বিদেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরা নারী ও শিশুর আশ্রয় কোথায়?
শিশুটিকে গর্ভধারীনি মা নিজেই বিমানবন্দরের ট্রলিতে ফেলে উধাও হয়ে গেছেন।

বিদেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরা নারী ও শিশুর আশ্রয় কোথায়?

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান……/এ বিশ্বকে এ শিশুর
বাসযোগ্য করে যাব আমি / নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’-

কবি এই চরণগুলো কি আজ নিভৃতে কাঁদছে! সমাজ কোথায গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শিশু আজ মায়ের কোল পায় না? পড়ে থাকে পথের ধারে কিংবা ট্রলিতে! আজ এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার কবির যে অঙ্গীকার, সে অঙ্গীকার কোথাও নেই। কথামালা গেঁথে অনেক কিছুই কাগজে লেখা হয়, কিন্তু সেখানেই যেন সীমাবদ্ধ সবকিছু।  অন্তরালে কত শিশু অনাথ হয়ে পড়ছে ,তার সঠিক হিসাব মেলানো দায়।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমনই এক শিশুর খোঁজ মিললো, যার মা থেকেও নেই। কারণ, শিশুটিকে গর্ভধারীনি মা নিজেই বিমানবন্দরের ট্রলিতে ফেলে উধাও হয়ে গেছেন। শুক্রবার সকালের ঘটনা। বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল বেল্টের পাশে ট্রলিতে শুয়ে ফিডারে দুধ খাচ্ছিলো একটি মানবশিশু। বয়স সবে ৮ মাস। বিমানন্দরে দায়িত্বরত আর্মড পুলিশের সদস্যরা গিয়ে দেখে, একটি শিশু অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন। কি  নিষ্পাপ মুখখানি।  সে জানে না এ পৃথিবীতে তার নিরাপদ আশ্রয় হারিয়ে গেছে।

 ট্রলিতে পড়ে থাকা শিশুকে ‍তুলে নেয় বিমানবন্দরে কর্মরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এর সদস্যরা। পুলিশের ভাষ্য মতে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে শিশুটিকে নিয়ে তার মা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। রাতভর শিশুকে নিয়ে অ্যারাইভাল বেল্টের পাশে ছিলেন। তিনি সারা রাত কাঁদছিলেন।সকালে আর পাওয়া যাচ্ছিলো না তাকে।  পরে শিশুটিকে উদ্ধার করেন তারা।

জানা যায়, ওই শিশুর মা প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সেখানে একজনকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের মধ্যে সংসার হয় ও বাচ্চা হয়। পরে স্বামী তাকে অস্বীকার করে। এই অবস্থায় নিরীহ মহিলা শিশুকে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

পুলিশ বিভিন্ন নথিপত্র ও ভিডিওর মাধ্যমে ওই নারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।মাকে খুঁজে পাওয়া গেলে শিশুকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অন্যথায়  প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় অথবা ব্রাকের সহযোগিতায় শিশুটিকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করা হবে।

এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্রাকের কর্মকর্তা শরিফুল হাসান ইমিগ্রেশন নিউজকে বলেন, বিমানবন্দর পুলিশের সহযোগিতায় শিশুটিকে সরকারি শিশু সদনে রাখা হয়েছে। শিশুর মাকে খোঁজ করা হচ্ছে। যদি পাওয়া না যায়, তাহলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে ।

শরিফুল হাসান বলছেন, এমন অমানবিক ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। একগুলো আকস্মিক কোনো বিষয় নয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব থেকে এক মা তার শিশুকে কোলে নিয়ে ফিরে আসেন। আমরা  তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু তাকে তারা নিতে রাজি না হওয়ায় গাজীপুরে শিশু সদনে  আশ্রয়ে রেখেছি আমরা।তারও আগের এমন নির্মম ঘটনা ছিলো। এক মা তার কোলের শিশুকে ফেলে চলে গিয়েছিলো। পরে অবশ্য তাকে খুঁজে পেয়েছি।  আসলে  নির্যাতনের শিকার হয়ে, কোনো কারণে অপ্রত্যাশিত সন্তান গ্রহণ করে তারা কোথায় যাবেন বুঝতে পারেন না। দেশে ফিরে লোকলজ্জার ভয়ে গ্রামেও ফিরতে পারেন না। বিভিন্ন জায়গায় কোনো মতে আশ্রয় নিয়ে থাকার চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, এরকম অনেক ঘটনা ঘটছে। গত ২ বছর অন্ততপক্ষে এমন ১০টি ঘটনা পেয়েছি আমরা। অসহায় হয়ে ফিরে আসা এমন শিশু ও তার মায়েদের জন্য সরকারিভাবে সহযোগিতার
কোনো ব্যবস্থাপনা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে শরিফুল হাসান বলেন,  আলাদা করে হয়তো কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে সরকার কিছু পরিকল্পনা নিচ্ছে। কিন্তু যারা শিশু নিয়ে আসেন, তারা কোথায় থাকবেন, কোথায় যাবেন ও তাদের কীভাবে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রাখা যায় এমন কোনো কিছু এখনও নেই।

‘বিদেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে সন্তান সহ ফেরা এসব মেয়েরা কোথায় যাবেন তার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সাথে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে আইনের আওতায় আনা জরুরি বলে আমি মনে করি। বের করা উচিত শিশুর পিতৃপরিচয়। এবিষয়ে এখনই ভাবার সময় হয়েছে। পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে’।

Leave a Reply