নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে বিশ্বসম্প্রদায়ের অঙ্গীকার

নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে বিশ্বসম্প্রদায়ের অঙ্গীকার

জাতিসংঘ ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৯১টি দেশ আন্তর্জাতিক অভিবাসনকে নিরাপদ, সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলকরণের উদ্দেশ্যে করা কম্পেক্ট-এর পরিমার্জিত সংস্করণ (১১ জুলাই ২০১৮) গ্রহণে সম্মত হয়েছে। ‘দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ’—এ যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০১৭ সালের ডিসেম্বর এ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। অপরপক্ষে, হাঙ্গেরি পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আলোচ্য কম্পেক্টের বিষয়সমূহ তাদের দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি আখ্যা দিয়ে আগামী ডিসেম্বরে মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য এর আনুষ্ঠানিক গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।

অভিবাসনবিষয়ক গ্লোবাল কম্পেক্টে দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

ক. দারিদ্র্য ও সুযোগের অভাবসহ অন্যান্য যে সকল কারণে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মানুষ অভিবাসনে আগ্রহী হয় সেগুলো চিহ্নিত করে এর প্রতিকার গ্রহণ।

খ. সকল পর্যায়ে (ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র) অভিবাসনের সুফল বয়ে আনার কৌশল নির্ধারণ ও সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ।

অনেকেই এটিকে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী দলিল হিসেবে অবহিত করছেন, যাতে অভিবাসীদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্বকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিবাসন ও অভিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতাকল্পে সকলের সম্মত হওয়ার বিষয়টি এ কম্পেক্টের প্রণিধানযোগ্য বিষয়।

গ্লোবাল কম্পেক্টে ২৩টি উদ্দেশ্যের প্রত্যেকটি উদ্দেশ্য পূরণে কী কী ব্যবস্থা ও কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে তার একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে, রাষ্ট্রসমূহ এ উদ্দেশ্য পূরণে জাতীয় পর্যায়ে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর এর সাফল্য নির্ভর করবে। অভিবাসনকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণকরণে রচিত এ কম্পেক্টটি আইনগতভাবে অবশ্য পালনীয় কোনো দলিল না হলেও সদস্য রাষ্ট্রসমূহ নৈতিকভাবে এটির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করবেন মর্মে সম্মত হয়েছে। ‘সকলের স্বার্থেই অভিবাসন প্রক্রিয়াকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা উচিত’ এ বাস্তবতাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরে নিয়েই সকল পক্ষ কম্পেক্টের বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

দীর্ঘ আলোচনাকালে যে কয়েকটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয় তার অন্যতম ছিল বৈধ কাগজপত্র নেই এমন অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি। ইউরোপীয় দেশগুলো এ বিষয়ে সোচ্চার ছিল সবচেয়ে বেশি। তারা উৎস দেশসমূহের সঙ্গে ইতিমধ্যে একধরনের সমঝোতা করেছে। যার আলোকে বৈধ কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে নিজ নিজ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান আছে।

তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ, উৎস দেশসমূহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সহযোগিতার মনোভাব দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। অপরপক্ষে উৎস দেশসমূহ ইউরোপীয় দেশসমূহের সঙ্গে অনিচ্ছাকৃত সমঝোতায় উপনীত হলেও সমষ্টিগত বিতাড়নের প্রচেষ্টাকে অমানবিক হিসেবে গণ্য করছে। তাদের যুক্তি হলো, এ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। তা ছাড়া, জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো এ সকল অভিবাসীদের উৎস দেশে পুনর্বাসন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভব। অধিকন্তু, ফেরত পাঠানোকালে যে ধরনের বা যে পরিমাণ সহায়তা প্রদান করা হয় তা ফেরত যাওয়া অভিবাসীদের পুনর্বাসন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। এ প্রেক্ষাপটে দুই পক্ষের অবস্থান ও যুক্তিকে সমান প্রাধান্য দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি ফ্রেমওয়ার্ক ধারণা এ কম্পেক্টে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা থেকে উভয় পক্ষ উপকৃত হতে পারে।

এখানে প্রণিধানযোগ্য, এ কম্পেক্টের মাধ্যমে অভিবাসনের মতো অনেক পুরোনো অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি পরিপূর্ণভাবে জাতিসংঘের অধিক্ষেত্র ভুক্ত হতে যাচ্ছে। স্মর্তব্য, এমনকি ইতিপূর্বের ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫’-এ অভিবাসনের বিষয়টি একেবারেই অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক এক আলোচনায় বলেছেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও বহুপক্ষীয় আলোচনায় অভিবাসনের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পেত না। সে হিসেবে অভিবাসন বিষয়ে গত কয়েক বছরের উন্নয়ন লক্ষণীয়। বিশেষ করে, উৎস দেশসমূহের জন্য এটি একটি অভূতপূর্ব সাফল্য বলা চলে। ২০১৬ সালে ‘নিউইয়র্ক ঘোষণা’র মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিবাসনকে নিরাপদ ও সকলের জন্য কল্যাণকরকরণে শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য দুটি পৃথক কম্পেক্ট রচনায় বিশ্ববাসী সম্মত হয়। তবে এর বীজ রোপিত হয় মূলত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০’-এ এর অন্তর্ভুক্তি এবং তাতে বিশ্বের সামগ্রিক ‍উন্নয়নে অভিবাসনের ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতির মাধ্যমে। পাশাপাশি ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থাকে জাতিসংঘের আওতাভুক্ত বিশেষ সংস্থা হিসেবে মর্যাদা দেওয়াকে অন্যতম মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা যায়।

কম্পেক্টের উদ্দেশ্যানুযায়ী উৎস দেশসমূহ যাতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হয় তার জন্য সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অভিবাসী ও অভিবাসনবিষয়ক তথ্য অনুসন্ধান, সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, অভিবাসনের গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরিতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি আঞ্চলিক গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। শ্রম অভিবাসীদের স্বার্থে চাকরিদাতা পরিবর্তনের সুযোগ (যা কাফালা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত), চাকরিদাতা কর্তৃক অভিবাসীদের যেকোনো প্রকার দলিল জব্দকরণকে নিষিদ্ধকরণ এবং চাকরিপ্রার্থী ও চাকরিদাতা মধ্যকার লিখিত চুক্তিনামার সঠিক বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসীদের সমষ্টিগত বিতাড়নের উদ্যোগ বন্ধ করে প্রতিটি কেস আলাদা আলাদা মূল্যায়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডিটেনশনকে শুধুমাত্র সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। নিয়মিত-অনিয়মিত নির্বিশেষে অভিবাসীদের মানবাধিকার ও মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে যৌথভাবে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশের মতো উৎস দেশসমূহকে কেন্দ্রীয়ভাবে সকলের জন্য উন্মুক্ত একটি জাতীয় ওয়েবসাইট চালুকরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে অভিবাসী ও অভিবাসনে আগ্রহীগণ সঠিক তথ্য প্রাপ্তি ও যাচাইয়ের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন।

গ্লোবাল কম্পেক্টটি বাস্তবায়নে জাতিসংঘের মহাসচিব ‘জাতিসংঘ অভিবাসন নেটওয়ার্ক’ গঠনের প্রস্তাব করেছেন, যাতে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের পূর্ণ সমর্থন ছিল। আইওএম এ নেটওয়ার্কের সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবে ও অগ্রগতি জাতিসংঘের মহাসচিবকে অবহিত করবে। অপরপক্ষে, জাতিসংঘের মহাসচিব প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর সাধারণ পরিষদে সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে এ বিষয়ে অবহিত করবেন। তা ছাড়া, প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক অভিবাসন রিভিউ ফোরাম প্রতি চার বছর পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য বসবে এবং জাতিসংঘকে দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দেবে। পাশাপাশি ‘কলম্বো প্রসেস’-এর মতো আঞ্চলিক পরামর্শক ফোরামসমূহের মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে গ্লোবাল কম্পেক্টির বাস্তবায়ন অগ্রগতি রিভিউ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া, অভিবাসন ও উন্নয়নবিষয়ক বিশ্ব ফোরাম, জিএফএমডি উদ্ভাবনী কৌশল ও পার্টনারশিপ গঠনে সহায়তা প্রদান করতে পারে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, গ্লোবাল কম্পেক্টটি প্রণয়নে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হয়েছে। এটির প্রণয়নের সময় সদস্য রাষ্ট্রসমূহের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, সিভিল সোসাইটি ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সংস্থার মতামত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো উৎস দেশসমূহের এ কম্পেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে কী অর্জিত হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে যেহেতু ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলোচ্য কম্পেক্টির উদ্দেশ্যসমূহ নির্ধারণ করা হয়েছে, তাই এর বাস্তবায়ন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রভূত সহায়তা করবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়সমূহের ম্যাপিং, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং চাহিদা ও আর্থিক কৌশল নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করেছে, যাতে অভিবাসনসংশ্লিষ্ট লক্ষ্য ও সূচকসমূহ যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে।

আগেই বলা হয়েছে, কম্পেক্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী ডিসেম্বরে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক গৃহীত হবে। তাই, সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জন্য চ্যালেঞ্জিং কার্য শুরু হবে মূলত এটি গ্রহণের পর। এর ইতিবাচক ফলপ্রাপ্তির জন্য বাংলাদেশি এক কোটিসহ বিশ্বের ২৬ কোটি আন্তর্জাতিক অভিবাসী অপেক্ষা করে আছেন।

মোহাম্মদ হোসেন সরকার, বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড।

Leave a Reply