জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে অন্তরালের বঙ্গবন্ধু আরও বেশি শক্তিশালী
জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ

জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে অন্তরালের বঙ্গবন্ধু আরও বেশি শক্তিশালী

ইমিগ্রেশন নিউজ : সরকার ও রাজনৈতিক দল যখন সততা, আন্তরিকতা দিয়ে জনস্বার্থে কাজ করে, তখন জাতির উন্নতি ও কল্যাণ নিশ্চিত হয় বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা ও ইতিহাস। জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে অন্তরালের বঙ্গবন্ধু আরও বেশি শক্তিশালী।’

সোমবার (২২ মার্চ) জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু বলতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে ইতিহাস। যে ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন গোপালগঞ্জের মহকুমার নিভৃত পল্লি টুঙ্গিপাড়া থেকে। ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজের সুখ-দুঃখের কথা না ভেবে অন্যকে নিয়ে ভাবতেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে যেখানেই অন্যায়-অবিচার, শোষণ-নির্যাতন দেখেছেন, সেখানেই প্রতিবাদে নেমে পড়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘কখনও নিজের এবং পরিবারের গণ্ডির মধ্যে বাঁধা পড়েননি। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও গেয়েছেন বাংলা, বাঙালি আর বাংলাদেশের জয়গান। ফাঁসির সেলের পাশেই কবর খোঁড়া হচ্ছে জেনেও বাঙালির স্বাধীনতার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন অবিচল ও অনড়। আজীবন বাংলা ও বাঙালিকে ভালোবেসে গেছেন, স্থান করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘১৯৩৮ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পরিচয় ঘটে এবং প্রথম পরিচয়েই তিনি নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমেই রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। তারপর থেকে লেখাপড়া, রাজনীতি ও জনসেবা যুগপৎভাবে চলতে থাকে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি থেকে তিনি পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। দেশ বিভাগের কিছুদিন পরই তরুণ নেতা শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন, ব্রিটিশ পরাধীনতার কবল থেকে মুক্তি পেলেও বাঙালি নতুন করে পশ্চিমাদের শোষণের কবলে পড়েছে। শুরু করেন বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন।’

তিনি বলেন, ‘‘১৯৫৭ সালের ৩০ মে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার স্বার্থে জোট সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন বঙ্গবন্ধু। দলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর কতটা আনুগত্য, আন্তরিকতা ও টান ছিল মন্ত্রিপরিষদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মরণসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘জনগণের পক্ষ থেকে আমি ঘোষণা করছি, আমাদের আবাসভূমির নাম পূর্ব পাকিস্তান নয়, হবে বাংলাদেশ’।’’

আবদুল হামিদ বলেন, ‘‘স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনে কাজ শুরু করেন। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কার সাথে বৈরিতা নয়’ এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলে দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে তিনি ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি ও ২৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে তাকে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে অনবদ্য ত্যাগ ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জুলিও কুরি’ শান্তিপদক দেওয়া হয়।’’

তিনি বলেন, ‘আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করতে যাচ্ছি। এ দীর্ঘ সময়ে দেশের চেহারা অনেক বদলে গেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে সেই বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এখন উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার পথে দ্রুত অগ্রসরমান। জলে-স্থলে-আকাশে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই আরাধ্য কাজ সম্পন্ন করেছেন, বাংলাদেশের স্থল ও সমুদ্রসীমা স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করেছেন। ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে যা সফলভাবে কাজ করছে। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ার। তারই দেখানো পথে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে অযুত বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।’

তিনি বলেন, ‘সরকার ও রাজনৈতিক দল যখন সততা, আন্তরিকতা দিয়ে জনস্বার্থে কাজ করে তখন জাতির উন্নতি ও কল্যাণ নিশ্চিত হয়। সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে দলমত নির্বিশেষে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। মুজিববর্ষে এটাই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।’

মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়। বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা, একটি ইতিহাস। জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে অন্তরালের বঙ্গবন্ধু আরও বেশি শক্তিশালী। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে, এ দেশের জনগণ থাকবে, ততদিনই বঙ্গবন্ধু সকলের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি বিশ্বকে করেছেন আলোকময়। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে সে লক্ষ্যে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছিল অপরিসীম। নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি বাংলার মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে গেছেন। ঋণী করে গেছেন বাঙালি জাতিকে। মুজিববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন-কর্ম, চিন্তা-চেতনা ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের কাছে। বঙ্গবন্ধুর জীবন, ভাবনা ও রাজনৈতিক দর্শনের মর্মার্থ সবার কাছে ছড়িয়ে দিতে মুজিববর্ষ পালন একটি যথাযথ পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে জাতি এগিয়ে যাক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে।’

Leave a Reply