করোনা ভাইরাস ও বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের বর্তমান চিত্র

করোনা ভাইরাস ও বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের বর্তমান চিত্র

প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। সারা পৃথিবীর প্রায় সবকটি দেশে আমাদের অভিবাসী কর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে প্রতিনিয়ত সচল রাখছেন। আমাদের কৃষি ও গার্মেন্টস খাতের আয়ের পরে রেমিট্যান্স আয়ের অবস্থান রয়েছে যা বিশাল এক সম্ভাবনাময়ী এক সেক্টর। ধারনা করা হচ্ছে বাংলাদেশের জিডিপি’র প্রায় ১০ শতাংশ প্রবাসীদের আয়ের মাধ্যমে অবদান রাখে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা পৃথিবীর অর্থনীতি যেখানে অস্থিতিশীল সেখানে এ বছরও ১৮বিলিয়ন ইউএস ডলারের বেশি রেমিট্যান্স প্রবাসীরা দেশে পাঠান যা অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাকের মতে এই টাকার অংকটি গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি যা একটি ইতিবাচক সংবাদ। তবে আইন অনুমোদিত চ্যানেল ছাড়াও হুন্ডি ও অন্যান্য অবৈধ উপায়ে দেশে রেমিট্যান্স আসে তা বন্ধ করা দরকার তাহলে বৈদেশিক আয়ে স্বচ্ছতা আসবে এবং এই টাকা অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারবে।


সরকারি মতে- গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ লোক বিদেশে নানাবিধ পেশায় চাকুরী  করতে দেশ ত্যাগ করেছেন। সরকারি হিসাব মতে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন যারা আনুমানিক বিশ্বের ১৭০ দেশে কর্মরত আছেন।  শুধুমাত্র গত বছরে ৭ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন যেখানে ১ লাখের মত নারী  কর্মী রয়েছে। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এ বছরের মে মাস পর্যন্ত আনুমানিক ১ লাখ ৮২ হাজার কর্মী বিদেশে গেলেও বছরের মাঝামাঝিতে কর্মীর যাওয়ার পরিমান প্রায় শূণ্যেও কোটায় এসে পৌছেছে। সুখবর হচ্ছে বছরের শেষ নাগাদ ক্রমান্বয়ে যাওয়ার পরিমান বাড়ছে কিন্তু এটি খুব বেশি আশানুরুপ নয়। সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদেশে আবার কর্মী যাওয়ার হার বাড়াতে সরকারি উদ্যোগ নেয়া জরুরী যার পদক্ষেপ খুব বেশি দৃশ্যমান নয়।

  
বিশ্ব ব্যাংক সুত্র মতে প্রতিবছর বাংলাদেশের শ্রম বাজারে ২০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ যুক্ত হচ্ছে। এই সংখ্যার প্রায় এক তৃতীংাশ বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে চাকুরির সুযোগ গ্রহণ করে দেশের বেকার সমস্যা লাঘব হচ্ছে যা শ্রম অভিবাসনের একটি ইতিবাচক দিক। যদিও নানাবিধ সীমাবদ্ধতা থাকার কারনে আমাদের শ্রম শক্তির চাহিদার তুলনায় তাদের দেশের মধ্যে শোভন কাজ বা আয় করার সঠিক কোন পন্থা সরকার দিতে পারেনা সে ক্ষেত্রে শ্রম অভিবাসনকে বরাবর একটি আশির্বাদ হিসেবে দেখা হয়। সুতরাং অভিবাসন ও রেমিটেন্স আমাদের দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ন একটি সেক্টর যা কোনভাবে উপেক্ষা করা যাবে না। তাই এই খাতে সরকারিভাবে আরো বেশি উদ্যোগ নিতে হবে যাতে অভিবাসন ইস্যুতে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা আরো বেশি রেমিট্যান্স দেশে আনতে পারি। এনজিও, নাগরিক সমাজ এবং প্রাইভেট সেক্টরকেও সরকারের সাথে কোঅর্ডিনেশন করে এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করতে হবে।


আমাদের অভিবাসী কর্মীরা পৃথিবীর প্রায় সবকটি দেশে কমবেশি সংখ্যায় চাকুরীরত থাকলেও তবে মধ্যপ্রাচ্য’র শ্রম বাজারে তারা বেশি কাজ করছেন।পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া, হংকং, দক্ষিন কোরিয়া ও সিংগাপুরের শ্রমবাজারও আমাদের জন্য একটি বড় অভিবাসী গ্রহণকারী দেশ। জাপানেও সম্প্রতি সরকার কর্মী পাঠানোর নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছেন যা আশা ব্যাঞ্জক এবং লাভজনক একটি দেশ হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। যদিও হংকং, কোরিয়া ও সিংগাপুরের কর্মীরা নিয়মতিভাবে আসা যাওয়া করছেন কিন্তু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নানাবিধ অনিয়মে কারনে বিগত কয়েক বছর ধরে এই বাজারটি প্রায় এক রকম বন্ধ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরে মালয়েশিয়া আমাদের কর্মীদের পছন্দের গন্তব্য বিধায়  সরকারের উচিত এই দেশটির শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া। তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়াতে কর্মী পাঠিয়ে আমাদের করোন পরিস্থিতির কারনে বৈদেশিক কর্মস্থানের যে ঘাটতি ইতোমধ্যে দেখা গেছে তা কিছুটা হলেও ক্রমান্বয়ে পূরণ করা যাবে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
সাম্প্রতিক সময়ে কভিড’১৯  কারনে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীর সকল পেশাজীবির মত এই খাতটিও সমস্যায় পতিত হয়েছে।  নানাভাবে জানা যায় আমাদের অভিবাসীরাও এই পরিস্থিতির কারনে বর্তমানে দেশে ও বিদেশে সমস্যায় পড়ে এবং এখনো অনেকে বিদেশে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সরকারি মতে এ বছর ইতোমধ্যে প্রায় ৩লাখ ৮৬ হাজার কর্মী দেশে ফিরে এসেছে। অবশ্য এদের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবে অর্থাৎ চাকুরির মেয়াদ শেষ হওয়া বা ছুটিতে দেশে ফিরে এসেছেন বলে সরকার মত প্রকাশ করছেন। আবার একটি বড় অংশ করোনার কারনে সেখানে কাজ না থাকার কারনে চাকুরী হারিয়ে বা কেউ করোনার ভীতিকর অবস্থায় পড়ে তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরে এসেছেন। যারা করোনার কারনে অনাকাঙ্খিতভাবে দেশে ফিরে এসেছেন তাদের চাকুরীতে পুনরায় ফেরত যেতে সরকারকে জোর উদ্যোগ নিতে হবে না হলে দেশে বেকারত্ব বাড়তে থাকবে।


এইতো কিছুদিন আগে আইএলও কর্তৃক ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক ২০২০’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনটিতে বলা হয় – করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আট কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছে।  করোনার কারনে মানুষের চলাচল স্থবির হয়ে যাওয়া ও কর্মক্ষেত্র অনেকাংশে বন্ধ থাকায় এ অঞ্চলের মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব পড়েছে যা এখনকার মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে বলেও রিপোর্টটিতে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের কোটি কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে শুধুমাত্র করোনার কারনে লকডাউন ঘোষনা করার কারনে। এই তথ্য উপাত্ত যদি বিশ্লেষন করে দেখা যায়- তাহলে বাংলাদেশও কোন অংশে নিরাপদ না বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। সুতরাং আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, করোনার ভয় থেকে যেহেতু কেউ এখনো নিরাপদ নই তাই সচেতন থেকে বিকল্প উপায়ে আয়ের রাস্তা খুঁজে বের করা জরুরী। না হলে শ্রম অধ্যুষিত এই দেশে কর্মহীন মানুষের মধ্যে হতাশা ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরী হবে যার সমাধান এখনি জরুরী। তাছাড়া বিদেশে যাওয়ার হার যদি কমে যায় এবং প্রবাসে অবস্থানরতরা যদি ফিরে আসতে থাকেন তাহলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরো ঘনীভূত হবে।


ইতোমধ্যে সরকার করোনা ইস্যুতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ বিদেশ ফেরতদের পুনরেকত্রীকরনের জন্য নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যেমন- প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয় স্বল্পসুদে বিশেষ ঋনদান কার্যক্রম শুরু করেছে, সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কাজের উপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এনজিও এবং প্রাইভেট সেক্টরও নানাবিধ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তবে এই উদ্যোগটি বিক্ষিপ্তভাবে না হয়ে সবাই মিলে ’ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ আকারে দিলে সেবা গ্রহিতা চাহিদামাফিক সেবাসমূহ সহজে পাবেন বলে ধরে নেয়া যায়। আর একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার- যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি তাকে এসব কার্যক্রমে সবার আগে অন্তর্ভূক্ত করা ও দ্রুততম সময়ে সহায়তা দেয়া দরকার।

‘মুজিব বর্ষের আহ্বান, দক্ষ হয়ে বিদেশ যান’- এই শ্রোগান নিয়ে এই বছর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’২০২০ পালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রতি উপজেলা থেকে আগামীতে বছরে ১০০০ মানুষকে বিদেশে পাঠাতে ইচ্ছা পোষন করেন। আমরা প্রধান মন্ত্রীর এই ইচ্ছাকে স্বাগত জানাই যা খুবই যুগোপযোগী একটি সিদ্ধান্ত। তবে সে লক্ষ্যে আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি এখনি নেয়া দরকার। যেমন- বিদেশে যাওয়ার আগে ভালোভাবে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া, তারপর প্রশিক্ষণ, বৈধ কাগজপত্র সংগ্রহ ও সরকার ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশে যাওয়ার পদক্ষেপ নেয়া। আর যারা বিদেশে যেতে ইচ্ছুক নন- তারাও যেন প্রশিক্ষন গ্রহণ করে দেশে স্ব-কর্মসংস্থানে নিয়োজিন হন। আমরা মনে করি এই ক্রান্তিকালে আমাদের শ্রম শক্তির যদি সঠিক ব্যবস্থাপনা আনতে পারি তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাবে এবং বিশ্বের দরবারে আমাদের মর্যাদা ও অবস্থান আরো বেড়ে যাবে।

লেখক: ফরহাদ আল করিম, মাইগ্রেশন এক্সপার্ট

Leave a Reply