দুর্নীতিতে শীর্ষে ইউরোপের যে সকল দেশ

দুর্নীতিতে শীর্ষে ইউরোপের যে সকল দেশ

রাকিব হাসান রাফি,স্লোভেনিয়া। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে দুর্নীতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বৃহস্পতিবার জার্মানির বার্লিন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক জরিপে এমনটি দাবি করা হয়েছে।  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক প্রকাশিত  দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্স ২০২০ এর তথ্য অনুযায়ী সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র ইউক্রেনকে ইউরোপের সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ দেশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী ইউক্রেনের স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৩৩। বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে এ সূচকে ইউক্রেনের অবস্থান ১১৭তম। 
ইউক্রেনের পরই ইউরোপের সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ দেশের তকমা পেয়েছে আরেক প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্র মলদোভা। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী মলদোভার বর্তমান স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৩৪। বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে এ সূচকে মলদোভার অবস্থান ১১৫তম। তবে সামগ্রিকভাবে হিসাব করলে দুর্নীতি সূচকে দেশটির সামান্য উন্নতি ঘটেছে, কেননা গত বছর প্রকাশিত করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী মলদোভার স্কোর ছিলো ৩২। তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বলকান উপদ্বীপের দুই দেশ বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ও মেসিডোনিয়া। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী এ দুই দেশের বর্তমান স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৩৫ এবং বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে এ সূচকে যৌথভাবে এ দুই দেশের অবস্থান ১১৫ নাম্বারে। গত বছরের করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সে বিশ্বের ১৮০ টি দেশের বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা ও মেসিডোনিয়ার অবস্থান ছিলো যথাক্রমে ১০১তম এবং ১০৬ তম। বলাবাহুল্য বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত এ দুই দেশেই বিগত বছরগুলোর তুলনায় দুর্নীতির মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। 

তালিকার চতুর্থ স্থানটি যৌথভাবে দখল করেছে আলবেনিয় অধ্যুষিত দুই দেশ আলবেনিয়া ও কসোভো। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী এ দুই দেশের বর্তমান স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৩৬ এবং বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে এ সূচকে যৌথভাবে এ দুই দেশের অবস্থান ১০৪ নাম্বারে। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় যদিও আলবেনিয়া এ সূচকে আলবেনিয়ার অবস্থানের সামান্য উন্নতি ঘটেছে তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সে কসোভো তিন ধাপ নিচে নেমে এসেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতের সাথে পাকিস্তানের যে রকম চির বৈরিতা লক্ষ্য করা যায়, ঠিক একইভাবে আলবেনিয়া ও কসোভোর সাথে সার্বিয়ার বৈরিতা দীর্ঘদিনের।  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এ জরিপে আলবেনিয়া ও কসোভোর পরের স্থানটি দখল করেছে সার্বিয়া।  করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী সার্বিয়ার বর্তমান স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৩৮ এবং বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে এ সূচকে বলকান এ দেশটির অবস্থান ৯৪তম। বিগত আট বছরের মধ্যে দুর্নীতির সূচক পয়েন্টে এটি সার্বিয়ার সর্বনিম্ন স্কোর। মানব উন্নয়ন সূচকেও দেশটির অবস্থান ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক নীচে। বিশেষ করে সার্বিয়াতে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। 
সমান ৪৪ পয়েন্ট নিয়ে দুর্নীতিপ্রবণ দেশের তালিকায় ইউরোপ মহাদেশে ষষ্ঠ স্থান দখল করেছে  পূর্ব ইউরোপের তিন দেশ বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি ও রোমানিয়া। একই সাথে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ দেশ হিসেবেও এ বছর এ তিনটি দেশ ঠাই পেয়েছে। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে পূর্ব ইউরোপের এ তিনটি দেশের বর্তমান অবস্থান ৬৯ তম। 
তালিকার পরের স্থানটি মন্টিনিগ্রোর দখলে। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী বলকান উপদ্বীপের এ দেশটির বর্তমান স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৪৫ এবং বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে এ সূচকে বলকান এ দেশটির অবস্থান ৬৭তম। সমান ৪৭ পয়েন্ট নিয়ে দুর্নীতিপ্রবণ দেশের তালিকায় ইউরোপে যৌথভাবে অষ্টম স্থান দখল করেছে ক্রোয়েশিয়া ও বেলারুশ। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে ইউরোপের এ দুই দেশের অবস্থান ৪৭ তম।
দুর্নীতিপ্রবণ দেশের তালিকায় ইউরোপ মহাদেশে নবম স্থান দখল করেছে স্লোভাকিয়া। দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্স ২০২০ এর তথ্য অনুযায়ী পূর্ব ইউরোপের এ দেশের স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৪৯, বিশ্বের ১৮০ টি দেশের তালিকায় ইউরোপের এ দেশটির অবস্থান ৬০ তম। গত বছরের তুলনায় এ বছর স্লোভাকিয়ার অবস্থান এক ধাপ নেমে এসেছে। 
তালিকার দশম স্থানে উঠে এসেছে গ্রিসের নাম। দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্স ২০২০ এর তথ্য অনুযায়ী গ্রিসের স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৫৯, বিশ্বের ১৮০ টি দেশের তালিকায় বলকান এ দেশটির অবস্থান ৫০ তম। উপরে উল্লেখিত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র গ্রিস ছাড়া অন্যান্য সকল দেশে এক সময় কমিউনিজমভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার প্রচলন ছিলো। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এ তালিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে ইতালি। করাপশন পারসেপশন্স ইনডেক্স ২০২০ এর তথ্য অনুযায়ী পূর্ব ইউরোপের এ দেশের স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৫৩, বিশ্বের ১৮০ টি দেশের তালিকায় ইউরোপের এ দেশটির অবস্থান ৫২ তম।
হাঙ্গেরিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব পেচের জিওগ্রাফি শিক্ষক অধ্যাপক ড. আন্দ্রাস ট্রচসচায়াননি এক সাক্ষাৎকারে জানান, “গ্রিস ছাড়া পূর্ব ইউরোপের প্রায় সকল দেশে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এক লম্বা সময় ধরে কমিউনিস্ট শাসনের প্রচলন ছিলো। তাই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পথে আমাদের অগ্রযাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। বলতে গেলে, এখনও আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পথে আশানুরূপভাবে হাঁটতে শিখি নি।“ তিনি আরও বলেন, “কমিউনিজমভিত্তিক শাসন ব্যবস্থায় যেহেতু ব্যক্তিমালিকানাধীন বিষয়গুলো তেমন একটা প্রাধান্য পেতো না এবং সকল সম্পদ রাষ্ট্রের কাছে গচ্ছিত থাকতো, তাই এ ধরণের শাসন ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র ছিলো একটি প্রধান সমস্যা। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে কমিউনিজমের পতন ঘটেছে ঠিকই কিন্তু এখনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে আমাদের মুক্তি আসে নি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিগত কয়েক বছরের আর্থিক সঙ্কট। অর্থনৈতিক দিক থেকে পর্তুগাল ছাড়া পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে আমরা যোজন যোজন পিছিয়ে। পাশপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এ অঞ্চলের দেশগুলোতেও রক্ষণশীল ও অতি ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। এ সকল কারণে দুর্নীতির মতো একটি সামাজিক ব্যাধি এখনও পূর্ব ইউরোপের এ সকল দেশে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে এবং আমরাও এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারছি না।“ 
রাকিব হাসান রাফি: শিক্ষার্থী,দ্বিতীয় বর্ষ,ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স,ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা,স্লোভেনিয়া। 

Leave a Reply