কানাডার কুইবেকে গ্রীক অধিবাসীরা এসেছিল ৩৭৮ বছর আগে
১৮৫০ সালের মাঝামাঝি সময় হতে গ্রীকরা স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাস শুরু করে। এরও দেড়শ বছর আগে প্রথম গ্রীকরা কানাডায় আসেন।

কানাডার কুইবেকে গ্রীক অধিবাসীরা এসেছিল ৩৭৮ বছর আগে

মাসুদুল হাসান রনি :

গ্রীক সভ্যতা,ইতিহাস, সংস্কৃতি নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক পুরানো। সময় সুযোগ পেলেই খুঁজে খুঁজে বের করতাম গ্রীস নিয়ে লেখা বই পত্তর। দেশে খুব একটা সুযোগ হয়নি তেমন। এখানে আসার পর তো আছি একসময়ের গ্রীক অধ্যুষিত অঞ্চলে।আমার অনেক নেইবার গ্রীক কানাডিয়ান। দীর্ঘদিন যাবত খুব কাছ থেকে তাদের দেখা, জানার সুযোগ হয়েছে। সমস্যা হলো তারা সহজে ইংরেজি বলতে চায় না।এমন কি ফ্রেঞ্চও না। তারা চায় সবার সাথে গ্রীক ভাষাতে কথা বলতে। সৌভাগ্যক্রমে আমার বাসার উল্টোদিকের এক বৃদ্ধ দম্পতি পেয়েছি যারা খুবই আন্তরিক । নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে কথা বলার মানুষ না থাকায় দু’জনেই কথা বলতে আগ্রহী। যাওয়া আসার পথে তাদের সাথে দেখা হতো। হাই হ্যালো, গুড মর্নিং, হ্যাভ এ নাইস ডে ছাপিয়ে তারা একদিন বিনয়ের সাথে জানতে চেয়েছিল, তোমার সময় আছে? আমাদের সাথে কফি খাবে।’

সেদিন কফিপানের জন্য আন্দ্রেস দম্পতির সাথে সময় কাটাতে গিয়ে চমৎকার সম্পর্ক হয়।এরপর আন্দ্রেস দম্পতির সাথে প্রায় প্রতিদিন দু’চার মিনিট কথা হতে হতে তারা আমাকে আপন করে নিয়েছেন। আমার গ্রীক সম্পর্কে আগ্রহ দেখে ইংরেজিতে লেখা সোফিয়া ফ্লোরাকাস পেটসালিসের “স্বপ্ন গড়ারঃ মন্ট্রিয়ালের আদি গ্রীক অভিবাসীদের গল্প” ( “To Build the Dream: the Story of the Early Greek Immigrants in Montreal. By Petsalis) বই দিয়েছিল। বইটি গ্রীকদের কানাডায় আগমনের ইতিহাসের কিছুটা হলেও জানার ক্ষুধা মেটায়।
২.
কানাডার কুইবেকে গ্রীক অধিবাসীরা এসেছিল ৩৭৮ বছর আগে। আমি যে এলাকাটিতে বাস করি, সেই মন্ট্রিয়েলের পার্ক এক্স একসময় ছিল গ্রীকদের আধিপত্য। কালক্রমে তারা এখানে এখন সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকানদের আগমন বৃদ্ধি পাওয়ায়। গ্রীকদের বেশীরভাগই পার্ক এক্সের বাড়ি ঘর বিক্রি ও ভাড়া দিয়ে চলে গেছেন অন্যত্র। খুব কম সংখ্যক গ্রীক-কানাডিয়ান এখন পার্ক এক্সে বসবাস করেন। তাদের বেশ কিছু ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ছড়িয়ে আছে তাদের অর্থোডক্স চার্চ, কমিউনিটি সেন্টারসহ নানান স্থাপনা।

জানতালুন এভিনিউর পাশে রুয়ে ডিলিপি’র ছোট পার্কে আছে দেবী এথেনার ভাস্কর্য। বাংলাদেশীদের কাছে এথেনা পার্কটির নাম হয়ে গেছে বুড়োদের পার্ক। এর কারণ এখানে সামারে প্রাতঃভ্রমন, বৈকালিক ভ্রমন এবং সারাক্ষনই বয়স্ক নর নারীদের অফুরন্ত অবসর কাটানোর মিলনস্থল।
জানতালুন এভিনিউর দু পার্ক এভিনিউ ক্রসিংয়ের ঠিক পাশেই রয়েছে গ্রীক অধিবাসী আগমনের ৩৭৪ বছর পুর্তিতে স্থাপিত ভাস্কর্য। এতে দেখা যায়, সন্তানসহ ব্যাগ হাতে গ্রীক একটি পরিবারের কুইবেক আগমনের মুহুর্তটিকে স্মরন করে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় ২০১৭ সালে। এটি স্থাপন করে হেলেনিক সম্প্রদায় ও বৃহত্তর মন্ট্রিয়ালের লসি ডেস ফেমস হেলেনিক্স ডি মন্ট্রিয়াল।
১৮৫০ সালের মাঝামাঝি সময় হতে গ্রীকরা স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাস শুরু করে। এরও দেড়শ বছর আগে প্রথম গ্রীকরা কানাডায় আসেন। সেই সময় গ্রীক নাবিকরা কুইবেক শহরের কাছে জাহাজ ভিড়িয়েছিলেন। তখন স্বল্প সংখ্যক গ্রীক কুইবেকে স্থায়ীভাবে রয়ে যায়। ১৯০০ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে গ্রীকদের এই সংখ্যাটি ২ হাজারে দাঁড়িয়েছিল। তাদের বেশিরভাগ গ্রীক এবং তুর্কিদের মধ্যে যুদ্ধ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল। উসমানীয় সাম্রাজ্যের এই যুদ্ধে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।

যদিও মন্ট্রিয়েলে গ্রীকদের বহু দশক ধরে উপস্থিতি ছিল, বাস্তবে উনিশ শতকের শেষের দিক থেকে ১৯৫৩ সালে আইওনিয়ান দ্বীপপুঞ্জের উপর আঘাত হানে বড় ভূমিকম্প । তখন নতুন করে গ্রীক অভিবাসীদের প্রচুর আগমন ঘটে। এই বাস্তুচ্যুত গ্রীকরা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কানাডাকে বেঁছে নিয়েছিল। এর সাথে অর্থনৈতিক সংকটের কারনেও অনেকে বাধ্য হয়েছিল গ্রীস ছেড়ে আসার জন্য। সেই সময় কানাডার শিথিল অভিবাসন নীতি থাকায় গ্রীকদের বিরাট অংশ ১৯s০ এর দশকে গ্রীস ত্যাগ করেছিল। মন্ট্রিয়েলে গ্রীকদের সংখ্যা ১৯৬৭ সালে ৩,০০০ থেকে ১৫ গুণ বেড়েছে। তারা তাদের নিজস্ব সমিতি, নিজস্ব রেস্তোঁরা, নাইটক্লাব শুরু করেছিল এবং এমনকি তাদের গ্রীক চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীর সংখ্যাও বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিল। ফলে শীঘ্রই গ্রীকদের একটি নতুন সংস্কৃতি দেখা যায়, যারা মন্ট্রিয়েল কানাডিয়ান সমাজের সাথে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করেনি বরং তারা নিজেদের মতো নিজস্ব বলয়ে, নিজস্ব পরিবেশে বাস করাকে পছন্দ করত। পার্ক এক্সকে তখন লিটল গ্রীস নামে অভিহিত করা হত।
তাদের সন্তানদের কানাডিয়ান সমাজের সাথে সংযোগ ছিল। তাই বেশিরভাগ যুবক কানাডিয়ান হয়ে উঠেছিল। তবে কোনও গ্রীককে আর বিদেশী ভাষা শেখার দরকার পড়েনি। তারা গ্রীক পরিবেশে কাজ করতে, শপিং করতে এবং খেলাধুলায় সক্ষম ছিল। কিন্ত সরকারী কাজে, ব্যবসার প্রয়োজনে খুব কমই ইংরেজি বা ফ্রেঞ্চের প্রয়োজন হত। এমনকি চিকিৎসার প্রয়োজনে কোন ডাক্তারকে দেখাতে গিয়ে কেবল জরুরি অবস্থাতে ইংরেজিতে কথা বলা দরকার যেহেতু, সেখানে অনেক গ্রীক পরিবারের সন্তানরাই দোভাষী হিসেবে কাজ করতো।

গ্রীকদের কানাডায় আগমন ও জীবন যাপন সম্পর্কে সোফিয়া ফ্লোরাকাস পেটসালিসের লেখা “স্বপ্ন গড়ার: মন্ট্রিয়ালের আদি গ্রীক অভিবাসীদের গল্প” বইতে এসব সবিস্তারে উল্লেখ আছে। তিনি লিখেছেন,’ একসময় অধিকাংশ নতুন গ্রীক অভিবাসীদের মনোভাব ছিল পাঁচ বছর কানাডায থাকবো এবং তারপরে প্রচুর অর্থ নিয়ে গ্রীসে ফিরে যাব। দেশে ফিরে জীবনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করব। দুর্ভাগ্যক্রমে, বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে কেবলমাত্র সামান্যসংখ্যকই যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যদিকে তাদের বাচ্চারা এখানে ভালভাবে মিশে যাচ্ছিল তাই চলে যাওয়ার আগ্রহী ছিল না। “
তিনি দেখিয়েছেন, কেন গ্রীকরা কানাডায় দলে দলে এসেছেন। কেন স্থায়ী হতে চেয়েছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্রীসের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায়, মারাত্মক খরার কবলে পড়ায় কৃষিতে আশানুরূপ উৎপাদন হয়নি। এছাড়া ১৯৬৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থান এবং গ্রীসের নাগরিকদের অধিকার হ্রাস করার ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটায় প্রচুর সংখ্যক গ্রীক দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় এবং তাদের গন্তব্য হয়ে উঠে কানাডা।

এ সময় পুর্ব হতে কানাডায় বাস করা অনেক পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই কর্মজীবি হওয়ায় সন্তান লালন পালনে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তাদের বাচ্চাদের জন্য লালন পালনের কোনও সময় ছিল না। পরিবারে চরম বিশৃংখলতা দেখা দেয়। অই মুহুর্তে তাদের হাতে দু’টি বিকল্প ছিল, হয় বাচ্চাদের লালন-পালনের জন্য গ্রীস থেকে দাদা-দাদিদের নিয়ে আসা বা সন্তানদের বড় করার জন্য তাদের দাদা-দাদির কাছে বাচ্চাদের গ্রীসে ফেরত পাঠানো।
সোফিয়া ফ্লোরাকাস পেটসালিস তার গ্রীক বন্ধুদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে লিখেছেন,’ আমার বেশিরভাগ বন্ধুদের কাছে শুনেছি তাদের ১ বা ২ বছর বয়সে গ্রীসে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ১১ বা ১২ বছর বয়স হবার পর কানাডায় এসে প্রথম তাদের বাবা-মায়ের দেখা পেয়েছে। বিপরীতভাবে কারও কারও কাছে তাদের দাদা-দাদির সাথে খারাপ ব্যবহারের গল্প রয়েছে। যখন তাদের বাবা-মা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে যাওয়ায় খুব কম দাদা-দাদির মধ্যে সন্তান প্রতিপালনের দক্ষতা ছিল। ফলশ্রুতিতে অনেক পরিবারে তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে।

সোফিয়া লিখেছেন, শুধু অর্থনৈতিক মন্দার কারনে গ্রীকরা তো এসেছেই, আবার প্রচুর সংখ্যক গ্রীক তাদের সন্তান লালন পালনের জন্য বয়স্ক পিতামাতাকে নিয়ে এসেছেন।এভাবেই কানাডায় গ্রীকদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। এখন পার্ক এক্সে গ্রীক অধিবাসীর সংখ্যা বহুলাংশে কমে গেছে। সেখানে দিন দিন দক্ষিন এশীয়দের সংখ্যা বেড়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, কানাডায় দক্ষিন এশীয়দের প্রথম আগমন ঘটে ১৯০৩ সালে বৃটিশ কলোম্বিয়ার ভ্যাংকুয়েভারে।

২৯.০৪.২০২১, মন্ট্রিয়েল

Leave a Reply