টেকসই উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসন
নিরাপদ অভিবাসনের জন্য যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।

টেকসই উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসন

নূরুল ইসলাম :

বিশ্বায়ন, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, উন্নত জীবন-জীবিকার আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে অভিবাসন বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয়। টেকসই উন্নয়ন ২০৩০-এর লক্ষমাত্রা অর্জনে অভিবাসন খাত বিশেষ করে শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অসমতা হ্রাস সরাসরি জড়িত।

দেশের শ্রম বাজারে যে পরিমাণ জনসংখ্যা প্রবেশ করছে তার চার ভাগের এক ভাগই কর্মের উদ্দেশ্যে প্রবাসে গমন করছে। একটু অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দের আশায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিটে-মাটি বিক্রি করে বৈধ-অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। অনেক সময় এ কারণে সাগরে নৌকাডুবে হাজার হাজার অভিবাসন প্রত্যাশীর সলিল সমাধি রচিত হচ্ছে। যারা বেঁচে যায় তারা বিভিন্ন দেশের সীমান্ত পুলিশের হাতে আটক হয়ে নির্যাতন ও দীর্ঘ কারাবাসের পর স্বপ্ন ও সব হারিয়ে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয়। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে অভিবাসন খাত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী অভিবাসন সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য সমস্যা ও সমাধানে করণীয় বিষয়ে নিন্মে আলোকপাত করা হলো:

অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন : আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর ২০১৭ সালে করা জরিপ অনুযায়ী যে শীর্ষ পাঁচটি দেশের নাগরিকরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। ইউরোপীয় কমিশন পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট-এর তথ্য অনুযায়ী ২০০৮-২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। অবস্থা এমন ভয়াবহ যে ২০১৭ সালে ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক ইন্ডিপেডেন্ট-এর  ৫ মে শিরোনাম ছিল: ‘বাংলাদেশ ইজ নাও দ্য সিঙ্গেল বিগেস্ট কান্ট্রি অফ অরিজিন ফর বিফিওজিস অন বোট টু ইউরোপ এমারজেন্স’। বিশ্ব গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত ১০মে শুক্রবার ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় ২৪ জন জীবিত উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশী জানান ঐ নৌকায় মোট ৫১জন বাংলাদেশী নাগরিক ছিলেন। বাকি ৩৭ জনের সাগরে ডুবে করুণ মৃত্যু হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ মৃত্যুর মিছিলের শেষ কোথায়? এ সমস্যা সমাধানে দ্রুততার সাথে যেসব কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে সেগুলো হলো: আন্তঃদেশীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সীমান্তে কঠোর নজরদারী, মানব পাচার রোধে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এবং বৈধপথে অভিবাসন জটিলতা নিরসন।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য : ২০১৬ সালে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামে একটি বেসরকারী সংস্থার নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে গবেষণা অনুযায়ী ১৯ শতাংশ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশে অবৈধ অভিবাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একইভাবে ৫২ শতাংশ শ্রমিক দালালের মাধ্যমে বিদেশ গমন করে। এমনকি বৈধ এজেন্সির দালালদের দ্বারা অভিবাসীরা বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হয়। উক্ত সমাধানে অভিবাসীদের সচেতন করা, দালালদের দমনে কঠোর আইন ও তার বাস্তবায়ন করা, এজেন্সির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, প্রতারিত হলে বিচার ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

অভিবাসন ব্যয় : বাংলাদেশের মতো এতো বেশি টাকা খরচ করে বিদেশে যাওয়ার রেকর্ড কারো নেই। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বাংলাদেশী অভিবাসন ব্যবস্থাপনার জন্য যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বারোপ করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমানো। এক্ষেত্রে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে সমন্বিতভাবে নাগরিকদের তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে সচেতন করা যেতে পারে, যেন কোনো এজেন্সি, দালাল অতিরিক্ত টাকা আদায় করতে না পারে। এজেন্সিগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কঠোর নজরদারীর আওতায় আনা, প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ ও লাইসেন্স বাতিল করা যেতে পারে।

শ্রমিকদের সুরক্ষা, পেশাগত নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে কৌশলগত দুর্বলতা : শ্রমিকদের শুধু বিদেশ পাঠালেই চলবে না, তাদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যে সব শ্রমিক এজেন্সির দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়, কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় ‘বিএমইটি’র তথ্য মতে, ১৯৮০ সাল থেকে পুরুষের পাশাপাশি সীমিত আকারে পেশাজীবী নারী শ্রমিক অভিবাসী প্রেরণ করা হয়, যা ১৯৯১ সালে মোট শ্রমশক্তির ১.১৯%, ২০০৪ সালে ৪.১২% ২০১২ সালে ৬.১৪% এবং ২০১৭ সালে ১২.০৪% জিসিসিভূক্ত দেশেই ৯৯% নারীশ্রমিক অভিবাসী রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারী শ্রমিকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছে। এমতাবস্থায় তাদের সুরক্ষাকৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন না করলে এ বিশাল শ্রমবাজার হুমকির মুখে পতিত হবে। অভিবাসীরা যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয় সেগুলো হলো: নির্যাতন, মুজুরী পরিশোধ না করা, দুর্ব্যবহার, স্বাস্থ্য সেবার অভাব, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন । এমতাবস্থায় তাদের জন্য নির্দিষ্ট কাজ, মুজুরী নির্ধারণ, স্বাস্থ্য সেবা, স্থানীয় আইনে শাস্তির আওতাভুক্ত, ছুটি, যাতায়াত, দুর্ঘটনা জনিত ক্ষতিপূরণ, কর্মব্যবস্থা, পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বিদেশী মিশনে শ্রমিকদের তথ্য, আইনি, মনোসামাজিক সেবা প্রদান অভাব : বিশ্বের ১৬১টি দেশে বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত আছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় লেবার অ্যাটাশে অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে অভিবাসীরা পর্যাপ্ত মনোসামাজিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উক্ত সমাধানে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে সেবাকেন্দ্র চালু করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়া এমনভাবে সাজাতে হবে যেন কোনো সেবা প্রার্থী সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। এখানে আইনি পরামর্শক, মনোসামাজিক তথ্য সেবা, স্থানীয় আইনি সুরক্ষা, কাউন্সেলর নিয়োগ ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।

থ্রিডি দুষ্ট-চক্রের অবসান: আমাদের দেশের অভিবাসী শ্রমিকরা সাধারণত যে কাজগুলো করে সেগুলো ডার্টি-ডাস্ট-ডেঞ্জারাস এই দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ। অবৈধ ও অদক্ষ শ্রমিকদের অত্যন্ত নিন্ম মজুরিতে এসব কাজে বাধ্য করা হয়। ফলস্বরূপ বিশ্ব-গণমাধ্যমে প্রায়ই তাদের নিয়ে মর্মান্তিক খবর প্রকাশিত হয়। এই দুষ্টু চক্রের অবসান করে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম করা যেতে পারে। এছাড়াও দক্ষ পেশাজীবিদের অভিবাসনের মাধ্যমে বিদেশে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ফলস্বরূপ আমাদের দেশ আরও অধিক রেমিটেন্স অর্জন করতে সক্ষম হবে, সমৃদ্ধ হবে আমাদের অর্থনীতি গতি বৃদ্ধি পাবে।

অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণ, কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতার অভাব : অবৈধভাবে যে সকল অভিবাসী বিভিন্ন দেশের ক্যাম্প, কারাগার, পরিচয় গোপন অবস্থান করছে তাদের সঠিক তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আন্তঃদেশীয় কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আলাপ আলোচনা সাপেক্ষে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তারপর তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের যে সব শ্রমিক জীবিকার সন্ধানে অভিবাসন গমন করে তাদের অধিকাংশই অদক্ষ, প্রশিক্ষণ না থাকা ও ভাষাগত দক্ষতার অভাবে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিন্মমজুরীতে করতে বাধ্য করা হয়। ফলস্বরূপ শ্রমিক বঞ্চিত হয় পারিশ্রমিক থেকে, দেশ বঞ্চিত হয় রেমিটেন্স থেকে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষিত নাগরিকদের অভিবাসন নিশ্চিত করা যেতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা ও পূনর্বাসন ব্যবস্থা না-থাকা : জীবিকার সন্ধানে একটু অর্থনৈতিক স্বচ্ছন্দের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে যে নাগরিকরা বিদেশে পাড়ি জমায়, তারপর প্রতারণা, নির্যাতন সহ্য করে কষ্টার্জিত উপার্জন পরিবার পরিজনের জন্য দেশে পাঠানোর মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে তাদের অবদানকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। সেই নাগরিকরা যখন প্রতারিত হয়, রাষ্ট্রীয় সাহায্যের প্রয়োজন হয় তখন তাদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন রাষ্ট্রের দ্বায়িত্ব। আমরা যেন ভুলে না যাই অভিবাসীদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন দিতে ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে জনশক্তি রপ্তানিখাত হুমকির মুখে পড়বে। এক্ষেত্রে সরকারী বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

গণ সচেতনতার অভাব : ‘জীবনের জন্য জীবিকা, জীবিকার জন্য জীবন নয়’- এ বার্তাটি দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। জীবিকার সন্ধানে অভিবাসী হতে ইচ্ছুক নাগরিকরা যেন অবশ্যই বৈধ উপায়ে কাজ, মজুরী, কর্মঘণ্টা, যাতায়াত, ছুটি, নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ সবকিছু জেনে দালিলিক প্রমাণ সংরক্ষণ করে তারপর অভিবাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার সমন্বয়ে স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ইমাম ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার, পথ-নাটক, রেডিও টেলিভিশনে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, টকশো ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশ যদি অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় তাহলে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্ঘটনাগুলোর মতো মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটতেই থাকবে, যা বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোচিত-সমালোচিত হবে। ফলস্বরূপ অভিবাসী গ্রহণকারী ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশ অভিবাসী গ্রহণে কঠোর শর্ত আরোপ করবে, যার ফলে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিখাত মারাত্মক হমকির মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে রেমিটেন্স, রিজার্ভ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সুতরাং নিরাপদ অভিবাসনের জন্য যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

লেখক: উন্নয়নকর্মী  ও কলামিস্ট

Leave a Reply