উপমহাদেশে পর্তুগিজ ‘খলনায়ক’
ভাস্কো দা গামার দেখাদেখি উপমহাদেশে পর্তুগিজ, ডাচ, ডেনিশ, ফরাসি ও ব্রিটিশসহ বিভিন্ন ইউরোপিয়ান বণিকদের আগমন ঘটতে থাকে।

উপমহাদেশে পর্তুগিজ ‘খলনায়ক’

রাকিব হাসান রাফি, স্লোভেনিয়া থেকে :

অভিবাসনের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পছন্দের গন্তব্য পর্তুগাল। উপমহাদেশ থেকে অনেকে সেই পর্তুগাল পাড়ি জমাতে চান উন্নত জীবনের আশায়। তবে পর্তুগিজদের সঙ্গে উপমহাদেশের রয়েছে নানা কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে জড়িয়ে আছেন আলোচিত পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামার নাম। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ‘খলনায়কের’ হাত ধরেই ব্যাপক ভাবে ছড়িয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প।

এভাবে ফিরে যাই সেই ইতিহাসে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে তিনি জাহাজযোগে সমুদ্রপথে ভারত আসেন। ভাস্কো দা গামা পর্তুগালের বর্তমান রাজধানী লিসবন থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা মহাদেশে এসে পৌঁছান এবং সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে তিনি ১৪৯৮ সালের ২০ মে তার নৌবহরসহ দক্ষিণ ভারতে অবস্থিত কালিকটের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত কাপ্পাডুতে এসে উপস্থিত হন৷ ইতিহাসে তিনি প্ৰথম ইউরোপিয়ান নাগরিক হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন যিনি সম্পূৰ্ণভাবে সাগর পথ পাড়ি দিয়ে ভারতে এসে উপস্থিত হন। তার এ ভ্ৰমণ এশিয়া ও ইউরোপকে সংযোগ করার পাশাপাশি আটলান্টিক মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরের মাঝে সেতুবন্ধন রচিত করেছিলো এবং এ দিক থেকে পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে পাশ্চাত্য দুনিয়ার সংযোগ স্থাপনের অন্যতম কারিগর হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া যায়৷ ১৮৬৯ সালে সিনাই উপদ্বীপে সুয়েজ খাল খননের পূর্ব পর্যন্ত নাবিকেরা ইউরোপ থেকে এশিয়াতে পৌঁছানোর জন্য তাঁর দেখানো জলপথ অনুসরণ করতেন।

ইতিহাসে ভাস্কো দা গামার এ সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা সে সময় চীন ও ভারতসহ দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে ইউরোপের বাণিজ্য পরিচালিত হতো একমাত্র স্থলপথে। ইউরোপ থেকে এশিয়াতে পৌঁছানোর জন্য মধপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সে সময় ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হতো কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে। সে সময় ক্ষমতাসীন শাসকেরা ইউরোপিয়ান বণিকদের থেকে শুল্ক আদায় করতো। ইউরোপিয়ান বণিকেরা এ শুল্ক প্রদানে তেমন একটা আগ্রহী ছিলেন না, এজন্য তাই ইউরোপ থেকে ভারত ও চীনসহ দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পৌঁছানোর জন্য এ সমুদ্রপথ তাদের নিকট অত্যাবশকীয় হয়ে উঠেছিল। এমনকি ক্রুসেডকে আমরা যদিও ধর্ম যুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃতি দিই তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আদতে ক্রুসেড ছিল ধর্মের অন্তর্জালে সিল্ক রুটসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইউরোপীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আদায়ের একটি কৌশলমাত্র।

দ্বি-জাতিত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত নামক দুইটি পৃথক রাষ্ট্রের সৃষ্টি করা হয়। এ হিসেবে বলা যায় ভারতীয় উপমহাদেশের এ বিভাজন হচ্ছে পুরোপরিভাবে সাম্প্রদায়িকতার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত একটি বিষয়। প্রাচীনকাল থেকে আমাদের ভারতবর্ষ পুরো দুনিয়াব্যাপী এক বিশেষ কারণে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। একই সাথে এতোগুলো ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থান পৃথিবীর অন্য কোথাও সেভাবে দেখা যেতো না। তবে অপ্ৰিয় হলেও সত্য যে আমাদের এ উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারিগর এ ভাস্কো দা গামা। তাই উপমহাদেশ হিন্দু ও মুসলমান এ দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে সম্প্রীতি বিনাশের জন্য ইতিহাসে ভাস্কো দা গামা সত্যি এক কুখ্যাত ব্যক্তিত্ব।

ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ সালে যখন প্রথম কালিকটে পা রাখেন তখন কালিকটের রাজা ছিল সামুদিরি। বিদেশি নৌবহর এসেছে শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। তাই তিনি আগত অতিথিতদের তিন হাজার নায়েরের উপস্থিতিতে রাজকীয় সম্মাননার ব্যবস্থা করেন। ভাস্কো দা গামার পক্ষ থেকে রাজা সামুদিরিকে উজ্জ্বল লাল কাপড়ের চারটি জোব্বা, ছয়টি টুপি, চার ধরনের প্রবাল, বারোটি আলমাসার, সাতটি পিতলের পাত্রসহ একটি বাক্স, এক সিন্দুক চিনি, দুই ব্যারেল (পিপা) তেল এবং এক পিপা মধু উপহার দেওয়া হয়। তবে রাজা তাঁর এ সকল উপহারের প্রতি তেমন একটা আকৃষ্ট হননি।

ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ সালে যখন প্রথম কালিকটে পা রাখেন তখন কালিকটের রাজা ছিল সামুদিরি। 

ভাস্কো দা গামা রাজার কাছ থেকে ভারতে ব্যবসায় করার জন্য অনুমতি চাইলেন। রাজা জানালেন, তাঁর অঞ্চলে ব্যবসা করতে হলে অন্যান্য বণিকদের মতো সোনা দিয়ে খাজনা দিতে হবে। রাজার মুখে এ কথা শুনে ভাস্কো দা গামা অত্যন্ত মনক্ষুণ্ণ হন। রাগান্বিত অবস্থায় তাই তিনি তার সাথে জোর করে তিনজন নায়েব আর ষোলো জন জেলেকে ধরে নিয়ে যান।

১৪৯৮ সালের ২৯ অগাস্ট ভাস্কো দা গামা কালিকট বন্দর থেকে লিসবনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে তাদের অজ্ঞাত মৌসুমি বায়ুর বিভীষিকার মুখোমুখি হতে হয়। যার ফলে ২৩ দিনের পথ পাড়ি দিতে তাদের ১৩২ দিন লেগে যায়। ১৪৯৯ সালের ২ জানুয়ারি তিনি আধুনিক সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুতে এসে পৌঁছান। সেখানে তখন চার পাঁচতলা বাড়ি, প্রাসাদ, আর মিনারওয়ালা মসজিদ ছিল।

১৪৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি মালিন্দিতে পা রাখেন। ততদিনে তার সাথে থাকা অর্ধেক নাবিক মারা গিয়েছে, জাহাজে থাকা অন্যান্য নাবিকেরা তখন স্কার্ভি রোগে আক্রান্ত। এত অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে তাদের পক্ষে তিনটা জাহাজ চালানো অসম্ভব ছিল। তাই তাদের সাথে থাকা সাও রাফায়েল নামক জাহাজটিকে ডুবিয়ে দিতে বলা হলো। আর সেখানকার ক্রুদের বাকি দু জাহাজে ভাগ করে দেয়া হলো।

১৪৯৯ সালের ১০ জুলাই, বেরিও নামক জাহাজে মাধ্যমে তিনি পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে পৌঁছান। ততদিনে ভাস্কো দা গামার ভাই পাওলো ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারা দুজন কিছুদিন সান্তিয়াগো দ্বীপে থাকেন। কিছুদিন পর তার ভাই মৃত্যুবরণ করেন।
ভাইকে সমাহিত করে ভাস্কো দা গামা ২৯ আগস্ট লিসবনে যান। তাকে বীরের ন্যায় স্বাগত জানানো হয় এবং রাজকীয় অনুষ্ঠানের দ্বারা বরণ করা হয়। ডিসেম্বর মাসে পর্তুগালের রাজা তার জন্মস্থান সিনেসকে উপহার হিসেবে তার হাতে সমর্পণ করেন। যদিও সেটা নিয়ে তাকে ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল।

১৫০২ সালে পর্তুগাল থেকে ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে ৪র্থ বহর রওনা দেয় ভারতের উদ্দেশ্যে। এ বহরের উদ্দেশ্য ছিল, কালিকটের রাজার উপর প্রতিশোধ নেওয়া এবং পর্তুগিজরা যে শর্ত দেবে সেই মাফিক আত্মসমর্পণ করানো।

১৫০২ সালের অক্টোবরে তাদের বিশাল নৌবহর ভারতে পৌঁছল। সেখানে “মিরি” নামে এক জাহাজ আসছিল মক্কা থেকে। জাহাজটি ছিল হজ্জযাত্রীতে পরিপূর্ণ। ভাস্কো দা গামা সে জাহাজে আক্রমণ চালান এবং সেখানকার সকল যাত্রীকে জ্বালিয়ে দেন এবং পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেন। সব মিলিয়ে উক্ত জাহাজে চারশোর মতো যাত্রী ছিলেন যাদের মধ্যে ৫০ জন ছিলেন মহিলা। তারা তাদের বাচ্চাদের ধরে প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন, কিন্তু ভাস্কো দা তাদের কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে তাদেরকে হত্যা করেন। তাদের সাথে থাকা স্বর্ণালঙ্কার লুট করেন।

ভাস্কো দা গামার শর্ত মেনে নিতে রাজি হলেন কালিকটের রাজা। কিন্তু ভাস্কো দা গামা শহর থেকে সকল মুসলিমকে বের করে দেবার দাবি জানান। কালিকটের রাজা বলেন, হিন্দুদের মতো মুসলমানেরাও তার রাজ্যের নাগরিক। তাই কোনোভাবে তার এ দাবি রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।রাজার এ উত্তরে ভাস্কো দা গামা ভীষণভাবে ক্রোধান্বিত হন। তিনি তাই তার সঙ্গে থাকা নাবিকদের গোলাবর্ষণের নির্দেশ দেন। একটানা দুদিন গোলাবর্ষণের ফলে শহরের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।

ভাস্কো দা গামা কিছু ভারতীয় জাহাজ আটকে রেখে সেখানের নাবিকদের হাত, কান ও নাকসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে দেন এবং এ অবস্থায় তাদেরকে রাজার কাছে পাঠান। রাজা তখন একজন ব্রাহ্মণকে পাঠালেন তার সাথে সমঝোতা করার জন্য, কিন্তু ভাস্কো দা গামা তাকে গুপ্তচর হিসেবে দাবি করেন এবং তার ঠোঁট ও কান কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। তার কান কেটে সেখানে সেলাই করে কুকুরের থেকে কেটে নেয়া কান লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ভাস্কো দা গামা তাকে পাঠিয়ে দিলেন রাজার কাছে।

কালিকটের রাজা কোনোভাবে পর্তুগিজদের শর্ত মানতে চাইলেন না। ফলে ভাস্কো দা গামা কালিকটের রাজার সাথে এক যুদ্ধে লিপ্ত হন যদিও এ যুদ্ধে ভাস্কো দা গামা জিতে যান। জাহাজ বোঝাই করে তিনি মশলাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তিনি লুট করেন এবং পর্তুগালে নিয়ে যান।

পরের দু’দশক নীরব জীবন কাটালেন দা গামা। ১৫২৪ সালে পর্তুগিজ রাজা তৃতীয় জন ভাস্কো দা গামাকে “ভাইসরয়” উপাধিতে ভূষিত করেন। একই বছরের এপ্রিলে তিনি আবার ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। এবার এসেই পর্তুগিজ শাসনাধীন ভারতের অঞ্চলগুলোতে নিজের পছন্দের লোকদের বসিয়ে দিলেন ক্ষমতায়, তিনি নিজেও ছিলেন অনেক ক্ষমতাবান। তবে ভারতে পা রাখার কয়েকমাস পর তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন।

১৫২৪ সালের ক্রিসমাসের আগেরদিন তিনি কোচিন শহরে মারা যান ম্যালেরিয়ার কারণে। সেখানকার এক চার্চে তার দেহ সমাহিত করা হয়, কিন্তু ১৫৩৯ সালে তা পর্তুগালে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ভাস্কো দা গামার দেখাদেখি উপমহাদেশে পর্তুগিজ, ডাচ, ডেনিশ, ফরাসি ও ব্রিটিশসহ বিভিন্ন ইউরোপিয়ান বণিকদের আগমন ঘটতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় এ উপমহাদশে ইংরেজ শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে। তবে দক্ষিণ ভারতের পন্ডিচেরিতে ফরাসিদের কলোনি স্থাপিত হয়েছিলো, এমনকি পশ্চিম ভারতে অবস্থিত গোয়া এক সময় পর্তুগিজ শাসনাধীন ছিলো। বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন মানুয়েল দা আস্‌সুম্পসাঁউ নামক এক পর্তুগিজ ধর্মযাজক।

পর্তুগিজ ভাষায় ব্যবহৃত অনেক শব্দ বাংলা ভাষার শব্দ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উপমহাদেশে মরিচ, পেয়ারা, আনারসসহ বিভিন্ন কৃষিজ ফসলের উৎপাদন শুরু হয় পর্তুগিজদের হাত ধরে। তা সত্ত্বেও এ উপমহাদেশে পর্তুগিজদের স্মৃতি অত্যন্ত দুঃসহ, উপমহাদশের বহু মানুষকে তারা বলপূর্বক খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করেছিল। বর্গীদের মতো বাংলার সাধারণ মানুষ সব সময় পর্তুগিজদের ভয়ে কাঁপতো। মহাকবি আলাওলসহ সে সময় বিভিন্ন কবির বর্ণনায় এ বিষয়টি ফুঁটে উঠেছে। সাধারণভাবে পর্তুগিজদের বাংলার সাধারণ মানুষ “ফিরিঙ্গি” কিংবা “হার্মাদ” নামে ডাকতো। দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্ভর করতো, এদেশের মানুষের ওপর তারা সীমাহীন অত্যাচার চালাতো। পরবর্তীতে নবাব আলীবর্দি খাঁ পর্তুগিজদেরকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করেন।

শুধু তাই নয়, ইংরেজি শব্দ “Colonisation” এর বিকাশ ঘটেছে পর্তুগিজদের মাধ্যমে। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপ সামাজিক ও আর্থিকভাবে পর্যদুস্ত হয়ে পড়ে, এর সাথে যুক্ত হয় ব্ল্যাক ডেথসহ বিভিন্ন ধরণের মহামারি দুর্যোগ। কৃষিক্ষেত্রেও ইউরোপ ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ে, সেই সাথে যুক্ত হয় প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রাচুর্যতা। তাই বাধ্য হয়ে টিকে থাকার জন্য ইউরোপিয়ানদেরকে বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনের পথে হাঁটতে হয় যার প্রেক্ষিতে শুরু হয় উপনিবেশবাদ।

পর্তুগাল ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে একটি, এমনকি আজকের দিনেও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পর্তুগালে বেতন কাঠামো সবার নিচের দিকে। পর্তুগাল যেহেতু সরাসরিভাবে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত তাই সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার মতো বিভিন্ন মহাদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানের বিষয়টি তাদের হাত ধরে জনপ্রিয়তা পায়। প্রয়োজনের স্বার্থে তারা এ ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। এভাবে শুরু হয় কলোনাইজেশন। ধীরে ধীরে ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশ তাদেরকে অনুসরণ করতে শুরু করে। ওশান ইকোনোমির পাইওনিয়ারিং ফাদার হিসেবেও পর্তুগালকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ব্রাজিল, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, কেপ ভার্দে, গিনি বিসাউ, পূর্ব তিমুর ও সাও টোমসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তারা উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। এমনকি এশিয়ার ম্যাকাওতেও বর্তমানে তাদের কলোনি রয়েছে। তুলনামূলকভাবে ব্রিটিশ, ফরাসি, ডাচ ও স্প্যানিশ কলোনির দেশগুলোর চেয়ে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সূচকে পর্তুগিজ কলোনিগুলো অনেক পিছিয়ে। এর কারণ হিসেবে ব্রাজিলের ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোর পিএইচডি গবেষক ভিক্টোরিয়া ইসকুয়েলার বলেছেন, ব্রিটিশরা কিংবা ফরাসিরা যে সকল দেশে কলোনি স্থাপন করেছে সে সকল দেশে তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য কাজ করেছে কিন্তু পর্তুগিজরা সে অর্থে শিক্ষা বিস্তারের বিষয়ে তেমন একটা আগ্রহী ছিলেন না।

ভিক্টোরিয়া আরও বলেন, “ব্রাজিল ও আফ্রিকাসহ যে সকল দেশে পর্তুগিজদের কলোনি ছিল সে সকল দেশ থেকে তারা ব্যাপক লুট করেছে এবং এ সকল স্থানে তারা হানাহানি বৃদ্ধিতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। ফলে একতরফাভাবে আমরা শোষণের শিকার হয়েছি কিন্তু বিনিময়ে তেমন একটা লাভবান হই নি যা পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা দেশগুলোকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সূচকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে।”

ইতিহাস পর্যালোচনা করে তাই বলা যায় পর্তুগালের ভাস্কো দা গামাকে ইউরোপীয়দের চোখে যতোই নন্দিত হোক না কেনও, ভাস্কো দা গামা এবং পর্তুগিজদের উত্থান ভারতবর্ষ তো বটে এমনকি গোটা পৃথিবীর জন্য আদৌতে কখনও সুখকর ছিল না। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাজনের পেছনে যদি সাম্প্রদায়িকতাকে দায়ী করা হয় তাহলে উপমহাদশে সে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির পেছনে সূক্ষ্ম জাল রচনা করেছিলেন সেদিনের ভাস্কো দা গামা, এমনকি উপনিবেশবাদের মাধ্যমে এক সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠনের যে নির্মম ইতিহাস সেটার কারণে তিনি ও তার দেশ পর্তুগাল কোনোভাবে দায় এড়াতে পারেন না।

Leave a Reply