ইউরোপ সীমান্তে গিয়েও ফেরত আসার সংখ্যা অনেক
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার ১৬২ জনকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সীমান্তে আটকে দেয়া হয় এবং ফেরত পাঠানো হয়৷

ইউরোপ সীমান্তে গিয়েও ফেরত আসার সংখ্যা অনেক

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ সীমান্তে গিয়েও ফেরত আসতে হচ্ছে অনেককে। সব অভিবাসনপ্রত্যাশী ইউরোপে ঢুকতে পারছে না। গত তিন মাসে ইউরোপের সীমান্তে অনেককে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানো হয়েছে ৷

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার ১৬২ জনকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সীমান্তে আটকে দেয়া হয় এবং ফেরত পাঠানো হয়৷ প্রটেকটিং রাইটস অ্যাট বর্ডার-পিআরএবি এর ‘পুশিং ব্যাক রেসপনসিবিলিটি’ বা ‘ফেরত পাঠানোর দায়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে৷ প্রতিবেদনটি তৈরিতে গ্রিস, সার্বিয়া, বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনা, উত্তর মেসিডোনিয়া ও হাঙ্গেরির তথ্য সংগ্রহ করেছে ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিল (ডিআরসি)৷ এছাড়া আরো ছয়টি দেশের ১০ টি সংগঠন ভূমিকা রেখেছে৷ এটি প্রকাশের আগে ব্রিটেনের গণমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, মহামারির সময়ে পুশব্যাকের কারণে অন্তত দুই হাজার অভিবাসী মারা গেছেন৷

পিআরএবি এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘মধ্য ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম বলকান রুট, সেইসঙ্গে ইইউ এর অভ্যন্তরীণ সীমান্তেও পুশব্যাকের ঘটনা ব্যতিক্রম ছিল না৷’’

শুধু যে ইউরোপের সীমান্ত থেকেই অভিবাসীদের পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানো হচ্ছে তা নয়৷ এমনকি সদস্যভুক্ত এক দেশ থেকে আরেক দেশে তাদের ক্রমাগত ফেরত পাঠানো হয়৷ এভাবে চলতে থাকে যতদিন না ইউরোপ থেকে তাদের বের করা হচ্ছে৷ বিভিন্ন দেশের এমন সমন্বিত ১৭৫টি ‘চেইন পুশব্যাক’ এর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন অভিবাসীকে ইতালি অথবা অস্ট্রিয়া থেকে স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়ার মতো কোনো দেশ হয়ে বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনার মতো তৃতীয় কোন দেশে পাঠানো হয়৷

সবচেয়ে বেশি এক হাজার ২১৬টি ঘটনা ঘটেছে ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার মধ্যে৷ উল্লেখ্য বসনিয়া সীমান্ত দিয়ে ক্রোয়েশিয়া হয়ে ফ্রান্স, ইটালি যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেক অভিবাসী৷ গত বছর সেখানে আটকা পড়েন বিভিন্ন দেশের কয়েক হাজার মানুষ৷ যার একটি বড় অংশ ছিল বাংলাদেশি৷

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোমানিয়া থেকে সার্বিয়ায় ফেরত পাঠানোর ঘটনা ছিল ৩৩১টি৷ ২৮৫টি ছিল হাঙ্গেরি থেকে সার্বিয়ায়৷ তবে প্রকৃত সংখ্যাটা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে৷ কেননা বেসরকারি সংগঠনগুলোর পক্ষে সব তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ সম্ভব হয় না৷ যেমন, গ্রিস-তুরস্ক স্থলসীমান্তের এভরোস অঞ্চলে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ৷ আবার অনেক অভিবাসীও ভয় ও তাদের ভবিষ্যত সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় পুশব্যাক সংক্রান্ত তথ্য দিতে চান না৷ অনেকে মনে করেন এসব তথ্য জানিয়েও কোন লাভ হবে না৷

প্রতিবেদনে একটি স্বাধীন সীমান্ত নজরদারি ব্যবস্থাপনা চালুর উপর জোর দিয়েছে সংগঠনগুলো, যাতে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা এবং এনজিওগুলোর দেয়া পুশব্যাক সংক্রান্ত তথ্য ভবিষ্যতে তদন্ত করা হয়৷ সীমান্ত মানবাধিকার নিশ্চিত করতে শুধু বিশ্বাস এর উপর নির্ভরতা যথেষ্ট নয় বলে উল্লেখ করছে পিআরএবি৷

প্রতিবেদনটি তৈরিতে যুক্ত সংগঠনগুলো বলছে, সীমান্তে চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাষ্ট্রগুলোর রয়েছে৷ কিন্তু সেটি হতে হবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষিতে৷ এক্ষেত্রে মানবাধিকার আইন মেনে চলতে তারা বাধ্য৷

অভিবাসীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এক তৃতীয়াংশ পুশব্যাকের ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে৷ তাদেরকে আশ্রয় আবেদনের সুযোগ দেয়া হয়নি৷ এমনকি শারীরিক নির্যাতন, হামলা, চুরি, জোরপূর্বক অর্থ আদায় ও সম্পত্তি বিনষ্টের ঘটনা ঘটেছে৷ এজন্য সীমান্ত পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে৷

জানা যায়, ইতালি থেকে ফ্রান্সের উপকূলীয় সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসীরা ফরাসি সীমান্ত পুলিশের বাধার মুখে পড়েন৷ তারপর তাদেরকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় ফরাসি পুলিশের সীমান্ত ফাঁড়িতে৷ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে তাদের আশ্রয় আবেদনের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা হয়৷ অভিবাসীদের পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও কম্বল দেয়া হয় না৷ এমনকি যোগাযোগের জন্য অনুবাদকের সহযোগিতা কিংবা চিকিৎসা সহায়তাও পান না তারা৷ পরের দিনই তাদের ফেরত পাঠানো হয় ইতালিতে৷

সার্বিয়া থেকে হাঙ্গেরি বা রোমানিয়ায় পুশব্যাকের শিকার অভিবাসীরাও বিভিন্ন দুর্ব্যবহার ও নিপীড়নের কথা জানিয়েছেন৷ দুইটি ক্ষেত্রে অভিবাসীরা জানিয়েছেন তারা সীমান্তরক্ষীদের ছেড়ে দেয়া কুকরের কামড়ের শিকার হয়েছেন৷ অন্যরা থাপ্পড়, লাথি, পুলিশের লাঠিপেটা, শরীরের পেছনের অংশে বা হাত, পায়ে আঘাতের কথা জানিয়েছেন৷ বেশিরভাগ সাক্ষাৎকারদাতা বলেছেন, বৃষ্টি বা বরফ যাই থাকুক না কেন তাদেরকে মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসতে বাধ্য করা হতো৷ এমনকি ফোন কেড়ে নিয়ে তা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে বা আর ফেরত দেয়নি৷ নির্যাতনের এমন চিত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিল৷
(সূত্র ইনফো মাইগ্রেন্টস)

Leave a Reply