বিদেশে শিক্ষাবৃত্তির প্রস্তুতি যেভাবে গ্রহণ করতে হয়

বিদেশে শিক্ষাবৃত্তির প্রস্তুতি যেভাবে গ্রহণ করতে হয়

উচ্চশিক্ষা অর্জনে বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষা্র্থীরা বিদেশেগমন করে থাকে। দিন যতো যাচ্ছে ততোই শিক্ষার্থীদের এবিষয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী।বিভিন্ন সময় তারা স্বপ্ন দেখে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়বে। কিন্তু সমস্যা হলো সঠিক দিক নির্দেশনার অভাব। ফলে অনেকে বুঝে উঠতে পারে না যে, আসলে তাকে কীভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। সংক্ষিপ্ত এই লেখায় স্নাতক শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা বৃত্তির জন্য প্রস্তুতি বিষয়ে প্রাথমিক কিছু ধারণা পেতে পারে-

সিদ্ধান্ত গ্রহণ

যেকোনো কাজের জন্য সর্বপ্রথম লক্ষ্যস্থির করতে হয়। কেউ যদি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার চিন্তা করে তবে তাকে সুদৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এই বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসমর্থ হলে প্রয়োজনে অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এছাড়াও ইতোমধ্যে যারা বিদেশে গিয়ে পড়ালেখা করছেন তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এরপর সুন্দর একটা সিদ্ধান্তে আসা যায়।সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এবার তাহলে প্রস্তুতি শুরু করা যাক।

ভাষাজ্ঞান

সারাবিশ্বে উচ্চশিক্ষার একটি আন্তর্জাতিক মাধ্যম ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন। এর কোনো বিকল্প নেই। শুরুতে নিজের ইংরেজি দক্ষতা নিজেকে যাচাই করতে হবে। নিজের মধ্যে সমস্যা আছে মনে হলে দ্রুত এই বিষয়ে প্রস্তুতি শুরু করে দিতে হবে এবং তা ১ম-৩য় বর্ষের মধ্যে শুরু করলে সবচেয়ে ভালো।বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণস্বরূপ IELTS এর স্কোর চেয়ে থাকে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা থাকে, স্কোর ৬.৫। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্কোর ৬.০০/৭.০০ চেয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার আবেদনের জন্য GRE/GMAT প্রয়োজন হয় এবং বৃত্তি পেতে হলে স্কোর নুন্যতম ৩০০ হতে হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল

বিদেশে উচ্চশিক্ষাবৃত্তির জন্য একাডেমিক রেজাল্ট খুব বেশি সমস্যা না হলেও মোটামুটি একটা অবস্থান থাকা বাঞ্ছনীয়। ফলাফল খুব বেশি ভালো না থাকলে নিজের সহশিক্ষা কাযক্রম, গবেষণা, নেতৃত্ব, ভাষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি দিকগুলোতে  ভালো অবস্থান থাকতে হবে। যদিও একাডেমিক রেজাল্ট একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক রকম চাহিদা থাকে।  তবে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য স্নাতক-স্নাতকোত্তরে নুন্যতম সিজিপিএ ৪ এর মধ্যে ৩.০০ রাখতে হয়। আর ৩.৫০ সিজিপিএকে একটা ভালো ফলাফল হিসেবে ধরা হয়ে। এই ফলাফল থাকলে আবেদনের ক্ষেত্রে অনেকটা নির্ভার থাকা যায়।

সহশিক্ষা কার্যক্রম

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার সময় বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেরসঙ্গে যুক্ত থাকতে পারলে বৃত্তি পেতে দারুণ সহায়ক হয়। যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমান যুগে সাফল্যের জন্য ৫০ ভাগ একাডেমিক পড়ালেখা হলে বাকি ৫০ ভাগ হলো সহশিক্ষা কার্যক্রম। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় যদি নিজের অধ্যয়নরত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সহশিক্ষার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা যায়।মনে রাখতে হবে যে, সহশিক্ষায় যেখানে, যাই করুন না কেন, দায়িত্ব নিয়ে, নেতৃত্ব দেওয়ার মনোভাব থেকে কাজ করতে হবে। এতে করে নিজের মধ্যে নেতৃত্বগুণ, যোগাযোগ দক্ষতা, ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা প্রভৃতি সফট স্কিলস গড়ে উঠবে, যা পরবর্তী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে কাজে লাগবে।

বিভিন্ন প্রশিক্ষণ/কর্মশালা গ্রহণ

শিক্ষা জীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন কর্মশালা/প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা জরুরি। সেটা হতে পারে নিজের পছন্দ মতো যেকোনো দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্স, কর্মশালা। অন্যান্য ভাষা শিক্ষা, গ্রাফিক্স, আইটি/ওয়েব ডিজাইন, লেখালেখির, গবেষণাপদ্ধতির কর্মশালা, উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূল্ণ বিষয়গুলো শিখে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

ইন্টার্নশিপ

পড়ালেখা চলাকালীন সময়ে নিজের বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে এক বা একাধিক ইন্টার্নশিপ করা যেতে পারে। সেটা যেকোনো সৃজনশীর কর্মকাণ্ডের কিংবা গবেষণার ইন্টার্নশিপ হতে পারে।কোনো গবেষক কিংবা অধ্যাপক বা ভালো নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ শেখা  গেলে তো আরও ভালো। বিদেশে বৃত্তি পেতে ইন্টার্নশিপ সত্যি দারুণ সহায়ক।

কনফারেন্সে অংশগ্রহণ

বর্তমান পৃথিবীটা অনেক বেশি উন্মুক্ত। একটু চোখ-কান খোলা রেখে সচেতন হলে অনেক সুযোগ হাতে ধরা দেয়। দেশে কিংবা বিদেশে অসংখ্য ক্যারিয়ারমুখী সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কনফারেন্স ইত্যাদি হয়ে থাকে।যেখানে নিজের অংশগ্রহণ রাখা যায় কিংবা সেসব আয়োজনে ভূমিকা রাখা যায়।

লেখালেখি/ আর্টিকেল প্রকাশ

বিদেশে উচ্চশিক্ষা মানে গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া। এর কোনো বিকল্প নেই। আর গবেষণায় ভালো করার জন্য লেখালেখির কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো ভাষায় লেখালেখিটা চালিয়ে যেতে পারলে বাজিমাত করা যায়।বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পত্রপত্রিকা/সাময়িকী/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগে লেখালেখি করা যায়। কোনো প্লাটফর্ম না পেলে নিজের তৈরি ব্লগে লেখা যায়। সবচেয়ে ভালো হয় স্নাতকে থাকা অবস্থায় একক কিংবা যৌথভাবে দুয়েকটা গবেষণা আর্টিকেল প্রকাশ করা। এতে করে বৃত্তি পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।

চাকরির অভিজ্ঞতা

চাকরির অভিজ্ঞতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা আপনার আবেদন মঞ্জুর হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। যদিও বাংলাদেশে পড়ালেখা চলাকালীন চাকরি করা অনেক কঠিন। এখানে খণ্ডকালীন চাকরি আর নিয়মিত চাকরিতে একই রকম খাটনি ও সময় ব্যয়। তাই এই বিষয়টার চেয়ে অন্যান্য দিক কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবক হওয়া ইত্যাদি কাজ করা যায়। একটা বিষয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, সেটা হলো স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকা। যেসব শিক্ষার্থী বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকে তাদেরকে আলাদা দৃষ্টিতে দেখা হয়।  

বিদেশে পড়াশুনার জন্য বেশ কিছু বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। এরমধ্যে বেশ প্রসিদ্ধ ও উল্লেখযোগ্য কিছু বৃত্তি হল ফুলব্রাইট স্কলারশিপ (যুক্তরাষ্ট্র), ইরাসমাস মুন্ডাস (ইউরোপ), ডাড (জার্মানি), কমনওয়েলথ স্কলারশিপ (যুক্তরাজ্য), প্রাইম মিনিস্টার ফেলোশিপ (বাংলাদেশ), ইত্যাদি। ইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তিটি শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় পড়াশুনার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘোরার সুযোগ থাকে এটিতে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইট থেকেও বিভিন্ন বৃত্তির খোঁজ পাওয়া যায়, যা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই প্রদান করে থাকে।

এভাবে স্নাতকে পড়ার শুরু থেকে প্রস্তুতি শুরু করলে স্নাতক শেষ হতে হতেই একজন শিক্ষার্থী বিশ্বের যেকোনো দেশে বৃত্তি পাওয়া কেউ চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারবে না।  

Leave a Reply