ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের শিকার চট্টগ্রামের তরুণ আনোয়ার করিম ভূঁইয়া

ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের শিকার চট্টগ্রামের তরুণ আনোয়ার করিম ভূঁইয়া

উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় অসংখ্য মানুষ বিদেশে পাড়ি দেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিক সব বিষয়ে খোঁজ-খবর না থাকায় তাদের পড়তে হয় সীমাহীন দুর্ভোগে। এমন দুর্ভোগে পড়ে অসংখ্য মানুষ দিশেহারা হয়ে যান। ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বসেন নিজের। এমনই ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের শিকার চট্টগ্রামের তরুণ আনোয়ার করিম ভূঁইয়া।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নের আনোয়ার নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা-মৃত মো: আশরাফ ভূঁইয়া ও মা-ফাতেমা বেগম। বাবা কাজ করতেন নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলে।  জুটমিল বন্ধ হয়ে পড়লে অনেকের মতো তার বাবাও বেকার হয়ে পড়েন। সেটা বহু পুরনো ঘটনা। বাবার অসহায়ত্ব ও বেকারত্ব সন্তানদের ওপর প্রভাব ফেলে।পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা গুলো যখন পূরণ হচ্ছিলো না, তখন তার বড় ভাই নিজের পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে বিজিবি-তে চাকরি নেন। বড় ভাই যদি চাকরি না নিলে বন্ধ হয়ে যেতো মা বাবা ও আনোয়ারদের তিন ভাই-বোনের পড়া-লেখা।

এর মধ্যে ২০১৩ সালে আনোয়ারের বাবা মারা যায়। কঠিন এই সময়ের ভেতরে ২০১৭
সালে স্নাতক পাস করতে সক্ষম হন আনোয়ার । তারপর দেশে চাকরি নামক সোনার
হরিণ ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে একবুক স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালের জুনে ছোট বোনের স্বামীর মাধ্যমে সৌদি পাড়ি জমান আনোয়ার। সৌদি আরবে পৌঁছেই তার জীবনে কী ঘটেছে তা আনোয়ার নিজেই শোনালেন।

তিনি বলছিলেন, ‘জীবন যে কতো কষ্টের হতে পারে তা বিদেশ না আসলে বুঝতে পারতাম না । সৌদিতে যাওয়ার পরদিন থেকেই কাজ শুরু করতে হয়েছিলো আমাকে। ভেবেছিলাম উন্নত দেশে উন্নত কাজ করবো। কিন্তুু আমার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো । আমাকে কাজ দেওয়া হলো এক সৌদির বাড়ির উট ও ঘোড়ার ঘর পরিষ্কারের এবং উট ও ঘোড়াকে খাদ্য-পানি দেয়ার । ভাষা না বুঝার কারণে অনেক কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারতাম না । তার জন্য বাড়ির মালিক আমাকে প্রহার করতো। ঠিকভাবে খাবার দিতো না। অনেক দিন না খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছি । এতো কষ্ট করার পর আবার মাস শেষে ঠিক মতো বেতন পরিশোধ করতো না!

আনোয়ার বলছেন, ‘যা পেলাম এই মরুর দেশে তা হলো, সাদা সাদা লম্বা লম্বা পোশাকের মানুষগুলোর কাছ  থেকে বুঝতে না পারা গালি, অমানুষিক নির্যাতন, সঙ্গে দিন-রাত অর্থহীন পরিশ্রম। আমার মনে হয়েছিল একেকটা দিন একেকটা বছর । প্রতিটা নিঃশ্বাস গলায় এসে আটকে যেত। রাতে ঘুমাতে গেলে আমার চোখের জলে বালিশ ভিজে যেতো। ইচ্ছা করতো উড়াল দিই দেশের পথে।  কিন্তু পারতাম না সামাজিকতা ও আত্মসম্মানের ভয়ে। দেশে গেলে লোকে কী ভাবে সেটা ছিলো আমার দুশ্চিন্তা। না বুঝে বিদেশ আসার কারণে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে এভাবে’।

ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের শিকার চট্টগ্রামের তরুণ আনোয়ার করিম ভূঁইয়া।

‘মূলত আমি এসেছিলাম বাসার ব্যক্তিগত ড্রাইভার ভিসায় । সৌদি আরবের আইন মতে, কোন বাসার কাজের লোকের বাইরে কাজ করা অবৈধ । অবৈধ জেনেও আমার মালিককে বলে বাৎসরিক মুনাফা দেওয়ার মৌখিক চুক্তিতে বাড়ির বাইরে কাজ করার অনুমতি গ্রহণ করি’। এক বাঙালী পরিচিত বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটি বাঙালি মালিকানা হোটেলে ডিস ক্লিনারের কাজ নিই। দৈনিক ১৭ ঘন্টা করে কাজ করতাম’! ভুক্তভোগী আনোয়ার বলছেন, ‘সেখানে ঘটলো বিপত্তি। ঠিক মতো বেতন পরিশোধ করতো না। নয়-ছয় বলে বেতন রেখে দিতো। তবুও এভাবে ছয় মাস কাজ করার পর বিশ্বে এসে
পড়লো মহামারী করোনা। ফলে হোটেলে কাজ হারাই। হোটেল মালিক থেকে তিন মাসের
বেতন বাকেয়া ছিলো। তা চেয়েও পাইনি। লকডাউনের অজুহাতে বেতনের টাকা দিতে
অপারগতা প্রকাশ করেন হোটেল মালিক। বেতন আদায়ের জন্য কোন আইনগত সহযোগিতাও নিতে পারিনি। কারণ  আমি তার হোটেলে অবৈধভাবে কাজ করেছি। করোনাকালীন অন্য কোথাও যে কাজ করবো তার সুযোগ ছিলো না। কি আর করা। সৌদি আরবে লকডাউন দেওয়ার কারণে প্রায় ছয় মাস বেকার ছিলাম । অনেক কষ্টের  মাধ্যমে খেয়ে না খেয়ে জীবনযাপন করি’।

এমন দুর্ভোগের মাঝেই আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার উপক্রম আনোয়ারের। তার কপিলের সাথে যে বাৎসরিক অর্থের মৌখিক চুক্তি হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি অর্থ দাবি
করে কপিল। অনেক মাস বেকার থাকার কারণে হাতে কোনো নগদ অর্থ ছিলো না তার।
কিন্তু কপিলের চাহিদা পূরণ করতে না পারার কারণে সে  আনোয়ারকে সৌদি আরব
ছাড়ার চূড়ান্ত অনুমতি দিয়ে দেয় ।

‘আমার দেশে আসার বিমান ভাড়াও ছিলো না। এক আত্মীয় থেকে সুদের মাধ্যমে টাকা ধার নিয়ে আমার পরিবার আমার জন্য বিদেশে টাকা পাঠায় । তবে সর্বশেষ ঋণের বোঝা, ব্যর্থতা ও হতাশার গ্লানি নিয়ে ১ অক্টোম্বর ২০২০ সালে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হই’!

দেশে এসেও শান্তি নেই আনোয়ারের। যে স্বপ্ন নিয়ে সৌদি গিয়েছিলো তাতো পূরণ হয়নি। উপরুন্তু গেছে মান-সম্মান, মাথায় আরো ঋণের বোঝা। আনোয়ার জানান,  দেশে ফিরে আসার পর পরিবার-সমাজের নানা জন থেকে নানা অপমানজনক কথা শুনতে হয় । কেউ কেউ তাকে কটুক্তি করতেও ছাড়েনি ।

 এই অবস্থায দিশেহারা আনোয়ার কী করবেন? হাতে ছিলো না কোনো নগদ অর্থ  যে, ব্যবসা করবেন। ফলে দেশেই চাকরি খোঁজা শুরু করেন তিনি। নানা জনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে চাকরির জন্য চেষ্টা শুরু করেন। বহু চেষ্টার পর  একটি এনজিওতে প্রকল্প কর্মী হিসাবে স্বল্প বেতনে চাকরি জোগাড় করতে সক্ষম হন আনোয়ার’!

Leave a Reply