তিন লাখ টাকায় খুনি ভাড়া, সাবেক এসপি যেভাবে খুন করেন স্ত্রীকে
মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন প্রথম দিকে জামাতার পক্ষে কথা বললেও পরে নিজেই সন্দেহের আঙুল তোলেন।

তিন লাখ টাকায় খুনি ভাড়া, সাবেক এসপি যেভাবে খুন করেন স্ত্রীকে

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে খুন হন সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আকতার মিতু। ওই দিন বাবুল আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন। সন্দেহের তীর ছিল জঙ্গিদের দিকে। কিন্তু কিছুদিন পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট।

বাবুল আকতারের পরিকল্পনায় স্ত্রীকে হত্যা করা হয় বলে গুঞ্জন ওঠে। ৬ সেপ্টেম্বর বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। হত্যাকাণ্ডের পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে বাবুলকে নিয়ে সন্দেহের কথা বলেন তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেনও। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত মামলাটির তদন্তের ভার পিবিআইকে দেয়।

মাহমুদা হত্যায় বাবুল আক্তার তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন হত্যাকারীদের। আদালতে দেওয়া দুই সাক্ষীর জবানবন্দি ও পিবিআইয়ের তদন্তে এ তথ্য উঠে আসে। এ ছাড়া পিবিআইয়ের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও নতুন করা মামলায় লেনদেনের উল্লেখ আছে।
আজ বুধবার বেলা দুইটার দিকে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় বাবুলসহ আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করার পরে তাঁর শ্বশুর মোশাররফ হোসেন বলেন, বাবুল আক্তারের সঙ্গে এক এনজিও কর্মীর পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল।

পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে প্রকাশ্য রাস্তায় মিতুকে হত্যার ঘটনায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পিবিআই। ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় মিতুকে।

পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদরদপ্তরে যোগ দিতে ওই সময় ঢাকায় ছিলেন বাবুল। তার ঠিক আগেই চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশে ছিলেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়, যার বাদী ছিলেন বাবুল আক্তার নিজেই।

সে সময় প্রায়ই জঙ্গি হামলা আর হত্যার ঘটনা ঘটছিল দেশে। আর বাবুল আক্তার ছিলেন চট্টগ্রামে জঙ্গি দমন কর্মকাণ্ডের একজন আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা। ফলে প্রাথমিকভাবে মিতু হত্যার পেছনে জঙ্গিদের হাত থাকতে পারে বলে ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেও গোয়েন্দা পুলিশ ওই হত্যা রহস্যের কিনারা করতে পারছিল না। এদিকে মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন প্রথম দিকে জামাতার পক্ষে কথা বললেও পরে নিজেই সন্দেহের আঙুল তোলেন।

পুলিশের সাবেক পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, তার মেয়েকে হত্যার পেছনে তার জামাইয়ের যোগসাজশ রয়েছে বলে তার ধারণা। আদালতের আদেশে পরে মিতু হত্যা মামলা যায় পিবিআইয়ের হাতে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় বুধবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, মিতু হত্যার সঙ্গে তার স্বামী বাবুল আক্তারের ‘সম্পৃক্ততার প্রমাণ’ তারা পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

ঢাকায় ওই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় যান মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন। বাবুলকে প্রধান আসামি করে আটজনের বিরুদ্ধে নতুন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তিনি। মামলার অপর আসামিরা হলেন- বাবুলের ‘সোর্স’ কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুছা, এহতেশামুল হক ভোলা, মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু, শাহজাহান ও খায়রুল ইসলাম কালু।

মোশাররফ হোসেন বলেন, বাবুল এক এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে ‘পরকীয়ায়’ জড়িয়ে পড়ায় মিতুর সাথে তার কলহ চলছিল। ‘এর জেরেই’ মিতুকে হত্যা করা হয়। “বাবুল এখানে পরিকল্পনাকারী। অন্য যারা আসামি তারা আগের মামলায় তদন্তে এসেছিল। তাদের সাথে সম্পৃক্ততায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।”

পাঁচলাইশ থানায় এই মামলা করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই বাবুলের করা পুরনো মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা চট্টগ্রামের আদালতে গিয়ে ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এখন আদালত তা গ্রহণ করলেই আগের মামলার সমাপ্তি ঘটবে।

এক সময় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনারের দায়িত্ব পালন করা বাবুল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামে পিবিআইয়ের মেট্রো অঞ্চলের কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখী হওয়ার পর থেকে তদন্তকারীদের হেফাজতেই ছিলেন। বুধবার মামলা হওয়ার পর বিকালে তাকে আদালতে হাজির করা হয়।

পরে পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নাজমুল হোসেন আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, “বাবুল আক্তার বাদী হয়ে যে মামলা করেছিলেন, সে মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন আমরা আদালতে দাখিল করেছি। আজ পাঁচলাইশ থানায় মিতুর বাবা নতুন হত্যা মামলা করেছেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে উনাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে আমরা হত্যার মোটিভ জানার চেষ্টা করব।”

অন্যদিকে বাবুল আক্তারের আইনজীবী আরিফুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা জামিন আবেদন করলেও তা নামঞ্জুর করেছেন আদালত। আমার মক্কেল ভিকটিমাইজ বলে মনে করি। এ বিষয়ে আমরা উচ্চ আদালতে যাব।”

Leave a Reply