প্রতারণার ফাঁদ : নূরজাহানের অন্ধকার জীবন
অন্ধকার এক প্রকোষ্ঠ থেকে নূরজাহানের অবস্থান এখন ভারতের একটি জেলে।

প্রতারণার ফাঁদ : নূরজাহানের অন্ধকার জীবন

ইমি‌গ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

দরিদ্র পরিবারে জন্ম। স্বপ্ন ছিলো উন্নত সচ্ছল জীবনের। সেই উন্নত ও সচ্ছল জীবনের হাতছানি যখন পেলেন তখন আগে-পিছনে কিছু না ভেবেই সে হাতছানিতে সাড়া দিলেন কুমিল্লার লাকসামের কিশোরী নূরজাহান (ছদ্মনাম)। কিন্তু সেটা যে প্রতারণার ফাঁদ ছিলো সেটা বুঝতে বুঝতে হয়ে যায় অনেক দেরি। অন্ধকার এক প্রকোষ্ঠ থেকে নূরজাহানের অবস্থান এখন ভারতের একটি জেলে।

ফেইসবুকের মাধ্যমে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুর শান্তা আফরিন জারা নামের একজন মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হয় নূরজাহানের। সে নূরজাহানকে ভারতে একটি বিউটি পার্লারে চাকুরি এবং উন্নত জীবনে আশা দেখায়। নূরজাহান তার কথায় অনুপ্রাণিত হয়। এরপর শান্তা নুরজাহানকে সবুজ নামে নড়াইলের এক লোককে নিজের মালিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। কিছুদিন পর নূরজাহানের সাথে অরুল নামে সাতক্ষীরার আরও এক দালালের সাথে পরিচয় হয়। অরুল পাচারের উদ্দেশ্যে কিছুদিন নূরজাহানকে একটি ঘরে আটক করে রাখে এবং ২০,০০০ টাকার চুক্তিতে বেনাপোল বর্ডার দিয়ে অবৈধ ভাবে তাকে ভারতে পৌঁছাতে সহায়তা করে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নূরজাহান পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায়। পরে স্থানীয় এক দালালের সহায়তায় ৭০,০০০ ভারতীয় রুপির বিনিময়ে পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পায়।

নূরজাহান বেনাপোল থেকে কলকাতা পৌঁছানোর পর দালাল সবুজের সহায়তায় বেঙ্গালুরুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বেঙ্গালুরুতে পৌছানোর পর তাকে বিউটি পার্লারের চাকুরির পরিবর্তে একটি পতিতালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নূরজাহানকে নিয়মিত মাদক সেবন করানো হত। তাকে ভারতের বড় বড় শহর যেমন – চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরু নিয়ে গিয়ে যৌনকর্মী হিসেবে জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করা হত।একদিন হায়দ্রারাবাদে নূরজাহানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত এক এনআরই ইঞ্জিনিয়ারের দেখা হয়। নূরজাহান তার কাছে হিন্দি ভাষায় সাহায্যের জন্য আবেদন করে এবং তার সকল ঘটনা তার কাছে খুলে বলে। কিন্তু সে হিন্দি ভাষা বুঝতে না পারায় তার স্ত্রীর সঙ্গে নুরজাহানের কথা খুলে বলতে বলেন।

নুরজাহান তার স্ত্রীর কাছে বলে,“সম্প্রতি তাঁর এক বোন চেন্নাইতে বসবাস করছে যার সাথে সে সম্প্রতি সাক্ষাৎ করেছে” নূরজাহান একটি জাল আধার কার্ড(ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) ব্যবহার করছিলো, যেখানে তার নাম রীতা উল্লেখ ছিলো। স্ত্রীর মাধ্যমে নূরজাহানের কথা জানতে পেরে সেই ইঞ্জিনিয়ার ১০০০ ভারতীয় রুপি নূরজাহান কে দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।নূরজাহানকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার পর, পুলিশ তাকে বানজারা হিল থানায় নিয়ে রাখে। যে রাতে নূরজাহানকে থানাতে নিয়ে আসা হয় সেই রাতে বেঙ্গালুরু থেকে নূরজাহানের বোন পরিচয়ে ফোন আসে এবং নূরজাহানের ছেলে বন্ধু পরিচয়ে একজন ফোন করে নূরজাহানকে ছেড়ে দেয়ার জন্য বলে।

সাম্প্রতিক করোনার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির কারণে নুরজাহানকে ছেড়ে দেয়া হয়।পুলিশ নূরজাহানকে একটি আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যায় কিন্তু নূরজাহানের করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট না থাকার কারণে আশ্রয় কেন্দ্রে তাকে স্থান দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। নুরজাহান পুলিশকে অনুরোধ করে তাকে যেন কিছুক্ষন একা থাকতে দেয়া হয় এবং সেই সুযোগে সে ওই স্থান থেকে পালিয়ে যায়। যেহেতু নূরজাহানের নামে কোন মামলা দায়ের করা হয়নি পরে পুলিশ তার অবস্থান আর সনাক্ত করতে পারেনি।এরপর নূরজাহান ভারতের বিভিন্ন শহর অবৈধভাবে ভ্রমন করে।

বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার পাঁচবেরিয়া সীমান্ত এলাকায় আসে। সেখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নূরজাহান এবং এক বাংলাদেশী দালাল কে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে নুরজাহানকে এবং সেই দালাল ব্যক্তিকে বনগাঁও এর বাগধা থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং সেই থানা থেকে আদালতে প্রেরণ করা হয়। পুলিশের নথিতে নূরজাহানের বয়স ১৮ লেখা হলেও আদালত ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নুরজাহান তার বয়স ১৬ বছর বলে স্বীকার করে। বর্তমানে নূরজাহানের অবস্থান ভারতের একটি জেলে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসানের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকার দরিদ্র শিশু ও নারীরা, বিশেষত ভারতের সীমান্তের নিকটবর্তী বাংলাদেশের ৩০ টি জেলা (কুমিল্লা ও যশোরের মতো) মানব পাচারের জন্য বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার নারী ও শিশুকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার করা হয় যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে। তিনি বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাক এবং এর মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম মানব পাচারের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হয়ে বেঁচে যাওয়া লোকদের দেশে ফেরত নিয়ে আসার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছে।

মানব পাচার বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা। ২০১২ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মানব পাচারের প্রায় ৬০০০ মামলা করা হয়েছে এবং ১০,০০০ পাচারের শিকার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১ শতাংশ শিশু এবং ২১ শতাংশ নারী। বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে একটি পাচার বিরোধী আইন পাস করেছে।

Leave a Reply