প্রাণ হাতে নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি কেন?
বাংলাদেশিরা কেন এমন বিপদসঙ্কুল পথ বেছে নিচ্ছেন এবং সেখানে কেন এমন ভয়ংকর দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে?

প্রাণ হাতে নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি কেন?

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

ভূমধ্যসাগার! ইউরোপ-আফ্রিকার মধ্যবর্তী সাগর। যেটি জিব্রাল্টার প্রণালি দ্বারা আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। ২৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের এই সাগর যেন মানবপাচারের প্রাণকেন্দ্র। দুর্ঘটনা, মৃত্যু এখানে নিত্যদিনের ব্যাপার। প্রায় সময় নৌকা ডুবিতে মারা পড়ছে শত শত অভিবাসনপ্রত্যাশী। যেখানে রয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ।

আইওএমের ২০১৭ সালে একটি জরিপ মতে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করা ৫টি দেশের তালিকায় বংলাদেশও রয়েছে। এর সঙ্গে লিবিয়া, তুরস্ক হয়ে ইতালি অথবা গ্রিস, ইত্যাদি দেশগুলোতে যেতে চায় সেসব মানুষ। সাধারণত বাংলাদেশ ছাড়াও যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক অথবা সাব সাহারা অঞ্চলের কিছু দেশের অধিবাসী এই রুট ব্যবহার করে -বলছে বিবিসি।

ধারাবাহিকভাবে এই সাগরে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটছে। ২০১৯ সালের ১০ তারিখের ঘটনা। ভূমধ্যসাগরে এক নৌকা ডুবিতে নিহত প্রায় ৬০ জন অভিবাসীর অধিকাংশই ছিল বাংলাদেশি নাগরিক। লিবিয়া থেকে ছোট্ট নৌকায় চেপে খুবই বিপদংসকুল পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন তারা। সেই নৌকাডুবিতে যারা মারা গেছে, বলা হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি।

সাধারণত আধুনিক কোনো নৌযানে এই পথ পাড়ি দেয়া যায়। পাচারকারীরা গাদাগাদি করে ছোট নৌকায় সাগরে নামিয়ে দেয় অভিবাসীদের। কখনো কখনো এমনকি বাতাস দিয়ে ফুলানো ডিঙিতে করে অভিবাসীদের বেশ কিছুটা পথ নিয়ে যায়। আর সেজন্যেই এত দুর্ঘটনা ঘটে।

সদ্য খবর, সম্প্রতি মনই একটি নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। সেটিও লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথের দুর্ঘটনা। তিউনিশিয়া উপকূলে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৩ জনকে। যারা বাংলাদেশি।

রেড ক্রিসেন্ট জানায়, ডুবে যাওয়া নৌকার আরও ৫৭ আরোহী নিখোঁজ হয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহে তিউনিশিয়া উপকূলে নৌকাডুবির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। যেখানে কয়েক সপ্তাহে মারা গেছে অন্তত ৬০ জন। ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রা পথে প্রায় ৬৩৩ শরণার্থী মারা গেছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন।

কিন্তু বাংলাদেশিরা কেন এমন বিপদসঙ্কুল পথ বেছে নিচ্ছেন এবং সেখানে কেন এমন ভয়ংকর দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে?

জীবনের অনিশ্চয়তা ও হতাশা

সাধারণত কোনো মানুষ খুব সহজে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে নিয়ে যায় না। মনোবিজ্ঞানীরাও এমনটা মনে করেন। সবদিক থেকে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়েন। তখন কোনো একটি স্বপ্নের পথ খোঁজ করেন। আর সে পথে যখন কেউ স্বপ্ন দেখান নতুন কিছুর, দিশাহীন মানুষগুলো সেটাকে সত্য ভেবে ঝুঁকি নেন। নেমে পড়েন অনিশ্চিত জীবনের পথে। মূলত অনিশ্চিত ক্যারিয়ারের হতাশা কাটিয়ে নতুন কিছুর প্রত্যাশা থেকে অনেকে এই পথে পা বাড়ান।

উন্নত জীবনের প্রলোভন

ঝুঁকি নিয়ে তারা উন্নত জীবনের স্বপ্নপূরণে ভূমধ্যসাগরে নেমে পড়েন। তারা চান নদী পথে ৩০০ মাইল পাড়ি দিয়ে ইউরোপের দেশে পা রাখবেন এবং নতুন জীবন গড়বেন।

বাংলাদেশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলছেন, যেকোনো মূল্যেই বাংলাদেশের অনেক নাগরিক দেশ ছাড়তে চান। ইউরোপ যেতে পারলেই তাদের ভাগ্য খুলে যাবে- তাদের এমনই মনোভাব। তরুণ প্রজন্মের এমন মনোভাব তাদেরকে ঝুঁকিতে ফেলছে। প্রয়োজনে তারা মহাসাগরে নামবেন। তবুও উন্নত জীবনে যেতে হবে। অনেকের কাছে ইউরোপ মানেই উন্নত জীবনের ছোঁয়া।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এক তথ্যে বলছে, ২০১৯ সালে প্রায় সাড়ে ২৩ ‍হাজার শরণার্থী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছেছেন। আর এই সংখ্যা অনেক বাংলাদেশিকে লোভের দিকে পা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। এমন লোভনীয় পরিসংখ্যান দেখিয়ে দালালরা গ্রামের সাধারণ বেকার তরুণদের লোভে ফেলে দেয়। আর তারা গ্রামের জমি বিক্রি বা বন্ধক রেখে পাড়ি জমায় অনিশ্চিত পথে। এভাবে হারিয়ে বসেন সর্বস্ব।

বেপরোয়া আচরণ

সরকারের একজন কর্মকর্তা বলছে, তাদের থাকে না বৈধ কাগজপত্র। তবুও যাচ্ছে। এমনও লোক আছে যে, পাঁচ বছর ধরে যাচ্ছেন।। জার্মানি পর্যন্ত তার যেতেই হবে। সে প্রথম গিয়েছে ইরাক। সেখান থেকে সিরিয়া, সেখান থেকে ইস্তাম্বুল, সেখান থেকে গ্রিস। এভাবে বিভিন্ন জায়গায় তিনি আটকে পড়ছেন, জেল খেটেছেন। কখনো সাগরে ডুবে যাচ্ছেন। এটাকে তিনি বলছেন, ‘বেপরোয়া আচরণ’।

লিবিয়া যুদ্ধের প্রভাব

বাংলাদেশিদের ঝুঁকি নেওয়ার পেছনে লিবিয়া যুদ্ধও েএকটি বড় কার অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান বলছেন এমনটাই বলছেন। তিনি বলেন, ২০১০ সালের দিকে প্রচুর বাংলাদেশি লিবিয়াতে কাজ করতেন। লিবিয়ায় যুদ্ধ শুরু হলে, অনেকেই বাংলাদেশে চলে আসেন। যে সংখ্যাটি ৩৭ হাজারের মতো। যারা আসতে পারেননি, এমন একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে ইউরোপ ঢোকার চেষ্টা করেন। তখন থেকেই ভূমধ্যসাগরের পথ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে মানবপাচার চক্র গড়ে ওঠে, যারা বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া তারপর ইউরোপ নিয়ে যাবে। এখনো তারা এই ঝুঁকিটা নিচ্ছে।

এমন ভয়ংকর ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশ যাত্রা ঠেকাতে শুধু বাংলাদেশ নয়, একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন মনে করছেন শরিফুল হাসান। তিনি বলছেন, এ ছাড়া আর সমাধানের কোনো পথ নেই’।

Leave a Reply