ার জটিলতা ২৪ মে থেকে অনেকটা কমে এসেছে। স্বাস্থ্য সহায়তা দানকারী এনজিও মেদসা সঁ ফ্রন্তিয় (এমএসএফ) জানায়, ফ্রান্সে বসবাসরত সকল অনিয়মিত অভিবাসীদের সাধারণত রাষ্ট্রীয় এইড মেডিকেল বা এএমও নামক বিমা থাকে, যার সাহায্যে সকল প্রকার চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা যায়। অবশ্য টিকা নিতে অভিবাসীদের থেকে কোন বিশেষ নাম্বার বা ডকুমেন্ট চাওয়া হচ্ছে না। বয়স ভিত্তিক টিকা কার্যক্রমের কারণে অনেকে নিতে না পারলেও সোমবার ৩১শে মে থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে৷

এ ছাড়া গণ টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ ভ্রাম্যমাণ টিম পাঠিয়ে টিকা কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এক্ষেত্রে এমএসএফ সহ বিভিন্ন এনজিও স্বাস্থ্য মন্ত্রলায়ের সাথে সমন্বয় করে কার্যক্রমগুলো পরিচালন করবে। এমএসএফ আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত খাবার সংগ্রহের কেন্দ্রগুলোতে ভ্রাম্যমাণ টিম প্রেরণ করবে। এর ফলে যথাসময়ে দুই ডোজ ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যাবে৷

এদিকে ইউরোপে অবস্থানরত অভিবাসীদের মধ্যে যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন তারা মনে করেন টিকা নিতে গেলে অনেক তথ্য দিতে হবে। সেসব তথ্য পরবর্তীতে অভিবাসন বিষয়ক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হবে। অনিয়মিত অভিবাসীরা সরকারি কোন দপ্তরে যেতে চান না। বিশেষ করে নাম, ঠিকানা এবং ব্যক্তিগত তথ্য দিতে তারা ভয় পান।

যুক্তরাজ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে বসবাসরত প্রায় ১৩ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীদের দ্রুত প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেয় সরকার৷ জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা দানকারী কর্তৃপক্ষ এনএইচএস অভিবাসীদের এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে যে, শরণার্থী মর্যাদা এবং অন্যান্য প্রসাশনিক কাঠামোর সাথে টিকা দানের কোন সংযোগ নেই। সরকারের মুখপাত্র জানান, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সকল অভিবাসীরা বিনামূল্যে টিকা নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাদের প্রশাসনিক অবস্থা অর্থাৎ নিয়মিত, অনিয়মিত কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে না ৷
(সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস)

Leave a Reply