প্রাণ হাতে কেন ইউরোপ পাড়ি?
স্বপ্নের ইউরোপে যখন মৃত্যুর হাতছানি

প্রাণ হাতে কেন ইউরোপ পাড়ি?

ইমিগ্রেশন নিউজ : যুবক আলাউদ্দীনের স্বপ্ন ছিল পাড়ি দেবেন ইউরোপের স্পেনে। দালালের ‘মিষ্টি’ কথায় আস্থা রাখেন। সহায়-সম্বল বেচে তাঁর হাতে তুলে দেন ১১ লাখ টাকা। কিন্তু কোথায় ইউরোপ! বিভিন্ন দেশে আটকে দফায় দফায় মুক্তিপণ আদায়। শেষ ঠাঁই হয়েছে আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে। আলাউদ্দিনকে কখনো সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, কখনো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে।

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এই বাসিন্দাকে বিদেশের মাটিতে মানব পাচারকারীরা জিম্মি করে কয়েক দফায় আরও ৩ লাখ টাকা আদায় করে। তবে ইউরোপে তাঁর যাওয়া হয়নি। মরক্কোতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।

আলাউদ্দীনের মতো হাজারো বাংলাদেশি প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সব খোয়াচ্ছেন। শুধু তাই নয়, প্রাণও যাচ্ছে। অথচ এসব অভিবাসন প্রত্যাশীদের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। যে স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে  খুব সংখ্যক মানুষ সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। তাও যে খুব বেশি সচ্ছলতা আসে তা নয়। ভাষা না জানা ও অদক্ষতার কারণে ভালো কাজ জুটে না। আয়ও হয় খুব কম। তবু কেন টাকা খরচ করে এমন ঝুঁকির পথ বেছে নেওয়া?

যেভাবে মানবপাচার

ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া শরণার্থীরা উদ্ধারকর্মীদের জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে লিবিয়া বা তুরস্ক যেতে একজনকে ১০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দিতে হয়।  ‘এজেন্সি’ তাদের লিবিয়া পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দেয় ওয়ার্কিং ভিসার জন্য এজেন্সিকে ৩ থেকে ৪ হাজার ডলার দিতে হয় বলেও জানিয়েছেন তাঁরা আবার অনেককে দুবাই হয়ে মরক্কোতেও নিয়ে যায়। সেখানে কয়েক দফা মুক্তিপণ আদায় করে।

আইওএম সূত্র জানায়, বাংলাদেশিদের প্রথমে দুবাই এরপর বিমানে করে তারা লিবিয়া পৌঁছান। আবার অনেককে আবুধাবি থেকে সড়কপথে মরক্কোও নিয়ে যান। অনেক বাংলাদেশি দীর্ঘদিন মরক্কো ও লিবিয়াতে বাস করার পর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। আবার অনেকেই আছেন কিছুদিন আগে সেখানে পৌঁছেছেন। তারা সরাসরি ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আইওএম-র তথ্য অনুসারে, একজন বাংলাদেশি অভিবাসীকে লিবিয়া যেতে ১০ হাজার ডলার এবং ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য নৌকা খরচ দিতে হয় ৭০০ ডলার।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে অপসারণে সামরিক অভিযানের পর লিবিয়ায়  মানবপাচারকারীরা সক্রিয় হয়েছে এবং বিশাল অঙ্কের অর্থ আয় করছে।

ঝুঁকির পথে পদে পদে মৃত্যুর শঙ্কা

বিপদজনক পথে ইউরোপ অভিমুখে অভিবাসীদের যাত্রা

বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের পশ্চিম একলাশপুর গ্রামের রফিক উল্যাহর ছেলে আলাউদ্দীন ২০১৯ সালে স্পেন যাওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী দলের সদস্য মো. হানিফকে ১১ লাখ টাকা দেন। এরপর ওই বছরের ২০ মার্চ হানিফ বিমানযোগে আলাউদ্দীনকে দুবাই পাঠান। সেখানে পাচারকারীদের দুই সদস্য আলাউদ্দীনকে গ্রহণ করেন। তাঁরা আলাউদ্দীনের সঙ্গে থাকা তিন হাজার ইউরো ছিনিয়ে নেন। তাঁকে একটি ভাড়া বাড়িতে রেখে আরও টাকার জন্য চাপ দেন। এতে বাধ্য হয়ে আলাউদ্দীন তাঁদের দেওয়া বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবে একই মাসের ২৫ তারিখে ৫০ হাজার টাকা জমা দেন। এরপর আলাউদ্দীনকে দুবাই থেকে আফ্রিকার মালিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মালিতে অবস্থানকারী দুই পাচারকারী আলাউদ্দীনকে গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে পাচারকারী দলের সদস্যরা পাসপোর্ট ছিনিয়ে নিয়ে আলাউদ্দীনকে একটি বাড়িতে আটকে রাখেন। সেখানে আলাউদ্দীনসহ ১৯ জনকে জড়ো করে একটি দল তৈরি করা হয়। এরপর একটানা পাঁচ দিন তাঁদের কিছু পথ লরিতে করে ও হাঁটিয়ে মরক্কোর নাদোর শহরে আনা হয়। মরক্কোতে চক্রটি আলাউদ্দীনকে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে এবং তাঁর ওপর নানা নির্যাতন চালায়।

আলাউদ্দীন ফোনে বাড়িতে স্ত্রী সাবিনা আক্তারকে বিষয়টি জানালে তিনি স্বামীর মুক্তির জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দালাল মো. হানিফকে দেন।

পরে সাবিনা বাদী হয়ে মো. হানিফসহ অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে বেগমগঞ্জ থানায় মানব পাচার ও প্রতিরোধ দমন আইনে একটি মামলা করেন। তবু থামেনি নির্যাতন।

অবশেষে মামলা, দালাল গ্রেপ্তার

স্বামীকে এই দুর্দশা থেকে মুক্ত করতে দেশ থেকে বারবার টাকা পাঠিয়েও সফল হননি আলাউদ্দীনের স্ত্রী সাবিনা আক্তার। অবশেষে তিনি বাদী হয়ে দালাল মো. হানিফসহ অজ্ঞাতপরিচয় মানব পাচারকারীদের আসামি করে বেগমগঞ্জ থানায় মানব পাচার ও প্রতিরোধ দমন আইনে একটি মামলা করেন। তাঁর দায়ের করা মামলার সূত্র ধরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২ মার্চ বেগমগঞ্জের বাংলাবাজার থেকে হানিফকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার মো. হানিফ বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বসন্তের বাগ গ্রামের বাসিন্দা।

পুলিশ গুরুত্ব বিবেচনা করে তাঁরা মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নেয়। এরপর দীর্ঘ অনুসন্ধানে আসামি হানিফের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় সিআইডির একটি দল। গ্রেপ্তারের পর হানিফ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, তাঁরা আলাউদ্দীনকে বিদেশে পাঠানোর জন্য এ পর্যন্ত ১৪ লাখ টাকা নিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িত মানব পাচার চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। 

কেন ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈধপথে মাইগ্রেশনের সুবিধা যখন কমে যায় তখন মানুষ অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমান। এর এই অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্র জড়িয়ে পড়ে। তারা তাদের ব্যবসা বা অর্থ আদায়ের জন্য এই চক্র তৈরি করে। মানুষ নানাভাবে প্রতারিত হয়। লিবিয়াতে যাওয়ার পর সেখান থেকে ইউরোপের গন্তব্য খুঁজছে। এর আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে দুবাই ও সুদান হয়ে লিবিয়া। আর লিবিয়া থেকে ইউরোপে ঢোকার ।

তাঁদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন রোধে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে কাজ করতে পারে। দেশের মানবপাচার প্রতিরোধ আইন আছে। এতে কারও কারও শাস্তিও হচ্ছে। কিন্তু এরপরও মানুষ সচেতন হচ্ছে না। এ জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জরুরি সামাজিক সচেতনতা। এতে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সে কাজটি করতে পারেন। কারণ মানবপাচারকারীরা কিন্তু চিহ্নিত। তাদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া খুব সহজ।

উদ্বেগের আরেকটি বিষয়, ইউরোপের যাঁরা পাড়ি দেন তাঁরা বেশির মোটামুটি সচ্ছল। উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপের ঝুঁকির পথে পাড়ি দেয়। আবার আগে যাওয়া ব্যক্তিরাও তরুণদের প্ররোচনা দেয়। এতে মানবপাচারকারীর ফাঁদে পড়ে সহজে।

Leave a Reply