তুরস্কে দিয়ানাত ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি

তুরস্কে দিয়ানাত ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি

মুহাম্মাদ বশীর উল্ল্যাহ, তুরস্ক থেকে


তুরস্ক সরকারি বৃত্তি (Türkiye Bursları) এর পাশাপাশি তুরস্ক ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরেকটি শিক্ষাবৃত্তির আবেদন গ্রহণ শুরু হচ্ছে ১লা ফেব্রয়ারি থেকে। এই বৃত্তিটি দিয়ানাত ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি (Türkiye Diyanet Vakfı Bursları) হিসেবে সমধিক পরিচিত। আজ দিয়ানাত স্কলারশীপ এর ব্যাপারে বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

দিয়ানাত ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি : তুরস্কের ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি দিয়ে তুরস্কে নিয়ে আসে। বাংলাদেশ থেকেও প্রতি বছর ছাত্র-ছাত্রীরা এই বৃত্তি নিয়ে তুরস্কে পড়তে আসেন।
দিয়ানাত ফাউন্ডেশনের স্কলারশিপ এর লেভেল দুইটি । স্কুল লেভেল (৯ম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণী) ও অনার্স লেভেল। তবে এই বৃত্তির অধীনে মাস্টার্স এবং পিএইচডি করার সুযোগ নেই।
যেসব বিষয়ে আবেদন করা যাবে :
দিয়ানাত ফাউন্ডেশন প্রতি বছর শুধুমাত্র ইসলামিক স্টাডিজ ও থিওলজি বিষয়েই অনার্স করার সুযোগ দেয়। অন্য কোন ফ্যাকাল্টিতে পড়ার সুযোগ নেই। আর স্কুল লেভেলের জন্য সাধারণ তার্কিশদের মতোই সাবজেক্ট থাকে।

আবেদনের সময়কালঃ
এই বছর ১ ফেরুয়ারী থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। আপনি চাইলে যেকোনো দিন আবেদন করতে পারবেন। একসাথে পুরো আবেদন শেষ করতে হবে এরকম কোনো শর্ত নেই। আপনি চাইলে প্রথম দিন আবেদন শুরু করে শেষ দিনেও দাখিল করতে পারবেন।
বয়সসীমা:
স্কুল লেভেলের জন্য আবেদন করতে সর্বোচ্চ বয়স ১৬ বছর বা তার কম হতে হবে। অনার্সের জন্য আবেদন করতে সর্বোচ্চ বয়স ২১ বছর বা তার কম হতে হবে।

এই বৃত্তির সুযোগ-সুবিধা সমূহ : ইউনিভার্সিটি কিংবা কলেজের টিউশন ফি ফ্রী। ২.থাকা খাওয়ার জন্য দিয়ানাত ফাউন্ডেশনের অধীনে ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পূর্ণ আলাদা ডর্মেটরির ব্যবস্থা। ৩. সরকারী হেলথ ইন্সুরেন্স। ৪. মাসিক বৃত্তি বাবদ স্কুল লেভেলে জন্য ১৫০ লিরা ও অনার্সের জন্য ৫০০ লিরা দেয়া হবে। প্রতি বছর দুইবার সেমিস্টার শুরুর আগে মাসিক বৃত্তির পাশাপাশি আলাদা করে ২৫০ লিরা বই ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি পাওয়া যাবে প্রতিবছর দেশে আসা-যাওয়ার টিকেট। প্রথম বছর ফ্রী তুর্কি ভাষা শিক্ষা কোর্স। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময় দিয়ানাত ফাউন্ডেশনের অধীনে তুরস্কের বিভিন্ন দর্শনীয়স্থান পরিদর্শনের সুযোগ। এয়ারপোর্টে রিসিভ করা থেকে শুরু করে এডমিশন কিংবা রেসিডেন্স পার্মিটের আবেদন সহ সকল কাজ দিয়ানাত করে দিবে। এসবের জন্য আলাদা কর্মকর্তা রয়েছেন।

আবেদনের জন্য যেসকল কাগজপত্র প্রস্তুত করতে হবেঃ
১. সদ্য তোলা সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
২. পাসপোর্ট অথবা জাতীয় পরিচয় পত্র অথবা জন্ম সনদের স্ক্যান কপি। (ইংরেজি কপি হতে হবে)
৩. স্কুল লেভেলের জন্য পরীক্ষার সার্টিফিকেট ও মার্কশীট এবং অনার্সের জন্য দাখিল এবং আলিমের মূল সার্টিফিকেট ও মার্কশীটের স্ক্যান কপি। (সার্টিফিকেট এবং মার্কশীট কোথাও হতে সত্যায়িত করতে হবে না।)
সির্বনিম্ম ৪.৫০ এর উপরে হলে এপ্লিকেশন করে স্কলারশিপ এর স্বপ্ন দেখতে পারেন৷ এর নিচে হলে স্কলারশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে মার্কস ৭০% এর বেশি থাকলে স্কলারশিপ এর জন্য আবেদন করার যোগ্যতা অর্জন করবেন। স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে জিপিএ ৫ প্রাধান্য বেশী পায়। আরও লাগবে দুইটি রিকমেন্ডেশন লেটার। এ ক্ষেত্রে চাইলে আপনার কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের কাছ থেকেও নিতে পারেন।
এক্সট্রা কারিকুলাম সার্টিফিকেট। (আপনার এপ্লিকেশনের সৌন্দর্য্য বর্ধন করে স্কলারশিপ পেতে সহায়তা করবে)। কলেজ ছাত্ররাও আবেদন করতে পারবেন। তবে এই স্কলারশীপটা বেসিক্যালি মাদ্রাসা ছাত্রদের জন্য।
এক্সট্রা কারিকুলাম সার্টিফিকেট কি এবং কেন প্রয়োজন?
এক্সট্রা কারিকুলাম সাধারনত Award, Project, Certificate and Voluntary activities ইত্যাদিকে গণ্য করা হয়ে থাকে। মানে হচ্ছে একাডেমিক ক্যারিয়ারের বাহিরে যদি কোন সার্টিফিকেট পেয়ে থাকেন সেগুলো। যেমনঃ কোন অলিম্পিয়াড, কোন কোর্স, কোন ক্যাম্প, কোন কনফারেন্স বা সেমিনার কিংবা কোথাও ডিবেট, বক্তব্য অথবা কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হয়ে যে সার্টিফিকেটটা অর্জন করেছেন সেটাই এক্সট্রা কারিকুলাম সার্টিফিকেট হিসেবে গন্য হবে। পাশাপাশি যদি ভলান্টিয়ারিং এর সার্টিফিকেট থাকে সেটাও এক্সট্রা কারিকুলাম হিসেবে গন্য হবে। এছাড়াও অনলাইন সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য। যেহেতু এই বছর সবকিছুই অনলাইন বেইজড ছিলো তাই অনলাইন সার্টিফিকেট চাইলে শো করতে পারবেন।
এই স্কলারশিপ শুধুমাত্র রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে দেয়া হয় না। কেননা রেজাল্ট প্রায় সবারই ভালো থাকে। সবার থেকে আপনাকে যেটা আলাদা করবে তা হলো এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিস। তাই এটা স্কলারশীপ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশী ভূমিকা রাখে।

রিকমেন্ডেশন লেটার কি এবং কার কাছ থেকে নিব?

আবেদনের জন্য একটি রেফারেন্স/ রিকমেন্ডেশন লেটার বাধ্যতামূলক। তবে দুই বা তার অধিকও হতে পারে। মিনিমাম দুটো দেওয়া ভালো। এক্ষেত্রে আপনার কলেজ প্রিন্সিপাল বা ডিপার্টমেন্ট এর হেড স্যারের থেকে অথবা কোন অর্গানাইজেশনে কাজ করলে তার প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে রিকমেন্ডেশন লেটার নিতে পারবেন। সাধারণত কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে কোন লেটার তৈরি থাকেনা। সে ক্ষেত্রে আপনি নিজে একটা লেটার লিখে কলেজের প্যাডে প্রিন্ট আউট করে স্যারের কাছ থেকে একটা সাইন নিয়ে নিবেন। চাইলে গুগল করে দেখে নিতে পারেন কিভাবে রিকমেন্ডেশন লেটার লিখতে হয়। অথবা গ্রুপের ডক ফাইলে এই সম্পর্কিত পোস্ট দেয়া আছে সেটা দেখে নিতে পারেন। আর ভার্সিটির প্রফেসরদের কাছে রেডিমেট লেটার তৈরি করা থাকে। উনাদের কাছে গেলেই লেটার পাওয়া যায়৷
মনে রাখবেন রিকমেন্ডেশন লেটার আপনার পরিচিত টিচার বা প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার কাছ থেকে নিবেন। আপনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে রিকমেন্ডেশন নিলেও এগিয়ে থাকার কোনো রকম সম্ভাবনা থাকবে না। কারন আপনাকে রিকমেন্ড সে-ই করতে পারবে, যে আপনার চরিত্রের ব্যাপারে, ক্যারিয়ারের ভবিষ্যতের ব্যাপারে ধারণা রাখে। আচ্ছা একটা উদাহরণ দেই। বিয়ের সময় পাত্র-পাত্রীর চরিত্র বুঝার জন্য কি আমরা সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে যাই? না, বরং ছেলে-মেয়েকে যারা কাছ থেকে দেখেছে, পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা তার টিউটর ইত্যাদি ইত্যাদি মানুষের কাছ থেকে তার ব্যাপারে ধারণা নিই। তাই না?

স্কলারশিপের রিকমেন্ডেশন লেটারেও এমন কিছুই চাওয়া হয়। আপনার এমন কোনো ভালো দিক যদি থাকে তা ঐ লেটারে উল্লেখ থাকলেই আপনি অন্যদের চাইতে এগিয়ে থাকতে পারবেন। মনে রাখবেন, স্কলারশিপ আপনাকে দিবে, রিকমেন্ডারকে নয়। সো, আপনাকে যে সবচেয়ে বেশি চিনে, তার কাছ থেকে আপনার চারিত্রিক সনদ সংগ্রহ করুন। যেহেতু অনার্সে শুধুমাত্র থিওলজিতেই আবেদনের সুযোগ পাবেন,তাই অথরিটি আপনাকে সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে কি কি করতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন এসব সংক্ষেপে লিখতে পারেন।
তুর্কি ভাষা কি শিখতেই হবেঃ
এই স্কলারশিপ পাওয়া মানে আপনাকে প্রথম বছর তুর্কি ভাষা শিখতেই হবে। স্কুল এবং অনার্স লেভেল, সবারই শেখা বাধ্যতামূলক। এখানে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ার সুযোগ নেই। অনার্সের জন্য প্রথম বছর তুর্কি ভাষা শেখার পরে দ্বিতীয় বছরে এক বছরের আরবি ভাষা কোর্স করতে হবে। যদি আরবি ভাষার উপর যোগ্যতা থাকে, তাহলে ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরাসরি ফ্যাকাল্টিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে এক বছর আরবি কোর্সের প্রয়োজন হবেনা।

কোন কনসালটেন্সি দিয়ে আবেদন করলে স্কলারশিপ পাবেনঃ
কারো সহযোগিতা ছাড়া নিজে নিজে আবেদন করবেন। এটার আবেদন প্রক্রিয়া খুবই সহজ। অনেক এজেন্সি এসব করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। নিয়মিত প্রতারণা হচ্ছে। যতদূর পারবেন তাদের থেকে দূরে থাকবেন। আপনি আবেদনের সময় কোন সমস্যার মুখোমুখি হলে সরাসরি Turkey Burslari & Diyanet Scholarship for Bangladeshi Students গ্রুপে এসে সিনিয়রদের পরামর্শ নিন। গ্রুপে ঢুকে প্রথমে ফাইল অপশনে গিয়ে সব ফাইল পড়বেন। ওখানে না পাওয়া গেলে প্রশ্ন করবেন। নিজের আবেদন নিজে করার মধ্যে কল্যাণ আছে।

আবেদনের লিংকঃ
https://diyanetburslari.tdv.org

একদিনেই আবেদন করতে হবে এরকম কোন শর্ত নেই। আপনি অল্প অল্প করে সুযোগ মতো আবেদন করতে পারবেন। আপনার আবেদন প্রক্রিয়া অটোমেটিক সেইভ হয়ে যাবে।

এই তো গেলো আবেদন পর্ব। এবার আসা যাক আবেদন পরবর্তী সময়ে। আবেদন সম্পন্ন করার পরে দুই বা তিন মাস পর ইন্টারভিউ এর জন্য আহবান করা হবে। শুধুমাত্র যাদেরকে তারা যোগ্য মনে করে তাদেরকেই ডাকা হয় বাকিদের প্রথম পর্বেই রিজেকশন মেইল দিয়ে অর্কৃতকার্য হওয়ার বিষয়টা জানিয়ে দেয়। ইন্টারভিউয়ের দিন প্রথমে একটা লিখিত পরীক্ষা হয়।

লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউঃ
দিয়ানাতের লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রথমে ২০ নম্বরের একটি আইকিউ টেস্ট নেয়, তারপর ভাইবার জন্য ডেকে থাকে। এটা নিয়ে খুব বেশি ঘাবড়ানোর প্রয়োজন নেই। প্রশ্ন খুব সহজ হয়।
এবার আসা যাক ইন্টারভিউতে। ইন্টারভিউতে আপনার সাবজেক্ট রিলেটেড কিছু প্রশ্ন করবে এবং আবেদনের সময় আপনি যে সকল ডকুমেন্টস আপলোড করেছেন সেগুলোর মূলকপি দেখতে চাইবে। আপনার কোরআন তেলাওয়াত এবং ইসলামিক নলেজ কেমন সেগুলো জানতে চাইবে।
ভাইভা ইংরেজি, আরবি বা মাতৃভাষায় হয়। আপনি ইংরেজিতে দূর্বল হলে বাংলাতে দিতে পারবেন। আপনার কথা ট্রান্সলেট করার জন্য একজন দোভাষী থাকবে। ইংরেজী বা আরবি না পারলে পরে অর্ধেকে গিয়ে আটকা পরার চাইতে ইংরেজিতে বা আরবিতে না বলাই ভালো। মাতৃভাষায় বললেও সমস্যা নেই।
সমসাময়িক বিষয় এবং আপনার সাধারণ জ্ঞানের উপরে দক্ষতা যাচাই করবে। আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা ইত্যাদি জানতে চাইবে। ভাইভা দিয়ে বের হওয়ার সময় ফাইনাল রেজাল্ট কখন দিবে সেটাও বলে দিবে।

স্কলারশিপ পাওয়ার পর তুরস্কে আসতে কত টাকা খরচ হতে পারেঃ
এই স্কলারশিপ প্রাপ্তদের ভিসা ১০০% পাওয়া যায়। শুধুমাত্র মেডিকেল করা এবং ডকুমেন্টস ট্রান্সলেট ও নোটারী বাবদ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার মতো লাগবে। এছাড়া আর কোথাও টাকা লাগবে না।
ভিসা দেওয়ার পর ই-মেইলে বিমানের টিকেট পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

মুহাম্মাদ বশীর উল্ল্যাহ। (Scholarship Holder at Turskish Government Scholarship.) ইসলাম ধর্মতত্ব বিভাগ, কারাদেনিজ টেকনিক ইউনিভার্সিটি। ট্রাবজোন, তুরস্ক।

This Post Has One Comment

  1. সুমাইয়া সুলতানা

    আসসালামু আলাইকুম স্যার! আমি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পাস করছি আমি কি আবেদন করতে পারি??
    আমার অনেক শখ অনেক 🥺🥺🥺

Leave a Reply