দুহাতে সুখ কিনতে গিয়ে, ফিরলেন এক হাতে
এক হতভাগ্য প্রবাসী নুরুল আবছারের কথা।

দুহাতে সুখ কিনতে গিয়ে, ফিরলেন এক হাতে

নোবেল দাশ, অভিবাসন কর্মী :

পরিবারের সচ্ছলতা আসবে। স্বজনদের মুখে থাকবে চওড়া হাসি। এইটুকু সুখ কিনতে পাড়ি দেন মরুর দেশ সৌদি আরবে। ভরসা কর্মক্ষম দুটি হাত। কিন্তু কে জানত নিয়তির লিখন যে অন্য কিছু! দেশ বিভূঁইয়ে স্বপ্নপূরণের আগেই কাজ করতে গিয়ে নিজেরই এক হাত হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

বলছি এক হতভাগ্য প্রবাসী নুরুল আবছারের কথা। নুরুল আবছারের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা থানার বরুমচড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে  আবছার সবার বড়।আর বড় হওয়ার কারণে সংসারের দায়িত্ব শুরু থেকেই তাঁর কাঁধে চাপে। পড়ালেখায় প্রাইমারির গন্ডি পেরোতে পারেননি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পঞ্চম শ্রেণিতেই গুটিয়ে ফেলেন বইখাতা। শুরু হয় আয়-রোজগারের পথ খোঁজা।

নানা কাজ করেছেন। কখনো মুদির দোকানে, কখনো বা সাহায্য করতেন বাবার রিকশা- ভ্যানগাড়ি ঠিক করার কাজে, কখনো একটু-আধটু কৃষিকাজ। এভাবেই বাবার সাথে সংসারের হাল ধরেন নুরুল আবছার। এমন কষ্টের আয় করে বিয়েও দেন দুই বোনকে। স্বল্প আয়ে এত বড় সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন। কোনো উপায়ান্তর না দেখে মনস্থির করেন বিদেশে যাওয়ার। ব্যাটে-বলে মিলেও যায়। ২০১৩ সালে একটি সুপারশপে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন ওমানে। সেখানে পাঁচ বছর কাজও করেন। শেষে আবার দেশে ফেরেন। এবার আয় আরও বাড়ানোর আশায় ঠিক করেন সৌদি আরব যাবেন।

২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কোম্পানির আবাসন সুবিধাসহ মাসিক বেতন ২৫ হাজার টাকা। পাথর ভাঙার কারখানায় শ্রমিকের কাজ। হাড়ভাঙা খাটুনি। তবু যেন সয়ে যায় শরীর। সেখানেই কাজ করতে করতে কেটে যায় পাঁচটি মাস। এরপর মুখোমুখি হন জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম অধ্যায়ের। দিনটি ছিল একই বছরের ৮ আগস্ট, পাথর ভাঙার মেশিনে সমস্যা দেখলে সেটি তদারক করতে যান আবছার। হঠাৎ মেশিনের বেল্টে তাঁর হাত আটকে কাটা পড়ে যায় ঘটনাস্থলে। কিছু বোঝার আগেই আবছার দেখেন তাঁর এক হাত নেই। সেখানেই জ্ঞান হারান।

দীর্ঘ ৩ মাস সৌদি আরবের আল কাছিমের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার পর বুকে চাপা স্বপ্ন নিয়ে ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর দেশে ফেরেন নুরুল আবছার। সমস্ত আশা-আকাঙক্ষা- স্বপ্ন সমুদ্র পাড়ের বালুর ঘরের মতো ভেঙে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নুরুল আবছার বলেন, চেয়েছিলাম দুহাতের আয়ে ভালো থাকবে পরিবার। কিন্তু  পারলাম কই। আমার আশা এই পঙ্গুত্ব জীবনে আমার পাশে দাঁড়াবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এত ঝড়ঝাপটার পরও আশা ছাড়েননি আবছার। আবার উঠে দাঁড়াতে চান। পাশে চান দেশের মানুষকে।

Leave a Reply