কেমন ছিল কোম্পানি আমলের সিলেট
কেমন ছিল কোম্পানি আমলের সিলেট

কেমন ছিল কোম্পানি আমলের সিলেট

ফারুক আহমদ : সনাতন কাল থেকেই সিলেটের সমাজে উঁচু আর নীচু এ দুটো ভাগ রয়েছে; মধ্যবিত্তের বিকাশ তেমন ঘটে নি। সে ভাবেই সিলেটী ভূমিবৃত্তিক মুসলিম সমাজ প্রধানত আশরাফ ও আতরাফ (অর্থাৎ উচ্চ ও নীচ) এ দুইভাগে বিভক্ত ছিল। কিন্তু সেটা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় নয়। আমাদের আলোচ্য হচ্ছে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে সিলেটের কী ভাবে ভূমিবৃত্তিক অভিজাত সমাজ গড়ে ওঠেছিল? এ উত্থান-পতনের পেছনে কি কি ঘটনা ও বিষয় কাজ করেছিল? এগুলো জানতে হলে তাঁদের আভিজাত্যের নিদর্শন অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনামলের এ সমাজের মানুষের জীবনযাত্রা, ঘরবাড়ি ইত্যাদি কেমন ছিল, কি কি ঘটনা তাঁদের জীবনমানের উত্তান-পথনের কারণ সেগুলোও জানা দরকার।

আরও জানা দরকার যে, ভূমিকম্প বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তাঁদের জীবনযাত্রাকে কী ভাবে প্রভাবিত করেছিল।পলাশীর যুদ্ধের ১৮ বছর পরের কথা। সিলেটে কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জন সামনার ১৭৭১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় কোম্পানির প্রধান সুপারভাইজার টমাস ক্যালসালের কাছে একটি চিঠি পাঠান। এ পত্র থেকে জানা যায়, সিলেটে তখন মাত্র একটি ইটের গৃহে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় রাজস্ব হিসেবে আদায় করা কৌড়িগুলোর (প্রচলিত মুদ্রা) শহরের বিভিন্ন স্থানে রাখা হচ্ছিল।  জন সামনারের পরের কালেক্টর উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারের জীবনী থেকে জানা যায় যে, তিনি যখন সিলেটে পৌঁছান, তখন শহরে তাঁর ন্যায় একজন ইউরোপীয় সরকারি কর্মচারীর বসবাসের উপযোগী কোনো বাড়িঘর ছিল না। এমন কী ইটের তৈরি কোনো দফতরখানাও ছিল না। সিলেটে পৌঁছার মাস কয়েক পরে, ১৭৭২ সালের ৫ডিসেম্বর তিনি তাঁর নিজের বসবাসের উপযোগী একখানা বাসা নির্মাণের অনুমতি চেয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কাছে এ মর্মে আর্জি পেশ করেন যে, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বর্তমান বাসাটিতে বসবাস করা কঠিন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাসা তৈরির জন্য চুনের দামও খুব সস্তা।  এ নিয়ে ঢাকা কুঠি, এবং বোর্ড অব কন্ট্রোলের সঙ্গে অনেক চিঠি চালাচালি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭৭৩ সালের ২৬ জানুয়ারি থ্যাকারে বাসা/বাড়ি নির্মাণের অনুমতি পান।  বাসাটি নির্মাণের প্রায় একশ বছর পরে, উইলিয়াম উইলসন হান্টার সিলেট এসে থেকারের সেই বাসাটি দেখতে পান। সিলেট ডিসট্রিক্ট রেকর্ডে বলা হয়েছে যে, জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছেই – তৎকালীন নবাব তালাবের পশ্চিমে – বাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। 

বর্তমান এমসি কলেজের প্রিন্সিপালের বাংলোটি যে টিলায় অবস্থিত সেই টিলাটিও আজ পর্যন্ত ‘থ্যাকারে  টিলা’ নামেই পরিচিত। কারও কারও অভিমত থ্যাকারে পরবর্তীকালে এ টিলার ওপরে বসবাসের জন্য আরেকটি গৃহও নির্মাণ করিয়েছিলেন।  এ অভিমতের পক্ষে কোনো প্রমাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। থ্যাকারে সিলেট থেকে চলে যাবার সময় তিনি তাঁর ভায়েরা ভাই পিটার মোরকে সহায়-সম্পত্তি দেখভালের আইনগত ক্ষমতা দিয়ে যান। ১৭৭৬ সালে অটাম  কালে থ্যাকারের স্থলাভিসিক্ত হন বরার্ট লিন্ডজি। সিলেটে পৌঁছে তিনি থ্যাকারের বাসাতেই ওঠেন। ১৭৭৭ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকার প্রাদেশিক রাজস্ব প্রধানের কাছে লিখিত একপত্রে লিন্ডজি জানান যে, থ্যাকারের যে বাড়িটিতে তিনি অবস্থান করছেন সেটা খালি করে বিক্রি করে দেবার জন্য জনৈক রিচাডসন সিলেট এসেছেন। লিন্ডজির এ পত্র থেকে আরও জানা যায় যে, তখন পর্যন্ত এটাই ছিল সিলেট শহরে ‘ইউরোপীয় অফিসারের বসবাসের উপযুক্ত’ একমাত্র আস্তানা।  পরে, ১৭৭৮ সালের নভেম্বর মাসের দিকে লিন্ডজি কোম্পানির অনুমতিক্রমে বাসাটি থ্যাকারের ভায়েরা ভাইয়ের কাছ থেকে কিনে নেন।  থ্যাকারে নিজের বসবাসের জন্য একটি ইস্টকালয় তৈরি করালেও, পাকা করে কোর্ট-কাচারি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি। তখন পর্যন্ত সবই ছিল খড়, বাঁশ, কাঠ, বেত দিয়ে তৈরির ব্যবস্থা। এ তথ্যগুলো জানা যায়, বরার্ট লিন্ডজি সিলেটে কালেক্টর হিসেবে যোগদানের দশ বছর পরে, ১৭৮৬ সালের ৬ জানুয়ারি রেভিনিউ কমিটির প্রেসিডেন্ট ও মেম্বারদের কাছে পাঠানো একটি দরখাস্তপত্র থেকে। এ পত্রে লিন্ডজি জানান যে, সিলেটে ঋণখেলাফি অথবা অপরাধীদের রাখার উপযুক্ত কোনো ইটের দালান নেই। কয়েদিদের রাখার জন্য নির্মিত খড়ের ঘরগুলোও সম্প্রতি আগুন লেগে পুড়ে গেছে। তাই তিনি ইট দিয়ে একটি জেলখানা নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দিয়ে উল্লেখ করেন যে, তৈরি হলে পরে এটিকে একই সঙ্গে আদালত ও ফৌজদারি কোর্ট হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সিলেটে কাঁচামাল খুবই সস্তা, সে জন্য আনুমানিক ব্যয় হবে ১৬ শ’ রুপি। এর তিন মাস পরে, ৩০ মার্চ দরখাস্তটি অনুমোদিত হলে, সিলেটে প্রথম পাকা জেলখানা নির্মিত হয়।  তবে এ জেলখানটি কোথায় নির্মিত হয়েছিল এ সম্পর্কে বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।  

থ্যাকারের পরের কালেক্টর রবার্ট লিন্ডজি ঢাকা থেকে সিলেট পৌঁছার পরে স্থানীয় কর্মকর্তাগণ তাঁকে অভ্যর্থনা দেয়। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিন্ডজি লিখেছেন, ‘তাঁরা আমাকে আমার নির্ধারিত বাসায় নিয়ে গেলেন। শহর কোথায় খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম এটি সামান্য বাজার মাত্র। বাড়িঘরের নির্মাণশৈলী চমৎকার, তবে ঘন গাছগাছড়ায় ঘেরা অনেকগুলো পাহাড়ি টিলার ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে যে, সহজে চেখে পড়ে না। শহরটি অদ্ভুত দেখালেও এতে আরামের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়।’লিন্ডজির পরে ১৭৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটের কালেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জন উইলিস। ১ মার্চ তিনি ফোর্ট উইলিয়ামের প্রেসিডেন্ট এবং বোর্ড অব রেভিনিউয়ের সদস্য জন শোর-এর লিখিত এক চিঠির জবাবে জানান যে, কাচারি ও জেইলখানা ছাড়া সিলেটে কোম্পানির অধীনে আর কোনো বাড়িঘর নেই। এগুলোর মধ্যে খড়কোটার তৈরি জেইলখানার অবস্থা শোচনীয়।  ১৪ মার্চ তিনি গভর্নর জেনারেলের কাছে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে জানান যে, তিনি হিসেব করে দেখেছেন সিলেটে একটি উপযুক্ত ইট দিয়ে তৈরি করতে তিন হাজার রুপি (৩,০০০) খরচ পড়বে।  তাঁর সময়ে (১৭৮৯-১৭৯৩) ধুপাদিঘির পাড়ে ২৪.৬৭ একর ভূমির ওপর বর্তমান জেলখানাটি নির্মিত হয়। এ সকল কাহিনি থেকে অনুমান করা যায় যে, সেকালে কিছু কিছু ধর্মীয় উপাশনায় অর্থাৎ মসজিদ, মন্দির, স্মৃতিস্তম্ভ, এবং ছোট ছোট পুল পাকা ছিল বটে কিন্ত জমিদার-তালুকদার তো বটেই নবাব কিংবা ফৌজদারদের বসবাসের জন্য বাড়িঘর ও সরকারি অফিস-আদালতও ছিল কাঠ ও খড়কুটোর তৈরি। তখনকার পাকা দালানকোঠার অক্ষত তো বটেই ভগ্নাবশেষ বা নিদর্শনেরও প্রামাণ্য দলিল বা ছবি পাওয়া যায় না। 

জানা যায়, উপযুক্ত রক্ষাণাবেক্ষণের অভাবে মুসলমান শাসনামলের দলিলপত্রের কয়েকটি কপি ছাড়া বাকিগুলো হয় হারিয়ে যায়, অথবা কালক্রমে নষ্ট হয়ে যায়। কোম্পানির আমলে, কানুনগোদের কাছ থেকে উদ্ধার করা দলিল-দস্তাবেজ, সিলমোহর, ফৌজদারদের দেয়া তথ্যাদির ভিত্তিতে প্রায় চল্লিশ জনের মত আমিল ও ফৌজদারদের নাম উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে সেগুলোই মোগল ও নবাবি আমলের সিলেটের ইতিহাস নির্মাণের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। ১৮১৬ সালে ক্যামেরা আবিষ্কৃত হলেও, এটা সাধারণ মানুষের নাগালে আসে ১৮৮৮ সালের দিকে। এর আগের ছবিগুলো বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা তৈলচিত্র বা রেখাচিত্রের মাধ্যমেই আমাদের কাছে এসেছে। ১৮৫০-এর কোঠার কোনো এক সময় লেফটেন্যান্ট আর্থার আর হাওস সিলেট শহরের একটি রেখাচিত্র (স্কেচ) অঙ্কন করেন। এটি ১৮৫৮ সালের ২৩ জানুয়ারি লন্ডন থেকে প্রকাশিত ইলাস্ট্রেইডেট টাইম্সে-এ প্রকাশিত হয়। এ চিত্র থেকে অনুমান করা যায় বাস্তবে সিলেট শহর তখন কেমন ছিল।১৮৬৮ সালে প্রকাশিত প্রিন্সিপাল হেড্স অব দ্য হিসট্রি অ্যান্ড স্টাটিসস্টিক্স অব ঢাকা গ্রন্থে সিলেটের বাড়িঘর সম্পর্কে যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা হল, ‘সাধারণভাবে বাড়িঘর হল বাঁশের বেড়্ াও ঘাসের ছাওনী দিয়ে তৈরি ছোট ছোট কিছু কুটিরের একটি সমাবেশ। তবে কিছু বাড়িঘর মজবুতভাবে কাঠ দিয়ে তৈরি। খোদ টাউন ছাড়া, পাকা বাড়িঘর খুবই কম। এবং সাধারণ মাটির দেয়াল অজ্ঞাত।’  

ভূমিকম্প  ও ক্ষয়ক্ষতিসিলেটে ১৮৯৩ সালের অগাস্ট মাস, ১৮৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস ও ১৯০৩ সালের জুলাই মাসে পরপর তিনটি ভূমিকম্প হয়। তবে এ সময় সিলেট অঞ্চল খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি।১৮৬৯ সালে বঙ্গদেশে একটি বড় ধরণের ভূমিকম্প হয়েছিল। এর কম্পন বিস্তৃত ছিল ২৫০,০০০ বর্গমাইল এলাকা ব্যাপী। জৈন্তিয়া পাহাড়ের উত্তর দিক থেকে সৃষ্টি হওয়া এ ভূমিকম্পের বিস্তৃতি ছিল বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) থেকে (বর্তমান ভারতের) পাটনা ও হাজারিবাগ পর্যন্ত। ভূমিকম্পে সিলেট শহরের গির্জার চূড়া ভেঙে পড়ে। কাছারি ঘরের দেওয়াল ও সার্কিট বাংলোর দেয়ালে ফাঁটল দেখা দেয়। সিলেটের পূর্বাঞ্চলের নদীতীরের অনেক জায়গা ধসে যায়। তবে ভূমিকম্পে কোনো মানুষ মারা যায় নি।  এ ভূমিকম্পের এগার বছর পরে, ১৮৭৯ সালে উইলিয়াম উইলসন হান্টার সিলেটের বাড়িঘরের যে বিবরণ দেন তা হল, সম্পন্ন দোকানদাররা সাধারণ ৪/৫ কামরার আধা-পাকা অথবা বাঁশবেতের বেড়া বা চাটাই দিয়ে তৈরি বাড়িতে থাকেন।  সাধারণ কৃষকেরা তাঁদের নিজের তৈরি কুঁেড়ঘরে বাস করে। ঘর তৈরির সরঞ্জামাদি হচ্ছে ইট, চুন, কাদামাটি, কাঠ, বাঁশ, শুকনো খড় এবং চাটাই বা মাদুর। অভিজাত অনেক জমির মালিকের ঘরবাড়িও দোকানদার বা ব্যবসায়ীদের বাড়িঘরের মতই। খুব সম্ভবত আঠার শতকের প্রথম দিক থেকে সিলেটের ধনী পরিবারগুলোর বাড়িঘর পাকা ইমারতের যুগে প্রবেশ করে। উনিশ শতকের সর্বশেষ ভূমিকম্প হয় ১৮৯৭ সালের ১২ জুন। আর ডি ওল্ডহ্যামের স্মৃতিকথা মেমোর্য়াস অব জিওলোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’র তথ্য অনুযায়ী: 
এই ভূমিকম্প দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রেঙ্গুন থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে কাংরা এবং হিমালয় থেকে (বর্তমান ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে) মাসলিপাটনাম পর্যন্ত ১,৭৫০,০০০ বর্গমাইল এলাকায় অনুভূত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ১৪৫,০০০ বর্গমাইলব্যাপী জায়গার [চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি] দালান-কোঠা। ভূমিকম্পটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ‘কক্ড হ্যাট’ (বা মাথালের) আকারের মত বিস্তীর্ণ পল্লীঅঞ্চলেÑ এর তলভূমি ছিল রংপুর থেকে জৈন্তাপুর পর্যন্ত আর এর ঝুটি ছিল বরপেটা । সিলেটে আবহওয়াগত কোনো লক্ষণ ছাড়াই বিকেল পাঁচটা চল্লিশের সময় এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তবে উত্তর সুনামগঞ্জের পাহাড়ের পাদদেশের একটি গ্রামের লোকেরা জানান যে, এর কয়েক দিন আগে থেকে তারা উত্তর-পূর্ব দিক অর্থাৎ আনুমানিক শিলংয়ের দিক থেকে আসা অবিরত বিস্ফোরণের আওয়াজের মতো শুনতে পাচ্ছিলেন তাদের মনে হয়। ভূমিকম্পে সিলেটে চুন-সুরকির নির্মিত প্রায় সব ক’টি দালান মাটির সঙ্গে একেবারে মিশে যায়। সরকারি হিসেব অনুযায়ী সিলেটে ৫৪৫ জন লোক মারা যায়। এর মধ্যে সিলেট শহরে ৫৫, উত্তর সিলেটে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ১৭৪ জন, সুনামগঞ্জে ২৮৭ জন, হবিগঞ্জে ৭ জন, দক্ষিণ সিলেটে ৮ জন এবং করিমগঞ্জে ১০ জন। সিলেট শহরে চুন-সুরকির দালান ধসই হতাহতের মূল কারণ। এর মধ্যে সিলেট শহরের জেলখানার কয়েদিরা ছিল সবচেয়ে ভাগ্যবান। তাদের রাতে ঘরবন্দি করার আগে যখন আঙিনায় আয়োজন করা হচ্ছিল এর আধ ঘণ্টা পরেই ভূমিকম্পের সূচনা হয়। অন্যথায় শত শত কয়েদি মারা যেত। 


অচ্যুতচরণ চৌধুরী তাঁর শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে লিখেছেন:
এই ভীষণতম ভূকম্প বঙ্গদেশের একটি স্মৃতিপীড়ক ঘটনা। রংপুর ও শ্রীহট্টেই ইহার তীব্রতা অধিক অনুভূত হয় ১৭,৫০,০০০ বর্গমাইল ভূমিব্যাপিয়া হিমালয় হইতে মসলিপটম পর্যন্ত স্থান এককালে কম্পিত হইয়া উঠে। শ্রীহট্টে বৈকালে ৪টা ৫০ মিনিটের সময় কম্পন শুরু হয়, চালনির উপরে পরিচালিত ত-ুলের যেরূপ অবস্থা ঘটে, শ্রীহট্টবাসী সকলের অবস্থা তৎকালে অনেকটা সেইরূপ দাঁড়াইয়াছিল। মুহূর্ত্ত মধ্যে সমস্ত সহর ধ্বংসরাশিতে পরিপূর্ণ হইয়াছিল। এই ভূমিকম্প জিলার সর্ব্বত্র ভূমি চৌচির করিয়া ভূগর্ভ ঘনতে কৃষ্ণবর্ণ বালুকা ও জলস্্েরাতঃ ও অঙ্গার বর্হিগত করিয়া দিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, স্থলে বহুলোকের প্রাণ সংহার করিয়া হাহাকারের রোল উত্থিত করিয়া দিয়াছিল; গবর্ণমেন্টের রিপোর্ট পাঠে জানা যায় যে এই ভূকম্পে শ্রীহট্ট জিলায় ৫৪৫ জন লোকের প্রাণ বিনষ্ট হইয়াছিল।শ্রীহট্ট একটা প্রাচীন সহর; কিন্তু ভূকম্পে ইহার অনেক প্রাচীন কীর্ত্তি এককালে লোপ করিয়াছে। ইহার সৌন্দর্য সম্পদ একেবারে বিনষ্ট করিয়াছে! কি সরকারী, কি অধিবাসীবর্গের নির্ম্মিত, ভূকম্পের পর সহরে একটি অট্টালিকাও দ-ায়মান ছিল না; এমনকি কোনও কোনও স্থানে কুঁেড়ঘর পর্যন্ত ভূমিসাৎ হইয়াছিল। 
এই একই ভূমিকম্প সম্পর্কে ‘শ্রীহট্ট প্রতিভা’ গ্রন্থের লেখক নরেন্দ্রকুমার গুপ্ত চৌধুরীর ভাষ্য হচ্ছে:
নদীতীরের ফৌজদারী এবং কালেকটরী কাছারীর একটি ইষ্টকায়ল, নবাবি মসজিদ ও হযরত শাহজালালের মসজিদ ব্যতিত, শ্রীহট্ট শহরের প্রায় সমস্ত অফিস, কাছারী, বন্দরবাজার, স্থানীয় জমিদারগণের বাড়ী এবং অন্যান্য যাবতীয় প্রতিষ্ঠানের ইষ্টকালয়গুলি ভাঙ্গিয়া মাটিতে পড়িয়া যায়। এই সময় অগণিত লোক ইষ্টক চাপা পড়িয়া মারা গিয়াছিল। প্রায় ১৫দিন পর্যন্ত গলিত শবের দুর্গন্ধ সহরে লোক চলাচল কষ্টকর হইয়া পড়িয়াছিল। দীর্ঘ অস্থায়ী কাঁচাঘর তৈয়ারী না হওয়া পর্যন্ত স্কুল ও কাছারী বন্ধ ছিল। 
এ ভূমিকম্পের সময়ে সিলেট এম সি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা রাজা গিরিশ চন্দ্রের বসতঘরটিও ধসে পড়ে এবং তিনি এর নিচে চাপা পড়েন। তাঁকে উদ্ধার করেন স্থানীয় মাতাই মিয়া। মাতাই মিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি আজীবন তাঁকে পাঁচ টাকা পেনশন দিতেন বলে জানা যায়। এর আগে এত বড় ভূমিকম্পের কোনো খবর আর জানা যায় নি।এ ভূমিকম্পের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সুনামগঞ্জ মহকুমার ৯০টি চুন-সুরকীর ঘরের মধ্যে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি ঘর ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা থেকে রেহাই পেয়েছিল। কালেক্টর জে আর আহমোটি তাঁর (১৭৯৭-১৮০৩ সালের রিপোর্ট) বলেন যে, তিনি একটি পাকা গুদাম নির্মাণ করে এটাকে তিনটি অ্যাপার্টমেন্টে ভাগ করেন। এর মধ্যে একটিতে তাঁর পাবলিক রেকর্ড অফিস রেখে বাকি দু’টো ভাড়া দেন। একটিতে ছিলেন মুহরি ও (দলিল) লেখকরা এবং অন্যটিতে ছিল পাবলিক কাছারি। গভর্নর জেনারেল কালেক্টর অফিসের জন্য একটি সুবিধাজনক দালান স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ সময়ে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, কালেক্টর অফিস একটি গ্রহণযোগ্য দালান তৈরি করা হবে।সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ভাষ্যমতে, ভূমিকম্পের পরে ১,৬৬,০০০ টাকা ব্যয়ে ৩৫,০০০ বর্গফুটি ভূমির উপর ডেপুটি কমিশনারের কাছারি তৈরি হয়। ১,৪৬,০০০ টাকা ব্যায়ে নতুন কারাগার তৈরি করা হয়।  উল্লিখিত তথ্যাদি থেকে ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের ভূমিকম্প সম্পর্কে শ্রীঅচ্যুতচরণ চৌধুরীর মন্তব্য, ‘শ্রীহট্ট একটা প্রাচীন সহর; কিন্তু ভূকম্পে ইহার অনেক প্রাচীন কীর্ত্তি এককালে লোপ করিয়াছে। ইহার সৌন্দর্য সম্পদ একেবারে বিনষ্ট করিয়াছে!’  এ ধরণের মন্তব্য করলেও এর সিলেট শহরের প্রাচীন কীর্তি কী তার কোনো তথ্য আমরা অন্য কোনো সূত্র থেকে পাচ্ছি না।এবার দেখা যাক, প্রততাত্ত্বিক স্থানগুলো থেকে কিছু পাওয়া যায় কি না?
প্রতœতাত্ত্বিক স্থানপ্রতœতাত্ত্বিক স্থানগুলো সম্পর্কে বি সি অ্যালেন আসাম ডিসট্রিক্ট রেকর্ডে উল্লেখ করেছেন:
প্রতœতাত্তিক আগ্রহের দিকে জেলাটি খুব সমৃদ্ধ নয়, মসজিদ আছে অসংখ্য, বিশেষ করে উত্তর সিলেটে। কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগ এখনও উপশসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে । পাথরকান্দি থানার ২ মাইল উত্তর-পূর্বে রাজা প্রতাপ সিংহের দূর্গের ধংসাবশেষ আছে; যিনি স্থানীয়ভাবে বেশ নামজাদা লোক, যাঁর নামে প্রতাপগড় পরগণার নাম হয়েছে। দক্ষিণ সিলেটের সুবিদ নারায়ণ ও খাওয়াজা ওসমানের নামের সঙ্গে জড়িত ধ্বংসবশেষের কথা ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এবং একই জায়গায় ভানুগাছ পরগণার একটি দূর্গ চন্দ্র সিংহের বলে বলা হচ্ছে। তিনি টিপরা রাজ পরিবারের লোক এবং আনুমানিক সতেরো শতক খ্রিস্টাব্দে তিনি পাহাড় থেকে সিলেটের সমতলে নেমে এসেছিলেন। 
১৯০৫ সালে সিলেটের বাড়িঘর এবং আসবাবপত্র কেমন ছিল এ সম্পর্কে অ্যালেন লিখেছেন:
সাধারণ কৃষকের কুটিরের ভিৎ কাদামাটির উপর গড়া, আর মেঝটি শীতল বটে কিন্তু স্যাঁতস্যাঁতে; ছাদ ছনের, দেয়াল কাদা দিয়ে লেপ্টানো নলের (খড়ি বা শন খগড়ার) অথবা বাঁশের তল্লার, আর ঘরের কাঠামোটি বাঁশের তৈরি। কুটিরের কোনো জানালা নেই এবং ভেতরটা এমনিতেই ছোট, এর ওপর কোঠা করার বেড়া দেওয়ার ফলে অন্ধকার-অন্ধকার ও দমফাটা অবস্থা হয়। মধ্যবিত্তদের বাড়িঘর সংখ্যা ও মানের দিক দিয়ে ভিন্ন হলেও, প্রকরণের দিক দিয়ে সাধারণ কৃষকের বাড়ি থেকে ভিন্ন নয়। একজন গরিব কৃষক যখন ১টি কুটির নিয়ে তুষ্ট থাকতে পারেন তখন তাঁর চেয়ে ধনবান তাঁর ভূস্বামীর ৪/৫টা থাকে। এগুলো তুলনামূলকভাবে বড়সড়ো হয় ও গড়নেও ভালো, বাঁশের বদলে কখনও কাঠের খুটি থাকে, আর ছনের বদলে ঢেউ লোহা (বা টিন)। কিন্তু (নির্মাণ) নীতিট্া অভিন্ন থেকে যায়। চুন-সুরকির বাড়িঘর খুবই দুর্লভ। 


(লেখাটি লেখকের প্রকাশিতব্য “সিলেটের ইতিহাস: ব্রিটিশ শাসনামল” গ্রন্থ থেকে সঙ্কলিত)

Leave a Reply