নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি, পরিবারে শঙ্কা
প্রশ্ন হলো, এই ২৪ জন যুবককে লিবিয়া থেকে উদ্ধারের উপায় কোথায়, সেই সাথে এধরনের পাচার রোধে উপায় কী?

নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি, পরিবারে শঙ্কা

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :
থেমে নেই ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পথে যাত্রা। উন্নত জীবনের আশায় ঝুঁকি নিয়ে দেশ থেকে পাড়ি জমায় বিদেশে। কিন্তু তারা পড়ছে মানব পাচারকারীর হাতে। হারাচ্ছে সর্বস্ব। এমনকি জীবনও। সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হয় লিবিয়ায় একজন অভিবাসী নির্যাতনের ভিডিও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের চাষার গ্রামের এরশাদ হোসেন জনি লিবিয়ায় মাফিয়ার হাতের বন্দী। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি তার। এ ঘটনার পর গত ৫ মে ওই মাদারীপুর এলাকার দালাল জাহিদ খান ইউসুবকে আটকের পর জেল হাজতে পাঠায় পুলিশ। ২০২০ সালের জুনে লিবিয়ায় গুলি করে হত্যা করা হয় ৩০ জন অভিবাসীকে। যাদের মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি নাগরিক। তাদের অধিকাংশের বাড়ি মাদারীপুরে।

জানা যায়, মাদারীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামের সহজ-সরল মানুষ বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দালাল চক্রের হাত ধরে বিদেশে পাড়ি জমায়। পরে তারা সর্বস্বান্ত হয়। শিকার হয় অকথ্য নির্যাতনের। তারই ধারাবাহিকতায় খবর আসে জনি ও তার সঙ্গে আরো ২৩ জন বন্দী হওয়ার। জনির ভিডিও ভাইরালের পর ওই গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এই খবর। যারা লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে বন্দী। মাফিয়ারা নির্যাতন করে সে সব ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা দাবি করছে। অনেক ভুক্তভোগীর পরিবার এ ব্যাপারে ভয়ে কথা বলছেন না। কারণ তাদের আশঙ্কা, কথা বললে বা অভিযোগ করলে মাফিয়ারা আটকদের হত্যা করবে। কিন্তু তাদের পরিবারে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা। দালাল জাহিদকে জেলে পাঠানোর ফলে লিবিয়ায় তারা হত্যার শিকার হতে পারে বলেও আশঙ্কা।

প্রশ্ন হলো, এই ২৪ জন যুবককে লিবিয়া থেকে উদ্ধারের উপায় কোথায়, সেই সাথে এধরনের পাচার রোধে উপায় কী?

জেনে বুঝে কেন ঝুঁকির পথে

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান ইমিগ্রেশন নিউজকে বলেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সেখানে যান। তাদের বেশিরভাগ শরীয়তপুর, মাদারীপুর অঞ্চলের লোকজন। সবকিছু জেনে বুঝেই তারা ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছেন। এমনই ২৪ জন লিবিয়ায় বন্দী হওয়ার খবর পেয়েছি। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে মাদারীপুর পুলিশ দালাল একজনকে আটক করেছে। এই বিষয়ে আমি দুটা কথা বলবো।

প্রথম কথা হলো, যারা বিদেশে পাড়ি জমায় তারা যেন এধরনের ঝুঁকি গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যদিও তারা ভাবে যে, এভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলে গেলে তাদের স্বপ্ন ও সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এই যে ভ্রান্তি, তা ভিষণ দু:খজনক। যতক্ষণ তারা সচেতন না হবেন, ততদিন পুলিশ দিয়ে, আইন বা কামান দিয়ে সমাধান হবে না। মূল কথা হলো তাদের এবং পরিবারকে সচেতন হতে হবে। আমরা ২৪ জনের বন্দীর খবর পাচ্ছি। এভাবে আরো অনেকে যেতে প্রস্তুত হয়তো। এক্ষেত্রে সচেতনতার বিকল্প নেই।

শরিফুল হাসান আরও বলেন, তবে যারা এভাবে লোক পাঠায় তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। লিবিয়ায় যে চক্র রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। কেননা, একা একটি দেশের পক্ষে মানবপাচার বন্ধ করা সহজ নয়, সম্মিলিতভাবে করতে হবে।

লিবিয়ায় আটকাদের উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, লিবিয়া থেকে তাদেরকে উদ্ধার করা কঠিন। পরিবারগুলো যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করেন, তাহলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা- দেখতে পারে। সেই চেষ্টা চালানো যেতে পারে।

যা বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ইমিগ্রেশন নিউজকে বলেন, প্রথম কথা হলো, লিবিয়াতে যাওয়া আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। এরপরও যারা অবৈধভাবে যান, এক্ষত্রে তাদেরকে যারা উৎসাহ দেন এবং যারা অবৈধভাবে যেতে সহযোগিতা করেন, তাদের পরিবার সহ সবাইকে শাস্তি দেওয়া উচিত।

আব্দুল মোমেন বলেন, সেসব দেশ থেকে যাদের আমরা জীবিত উদ্ধার করে এনেছি তাদেরকে শাস্তি দেওয়া উচিত। তারা কেন গেল? অন্যায়ভাবে গেছে। তারা জানে যে, ওখানে নতুন সরকার আসছে। স্থিতিশীল পরিবেশ নেই। ওই দেশটা যাওয়ার মতো জায়গা না। তাই যারা যান এবং যাদেরকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি, প্রথমত তাদের শাস্তি দেওয়া দরকার। কারণ তারা নিজেদের চেষ্টায় যান। পরে জীবনের ঝুঁকিতে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে বদনাম হয় দেশের। এটি আমাদের জন্য দুঃখের বিষয়।

‘তাই এর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, যারা পাঠায়, এবং পরিবার যারা উৎসাহ দেয় তাদেরও শাস্তি হওয়া উচিত। তাহলে এটা বন্ধ হবে। না হয় আমরা কীভাবে বন্ধ করবো?’-বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আগেরবার ২৬ জন মারা যাওয়ার পরে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সেখানে যারা মেরেছে, তারা আইনের বাইরে। সেখানে আইন বলতে কিছু নেই। তবু আমরা সে দেশের সরকারকে বলেছি, যারা এর জন্য দায়ী তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য এবং তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য। কিন্তু কোনোটা হয়েছে বলে আমার ধারণা নেই। বর্তমানে যারা বন্দী আছে তাদের উদ্ধারের বিষয়ে খুব কম সুযোগ রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। তবে সুযোগ খুব কম।‘

Leave a Reply