প্রবা‌সে নির্যা‌তিত নারী: দায় কার?
আপনারা বলেন এই শিশুটিকে কী জবাব দেবেন? কী জবাব দেবেন এই মাকে? কী জবাব দেবে বাংলাদেশ?

প্রবা‌সে নির্যা‌তিত নারী: দায় কার?

শরিফুল হাসান :

ছোট্ট শিশুটি মায়ের কোলে হাসছিল। ছয় মাসের এই ছেলেটাকে নিয়ে আজ মঙ্গলবার সকালে সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন ৩২ বছরের এক নারী। তাঁর কথা, সৌদি আরবে যে বাড়িতে কাজ করতেন সেই সৌদি গৃহকর্তা শিশুটির বাবা। এখন এই সন্তানকে নিয়ে কিভাবে তিনি নিজের বাড়িতে যাবেন বুঝতে পারছেন না। কারণ সমাজ যে তাকেই কটু কথা বলবে।

একদিকে শিশুটির হাসিমাখা ছবি দেখে আরকেদিকে মায়ের এমন আহাজারি! বিস্তারিত শুনে দুপুর থেকে আমি ছটফট করছি। শাওয়াল মাসের রোজা রেখেছিলাম। ক্ষুধার্ত অবস্থায় সেই ছটফট আরও বেড়েছে। আপনারা দেশের ১৭ কোটি মানুষ ঘটনা শুনে বলুন আমাদের করণীয় কী? বলেন এই শিশুটির দায় কার? আমরা কথা বলে জেনেছি এই নারীর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কথা বলে আমরা জানলাম, ২০১৯ সালের নভেম্বরে সৌদি আরব যাওয়ার পর থেকেই প্রতিনিয়ত নিয়োগকর্তা তাকে যৌন নিপীড়ন করতেন।

একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে নিয়োগকর্তা দায়িত্ব না নিয়ে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এরপর তাকে পুলিশ সৌদি আরবের সফর জেলে নিয়ে যায়। নয়মাস জেলে ছিলেন। সেখানেই শিশু সন্তানটির জন্ম। তিনি তার সন্তানের নাম রেখেছেন আবদুর রহমান। ওই নারী আমাদের কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ”আমি কোথায় যাবো এখন এই ফুটফুটে বাচ্চাটাকে নিয়ে? আমার পরিবারের কেউ বিষয়টি জানে না। তাকে নিয়ে আমি পরিবারে ফিরতে পারবো না। সমাজের লোকেরা ভালো ভাবে নেবে না”।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই নারী বিমানবন্দরে নেমেই বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের কাছে যান। বিস্তারিত বলেন। এরপর পুলিশের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের বিমানবন্দরের কর্মকর্তা আল আমিনকে জানান। এরপর ওই মা ব্র্যাকের হেফাজতেই আছেন। আমাকে বলেন আমরা এখন কোথায় যাবো? কী করবো? আমি একই সঙ্গে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান, একই সঙ্গে একজন সাংবাদিক, কিছুটা শিক্ষকতা করি আর সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি মানুষ। সংবেদনশীল মানুষ। এই বাংলাদেশের একজন মানুষ। আপনারা বলেন এখন কী করবো?

হ্যা, আমরা এই মায়ের পরিচয় গোপন রাখবো, এই শিশুটির জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করবো কিন্তু আমাকে বলেন এর শেষ কোথায়? বলেন কেন এই ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হবে না? আমাদের দূতাবাস মেয়েটিকে পাঠিয়ে দেওয়ার আগে কেন খোঁজ নিলো না, সৌদি আরবের কোন বাড়িতে এই নারী কাজ করতেন? তাঁর নিয়োগকর্তা কে? প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করে সন্তানের পিতৃপরিচয় বের করা উচিত। আমরা কেন এগুলো পারি না?
আর এই ঘটনাই তো প্রথম নয়। এর আগে আমরা এই ধরনের ১২ টি ঘটনা দেখেছি। তাদর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা যেন না ঘটে সে বিষয়ে আমাদের সোচ্চার ও নীতি নির্ধারকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। আপনাদের নিশ্চিই গত ২ এপ্রিলের কথা মনে আছে। সৌদি আরব থেকে ফেরা এক নারী নিজের নাড়িছেঁড়া আট মাসের শিশু সন্তানকে বিমানবন্দরে ফেলেই চলে গিয়েছিলেন। পরে সেই শিশুটির স্থান হয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোট মনি নিবাসে।

এর আগে গত ২৬ মার্চ সৌদি আরব থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সন্তান দিয়ে দেশে ফিরেছেন নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার কুমারী শাহনাজ আক্তার (২৭)। শাহনাজ সৌদি আরবের মক্কাস্থ কেন্দ্রীয় জেলে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় পুত্র সন্তান জন্মদেন। শাহনাজকে পাসপোর্টে বয়স পরিবর্তন করে গৃহকর্মীর কাজ দিয়ে সৌদি আরব পাঠায় একটা এজেন্সি।

এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারী চার মাসের মেয়ে সন্তান নিয়ে ওমান থেকে দেশে ফিরতে বাধ্যহন সাথী আক্তার নামের এক নারী গৃহকর্মী। বিমানবন্দরে পৌছার পর সাথী আক্তার তার বিষয়টি এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ অফিসে গিয়ে বলেন তার সন্তানের পিতা একজন ওমানি নাগরিক। তিনি বলেন নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলে তাকে ওমান পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ওমান ডির্পোটেশন ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় তার সন্তানের জন্ম হয়।

এমন ঘটনার তো শেষ নেই। আপনারা বলেন এর শেষ কোথায়? শিশুটির ছবিটা যদি আপনাদের দেখাতে পারতাম। আমার ভেতরের যন্ত্রণা যদি আপনাদের দেখাতে পারতাম? মায়ের দুশ্চিন্তা যদি আপনাদের দেখাতে পারতাম?

আপনারা যারা ফেসবুকে আছেন, যারা নেই, যারা এই দেশের নীতি নির্ধারক, যারা সাধারণ, যারা রাজনীতিবিদি। সবার কাছেই আমার প্রশ্ন। আপনারা বলেন, এই ঘটনার শেষ কোথায়? আপনারা বলেন এই শিশুটিকে কী জবাব দেবেন? কী জবাব দেবেন এই মাকে? কী জবাব দেবে বাংলাদেশ? কী জবাব দেবে সৌদি আরব? কী জবাব দেবে এই পৃথিবী?

শরিফুল হাসান, ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

Leave a Reply