প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃ‌তি নি‌য়ে কিছু প্রশ্ন
প্রবাসী হিসেবে আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবাসীদের আবেদন করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করা হবে কেন?

প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃ‌তি নি‌য়ে কিছু প্রশ্ন

ফারুক আহমদ :

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবাসে বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা রাখায় ১২ জন প্রবাসীকে (তাদের প্রায় সকলেই এখন বাংলাদেশের বাসিন্দা) মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি গত ৩১ মে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের এক সভায় সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। সংবাদে বলা হয়েছে, সে জন্য দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন আহবান করা হয়েছিল। যেসব আবেদন পাওয়া গেছে তার মধ্য থেকে ১২ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁরা তৎকালীন যুক্তরাজ্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদেরও সদস্য ছিলেন। মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন আরও যে সকল আবেদন তাদের কাছে আছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। তবে নতুন করে আর কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না।

এখানে প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে, দূতাবাসের মাধ্যমে কত সালে, কীভাবে আবেদনটি করা হয়েছিল? কারণ, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ সেন্টার, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ, লন্ডন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জেনেছি এ বিষয়ে কেউ কিছুই জানেন না। তা হলে আবেদন কোথায় এবং কীভাবে করা হলো? আবেদন করে যারা মুক্তিযোদ্ধা হলেন তার মধ্যে মাত্র তিন জন ছাড়া প্রায় সবাই দেশের বাসিন্দা কেন? বাংলাদেশ হাইকমিশন, লন্ডন সেই তালিকাটি প্রস্তুত করে থাকলে তারা কীভাবে তা করলেন? এর উত্তর কে দেবে?

প্রবাসী হিসেবে আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবাসীদের আবেদন করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করা হবে কেন? সরকার কী তাদের নাম জানেন না? না জানলে জানার কী কোনো পথ নেই? হাইকমিশনে কী তাদের নামের কোনো রেকর্ড নেই? না থাকলে কেন নেই? কারণ, ১৯৭১ সালে কে কত টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন, তখন ৩৩টি অ্যাকশন কমিটির কোন কমিটিতে কারা ছিলেন সবইতো হাইকমিশনে ছিল। সেই তালিকাতো মুদ্রিত আকারে এখনো সাধারণ মানুষের কাছেও আছে।

১৯৭১ সালে বিলেতে বাংলাদেশের সবচে‌য়ে বড় রাজনৈতিক দল ছিল যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ। এই যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ যে সকল কর্মকর্তার ছিলেন তারাই এর ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়ে কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আইনি সহায়তা দানের জন্য গঠন করেছিলেন ‘শেখ মুজিব ডিফেন্স ফান্ড’। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সহায়তা দেওয়ার জন্য গঠন করেছিলেন ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচনী তহবিল’; এরাই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য একটি নতুন জিপ গাড়ি কিনে লন্ডন থেকে পাঠিয়েছিলেন। এবং তারও পরে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে এরাই লন্ডনে গঠন করেছিলেন ,‘যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ’। তারপর গঠিত হয়েছিল যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ লন্ডন ও বার্মিংহাম শাখা। এই যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতা‌দের মাধ্যমেই বিলেতের বাঙালিরা দলমত নির্বিশেষে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তারাও তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে একযোগে কাজ করেন।

যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট গাউস খান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিশেষ অবদান রাখার কারণে ২০১১ সালে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর নামটি তালিকায় নেই কেন? যারা ১২ জনের এই তালিকাটি প্রস্তুত করেছেন তারা কি কখনো গাউস খানের নামটিও শোনেননি? ১৯৫৬ সালে সেই আওয়ামী মুসলিম লীগের সময় থেকে থেকে আরম্ভ করে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭৩ সালে আবদুল মান্নান সানু মিয়াকে দেশে নিয়ে গিয়ে এমপি বানিয়েছিলেন। তাঁর নামটিও কি হাইকমিশনের কেউ জানেন না? কভেন্ট্রি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ লুলু বিলকিস বানু, তাঁর নামটিও তালিকায় নেই। তা হলে কি নীতি নির্ধারকগণ কোনো নারীকেও তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার যোগ্য মনে করেন না? বলা বাহুল্য খোদ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ, লন্ডন আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ বার্মিংহাম শাখার সদস্যদের প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার যোগ্য মনে করেননি তখন ১২ জনের এই তালিকাটি নিয়ে কী আর বলার থাকতে পারে।

এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে বিলাত-প্রবাসীদের ভূমিকা নিয়ে কমপক্ষে ডজনখানেক ইতিহাস প্রকাশিত হয়েছে। এই সকল ইতিহাসের কোথাও প্রাক্তন বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী প্রমুখের কোনো ভূমিকার কথা বা তাদের নামের ছিটেফোঁটো খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁদের বাংলাদেশ স্টুডেন্ট্স অ্যাকশন কমিটির সদস্য হিসেবে অভিহিত করা হলেও মূল কমিটির কোথাও তাঁদের নাম নেই। নাকি ‘ঢালমে কুচ কালা হে’।

এবার আসি আবেদন করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করার ব্যাপারে। ধরে নিলাম এটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। প্রশ্ন হচ্ছে আবেদন করার নিয়ম কী ছিল? অর্থাৎ কে আবেদন করবেন? কারণ যারা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য আবেদন করবেন সেই নেতৃস্থানীয় প্রায় সবাইতো এখন পরপারের বাসিন্দা। ধরে নিলাম তার পক্ষে কেউ করবেন। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক ‘বাংলাদেশ মহিলা সমিতির প্রেসিডেন্ট’ জেবুন্নিসা বক্স-এর জন্য আবেদন করা হবে। কিন্তু তিনি ও তার স্বামীতো সেই কবে মারা গেছেন। তাদের কোনো সন্তানাদিও নেই। তা হলে করবে কে?

তাই আমরা দাবি জানাচ্ছি, প্রবাসীরা (যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ আরও অনেক দেশের) ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধের সময়ে ৪ লাখ ১২ হাজার ৮৩ পাউন্ড বাংলাদেশ ফান্ডে চাঁদা দিয়েছেন। এর মধ্যে আন্দোলনের সময় খরচ বাদে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭১ পাউন্ড বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন এবং এটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম রিজার্ভ। এই প্রবাসীরা এখনো সেই রিজার্ভে ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেই চলার কারণেই বাংলাদেশ আজ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। প্রবাসী নামক এই দাতাগোষ্ঠী মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়ে কোনো ভাতা নিতে চান না। তাঁরা চান, দেশের স্বাধীনতায় তাঁরাও যুক্ত ছিলেন, তাঁরাও মুক্তিযোদ্ধা শুধু এই স্বীকৃতিটা। বঙ্গবন্ধুর দল প্রবাসীবান্ধব আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা এখন দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের আবেদন হলো ১৯৭১ সালে বিলাতে ৩৩টি অ্যাকশন কমিটি ছিল এবং প্রত্যেক কমিটিতে সাত থেকে দশজন করে কার্যকরি সদস্য ছিলেন। সবাইকে নয়, বরং এই ৩৩টি অ্যাকশন কমিটির কর্মকর্তাদের যদি মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা হয় তা হলেই সকল প্রবাসীর প্রতি যেমন সুবিচার করা হবে, সম্মান জানানো হবে, তেমনি এ নিয়ে বিভ্রান্তিরও অবসান হবে। হাইকমিশনের মাধ্যমে এই কাজটি করা ক‌ঠিন নয়। সেজন্য প্রবাসী হিসেবে আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

ফারুক আহমদ: লেখক ও গ‌বেষক, যুক্তরাজ্য

Leave a Reply