উত্তর মেসিডোনিয়ার ভোদিচি উৎসব
উত্তর মেসিডোনিয়ার ভোদিচি উৎসব

উত্তর মেসিডোনিয়ার ভোদিচি উৎসব

রাকিব হাসান রাফি,স্লোভেনিয়া।

উত্তর মেসিডোনিয়াতে ভোদিচি নামক এক বিশেষ উৎসবের প্রচলন রয়েছে। ভোদিচিকে দেশটির সাধারণ মানুষ খ্রিস্টমাস বা বড়দিনের একটি সহযোগী উৎসব হিসেবে বিবেচনা করেন অর্থাৎ খ্রিস্টমাসের সাথে ভোদিচির বিশেষ সংযোগ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। যীশুখ্রিস্টের ব্যাপ্টিজম স্মৃতিকে স্মরণ করতে এ উৎসবের আয়োজন হয়।

উত্তর মেসিডোনিয়ার বেশিরভাগ মানুষই অর্থোডক্স খ্রিস্টানিটির অনুসারী, অর্থোডক্স খ্রিস্টানিটি খ্রিস্টান ধর্মের একটি প্রাচীন শাখা। বিশ্বাসগত দিক থেকে অর্থোডক্স খ্রিস্টানিটির সাথে ক্যাথলিক খ্রিস্টানিটির বেশ কয়েক জায়গায় মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত গ্রিস, রোমানিয়া, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, মেসিডোনিয়া, ইউক্রেন এমনকি রাশিয়া, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম অর্থোডক্স খ্রিস্টানিটি। আনুমানিক চতুর্থ শতাব্দীর দিকে রোমান সাম্রাজ্য দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বভাগের অংশ তখন বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য হিসেবে পরিচিতি পায়। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অর্থোডক্স চার্চের বিস্তৃতির প্রধান কারণ হলো এ অঞ্চলে এক সময় বাইজেনটাইনদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। বাইজেনটাইন সম্রাট প্রথম জাস্টিনকে অর্থোডক্স খ্রিস্টানিটির প্রথম পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ক্যাথলিক চার্চগুলো পোপের কর্তৃত্ব স্বীকার করে। রোমের ভ্যাটিকানকে রোমান ক্যাথলিক গির্জার প্রধান সদর দফতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে অর্থোডক্স চার্চগুলো পোপের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে না, যদিও প্রাথমিকভাবে পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স চার্চগুলো অনেকাংশে গ্রিস দ্বারা প্রভাবিত। এমনকি যীশুখ্রিস্ট কিংবা ভার্জিন মেরিকে নিয়ে অর্থোডক্স এবং ক্যাথলিক উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে বিশ্বাসগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। আবার ক্যাথলিক চার্চগুলো ধর্মযাজকদের বিবাহের অনুমতি দেয় না কিন্তু অর্থো অর্থোডক্স চার্চের ধর্মযাজকেরা চাইলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।অর্থোডক্স চার্চগুলো গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে পুরাতন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে অধিকমাত্রায় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যীশুখ্রিস্টের জন্ম হয়েছিলো জানুয়ারি মাসের সাত তারিখে। এজন্য অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মালম্বী মানুষেরা ২৫শে ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারি মাসের সাত তারিখে খ্রিস্টমাস উৎসব উদযাপন করে।

খ্রিস্টধর্মালম্বী মানুষের মাঝে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী জন্মের পর যীশুখ্রিস্টের আত্মাকে ব্যাপ্টিজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশীলিত করা হয়েছিলো। অর্থোডক্স এবং ক্যাথলিক উভয় চার্চই ব্যাপ্টিজমের ধারণাকে স্বীকার করে। মুসলমানেরা যেমনিভাবে শিশু জন্মের পর তার মঙ্গল কামনায় আকীকার আয়োজন করে, ঠিক তেমনিভাবে খ্রিস্টধর্মালম্বী মানুষেরাও সন্তান জন্মলাভের কয়েক দিনের মধ্যে ব্যাপ্টিজমের আয়োজন করে। সদ্য জন্মলাভ করা শিশুকে প্রথমে নিকটস্ত কোনও চার্চে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানকার পুরোহিতের কাছে সমর্পণ করা হয়। এরপর এক বিশেষ পাত্রে রাখা পানিতে বাচ্চার শরীর তিনবার ধৌত করা হয়। খ্রিস্টধর্মালম্বী মানুষের বিশ্বাস এভাবে শিশুর আত্মা পবিত্রতা লাভ করে। ক্যাথলিক চার্চগুলোতে শিশুর শরীর তিনবার ধৌত করার পরিবর্তে কেবলমাত্র জলের ফোঁটা ছিটানো হয়। যীশুর জন্ম ও পুনরুত্থানের সাথেও ব্যাপ্টিজম ধারণাটি বিশেষভাবে সম্পৃক্ত।

ফেসবুকের বদৌলতে আমার সাথে এক মেয়ের পরিচয় হয়, তার নাম ইরেনা প্রসহিচ। ইরেনা উত্তর মেসিডোনিয়ার অধিবাসী, ইরেনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি মেসিডোনিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ভোদিচি উৎসব সম্পর্কে। এখন পর্যন্ত ত্রিশের বেশি দেশ ভ্রমণ করা হলেও মেসিডোনিয়া যাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি এখনও। তাই অনেকটা ইরেনার চোখ দিয়েই উপভোগ করার চেষ্টা করেছি মেসিডোনিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ভোদিচি উৎসবকে।

খ্রিস্টমাস উৎসবের বারো দিন পর অর্থাৎ প্রত্যেক বছর জানুয়ারি মাসের উনিশ তারিখে উত্তর মেসিডোনিয়াতে ভোদিচি উৎসবের আয়োজন করা হয়। সরকারিভাবে এ দিনটিকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অনেকে ভোদিচিকে “ইপিফানি” নামেও অভিহিত করেন। পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স চার্চে বিশ্বাসী মানুষজন মনে করেন এ দিন জর্ডান নদীতে যীশুর ব্যাপ্টিজম সম্পন্ন হয়েছিলো। গোলান মালভূমির মতো জর্ডান নদীও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। যদিও প্রাকৃতিকভাবে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, জর্ডান এবং সিরিয়া এ চার দেশের মাঝে সীমারেখা তৈরি করেছে এ জর্ডান নদী।

যীশুর ব্যাপ্টিজমের স্মৃতিকে স্মরণ করতে এ দিন চার্চের পুরোহিতেরা নদীতে ক্রস নিক্ষেপ করেন। অতীতে ধাতুর তৈরি ক্রস ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে কাঠের তৈরি ক্রসকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। স্থানীয় জনগণ এ সময় নদীতে ঝাঁপ দেন এবং এ ক্রসগুলোকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। যিনি ক্রস উদ্ধার করতে পারেন, ধারণা করা হয় তিনি পুরো বছরে আশীর্বাদ বয়ে আনবেন। ভোদিচি উৎসবকে উপভোগ করতে এদিন তাই নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে অসংখ্য মানুষ জড় হন। উৎসবমুখর হয়ে উঠে গোটা মেসিডোনিয়া। বাড়িতে এ সময় বিশেষ খাবার তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ধরণের জ্যাম এবং গরু কিংবা শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি দুই ধরণের খাবার পিভটিই ও পাচা এ দিন দেশটির মানুষের খাদ্য তালিকায় বিশেষ স্থান লাভ করে। মেসিডোনিয়াসহ বলকান দেশগুলোতে উৎসবের দিন রাকিয়া, ব্র্যান্ডি এবং বিভিন্ন ধরণের ঘরোয়া ওয়াইন পানের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এ দিনও তার ব্যতিক্রম নয়।

সময়ের সাথে সাথে উত্তর মেসিডোনিয়ার মানুষের মাঝেও ধর্ম বিশ্বাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষত প্রায় সাত দশকের কমিউনিস্ট শাসনের জন্য দেশটির সাধারণ মানুষের মাঝে ধর্মের প্রভাব বর্তমানে তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না।

ইরেনা জানান, বর্তমানে মেসিডোনিয়ার গ্রাম কিংবা মফস্বল অঞ্চল ছাড়া বড় বড় শহরগুলোর চার্চে তেমন একটা মানুষের সমাগম হয় না বললেই চলে, যদিও অর্থোডক্স চার্চে বিশ্বাসী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে উত্তর মেসিডোনিয়া একটি পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। তারপরেও বছরের এরকম কিছু বিশেষ দিনে পরিবারের সবাই একত্রিত হওয়ার সুযোগ প্রায় এবং এক সাথে পুরো একটি দিনকে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করতে পারে। ইরেনা বলেন, মেসিডোনিয়াতে খ্রিষ্টমাস কিংবা ভোদিচির মতো উৎসবগুলো এখন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের তুলনায় সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান উদযাপনের উপলক্ষ্য হিসেবে বেশি গুরুত্ব পায়।

রাকিব হাসান রাফি,
শিক্ষার্থী,
দ্বিতীয় বর্ষ,
ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স,
ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা,
স্লোভেনিয়া।

Leave a Reply