ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন, নারী ও সচেতনতার উপায়

ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন, নারী ও সচেতনতার উপায়

বর্তমান জীবন থেকে অধিকতর উন্নতজীবনের প্রত্যাশায় একদেশ থেকে অন্য দেশে প্রত্যাবর্তনকে সাধারণত অভিবাসন বলা হয়। এটি একটি প্রক্রিয়া, যা বিভিন্ন বিধিবিধান ও শর্তপূর্ণ করে এবং সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্নের মধ্যদিয়ে শুরু করতে হয়। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে শর্টকার্ট পদ্ধতির সুযোগ সন্ধ্যানপূর্বক ভিন্ন উপায়ে অন্যদেশে যাওয়ার চেষ্টা হলো ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন। মূলত বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কোনো দেশে কাজের উদ্দেশে প্রবেশ করাকে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন বলা হয়।

মানবপাচারকারীদের সহযোহিতায় সড়ক, সমুদ্র ও আকাশপথে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন সংঘটিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন অভিবাসী না জেনে উন্নত জীবনের আশায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ায়, যেখানে নানা রকম বিপদ এমনকি জীবন বিপন্ন হওয়ার মতো ঝুঁকিও থাকে। হাজার কঠিন ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ভাগ্যক্রমে গন্তব্য দেশে পৌঁছাতে পারলেও স্বস্তি থাকে না। যদি কেউ ধরা অবৈধভাবে প্রবেশ ও অবস্থানের তার কারাদণ্ড হতে পারে এবং এরপর তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। পুরুষের পাশাপাশি এই পথে নারীদেরও একটি বড় অংশ ঝুঁকিগ্রহণ করে থাকে।

পুরুষের মতো অনেক নারী উন্নত জীবন ও জীবিকার সন্ধানে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গমন করে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে বাৎসরিক হারে অভিবাসী শ্রমিকের শতকরা ১৩ ভাগেরও বেশি নারী।নারীকর্মীদের বেশিরভাগ যায় গৃহস্থালী শ্রমিক হিসেবে, যাদের বেলায় দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং দক্ষতার অভাবে অধিকাংশ নারী অভিবাসী কর্মী বিদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে অভিবাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য যাচাই বাছাই করে বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি এন্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) জানিয়েছে, ২০১৮ সালের  জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৬ লাখ ১৪ হাজার ৫৮৫ জন বাংলাদেশি কর্মী উপসাগরীয় ও অন্যান্য আরব দেশসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এই বছর অভিবাসনের হার গত বছরের তুলনায় কমবে ২৭ শতাংশ। ২০১৭ সালের  জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মী বাংলাদেশ থেকে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে অভিবাসী হয়েছেন। সে ক্ষেত্রে এ বছরে ২ লাখ ৭১ হাজার ২৩ জন কর্মীর অভিবাসন হ্রাস পেয়েছে। যা ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ার অন্যতম একটা কুফল বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনে একদিকে যেমন দেশের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে, দেশ তার শ্রমবাজার হারাচ্ছে, তেমনি হারাচ্ছে রেমিট্যান্স। সবচেয়ে বড় কথা, শ্রমিকরা নিজেদের বলি দিচ্ছেন অহরহ। ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে থাকেন মূলত নারীরা।

অভিবাসন নিরাপদ ও নিশ্চিত প্রক্রিয়াকরণে কাজ করা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান -জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো(বিএমআইটি), জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস(ডেমো), বাংলাদেশ বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও সার্ভিসেস লিমেটেড (বোয়েসেল), লাইসেন্সধারি প্রাইভেট রিক্রুটিং এজেন্সি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা গ্রহণ ও তাদের প্রদত্ত নির্দেশাবলি অনুসরণে করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো বলছে, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রতিটি নারী তার বিদেশে যাওয়ার শারীরিক ও নিম্নো প্রদত্ত যোগ্যতা আছে কিনা নিশ্চিত হতে হবে-

ক. শুধুমাত্র ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারী হতে হবে,

খ. শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যগতভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ নারী, কোনো ধরনের জাল স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে বিদেশ গমনের চিন্তাই করা যাবে না,

গ. গর্ভাবস্থায় অভিবাসী হওয়ার চিন্তাও করা যাবে না, এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে হবে,

ঘ. দক্ষতা প্রশিক্ষণ-প্রশিক্ষণ ছাড়া অভিবাসী অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। প্রশিক্ষণ না নিয়ে জাল সার্টিফিকেটসহ বিদেশে যাওয়া উচিত নয়। এতে নিজেরই ক্ষতি,

ঙ. সার্বিক দিক চিন্তা করে যেমন-কর্মসংস্থান নিরাপদ ও নারীবান্ধব কিনা, অধিক আয়ের সুযোগ আছে কিনা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ, জীবনযাপনের মান উন্নত করা ও কাজের পরিবেশ হবে কিনা, মানসিক চাপ সামলানো ও কঠোর কর্মজীবন ইত্যাদি সবকিছুর চ্যালেঞ্জ গ্রহণে সক্ষমদের বিদেশে কর্মী হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে,

চ. বিদেশে গেলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। বাংলাদেশের মানুষ ভাতে অভ্যস্থ। কিন্তু অন্যান্য দেশে খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন। এটি একটি মানসিবক চাপ। এক্ষেত্রে অভ্যস্থতার বিষয় চিন্তা করতে হবে বিদেশগমন করার আগে।

ছ. কর্মঘণ্টা ও কাজের সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করে নিতে হবে। নাগরিক জীবনের সুযোগ-সুবিধাগুলো সম্পর্কে সচেতন হতে হবে,

এভাবে সার্বিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্তের পর সরকারি ও সরকারি কর্তৃক লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সমস্ত প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। কোনো রকম দালালচক্রের সহযোগিতা ছাড়া পাসপোর্ট করা থেকে ভিসা প্রার্থী এবং বিমানে সে দেশে যাত্রা করা থেকে শুরু করে অবতরণ ও কর্মসংস্থানে প্রবেশ অবধি সকল প্রক্রিয়া এভাবে করা গেলে একজন অভিবাসী নিরাপদ।

নারীরা কীভাবে বুঝবেন যে, তিনি ঝুঁকিতে পড়ছেন?

প্রথম- বিদেশে যাওয়ার জন্য ̈যদি সন্দেহজনকভাবে অনেক বেশি লোভ দেখায় যেমন, উচ্চ বেতন, বিয়ে, ভাল চাকুরী, বিভিন্ন বিখ্যাত এবং পবিত্র স্থানে ভ্রমন ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ যাওয়ায় উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করলে,

দ্বিতীয়- জোর করে বা ভয়ভীতি দেখায় অথবা নিজের কোন দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার জন ̈

বাধ্য করে,

তৃতীয়: যার সাহায্যে বিদেশে যাবেন তিনি যদি নিষেধ করেন যে, কারো কাছে বিদেশে যাওয়ার কথা বলা যাবে না,

চতুর্থ: এয়ারপোর্ট ছাড়া অন্য কোন পথে যেমন সড়ক পথে, নৌকা বা জাহাজে করে বিদেশে নিয়ে যাবে এ কথা বললে (অবশ্য

বিমানবন্দর ব্যহারের মাধ্যমে আকাশপথেও অনেকসময় পাচার করা হয়, সে ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে)

পঞ্চম: কোনো রকম কাগজপত্র ছাড়া শুধু মুখের কথায় বিদেশ নিয়ে যাওয়ার কথা বললে প্রভৃতির মাধ্যমে একজন নারী কর্মী বুঝতে সক্ষম হবেন যে, তিনি ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পথে প্রবেশ করছেন। এসবকিছু অনুধাবন করা তখনই সম্ভব যখন একজন কর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন যে, আপনি বৈধ ও নিরাপত্তার সঙ্গে অভিবাসী হতে চান। তবে যেকোনো দেশ আপনার জন্য নিরাপদ।

Leave a Reply