বিশ্বে আরও তিন বাংলাদেশ!
ভিনদেশিরা কেউ রেখেছে নিজেদের জেলার নাম বাংলাদেশ, কেউ সড়কের নাম আবার কোথাও বা গ্রামের নাম বাংলাদেশ।

বিশ্বে আরও তিন বাংলাদেশ!

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

বিশ্বে আরও তিন বাংলাদেশ! শুনে বিস্ময়কর লাগছে? লাগারই কথা। তবে এটাই সত্য। ভিনদেশিরা কেউ রেখেছে নিজেদের জেলার নাম বাংলাদেশ, কেউ সড়কের নাম আবার কোথাও বা গ্রামের নাম বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রক্ত দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ যেন সারা বিশ্বের বিস্ময়!

আর্মেনিয়ায় ‘বাংলাদেশ জেলা’

আর্মেনিয়ায় ‘বাংলাদেশ জেলা’

কারো তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। ২০১৭ সালের কথা। বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুইজন তরুণ দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে আন্তর্জাতিক মূকাভিনয় ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে যান। দেশটির বিমানবন্দরে নেমেই তারা জানতে পারেন, আর্মেনিয়ায় বাংলাদেশ নামের একটি জেলা রয়েছে।

‘বাংলাদেশ নামে আর্মেনিয়ার একটি জেলা আছে’ প্রথমবারের মতো এ কথা শোনার পর নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিলেন না তারা। ইয়েরেভান এয়ারপোর্টে অবতরণ করে ডলার এক্সচেঞ্জ করতে গেলে একজন আর্মেনিয়ানের সঙ্গে কথা হয়। বাংলাদেশ থেকে এসেছেন শুনেই তিনি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে যা বললেন তার অর্থ হচ্ছে, ‘ইয়েরেভানের একটি জেলার নাম বাংলাদেশ।’

মীর লোকমান ও সাইফুল্লাহ সাদেকের কৌতুহলি জিজ্ঞাসা, ইজ ইট ফান? আর ইউ শিওর? জবাব- নো নো, ইটস নট ফান। ইউ ক্যান ভিজিট দেয়ার। এরপর বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে তাদের রিসিভ করতে আসা বাগরাত ও আর্মেনি মুহতাসিয়ানর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন যে, বাংলাদেশ নামক জেলা আছে আর্মেনিয়ায়। পরদিন তারা সেখানে ঘুরতে যান। আসলেই রয়েছে বাংলাদেশ নামক জেলা। ভিন দেশে বাংলাদেশ! এটি যেন বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেলো।

আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানের জেলা এটি। রাজধানী থেকে পাহাড়তলীতে তার অবস্থান। তুলনামূলক নিচু অঞ্চল। যেতে যেতে দেখা মেলে রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ। কিছু সবুজ মাঠ। দেখা মেলে বড় পুকুর। আর্মেনিয়ার রাজধানী থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের দূরত্ব এর। দারুণ সাজানো সুন্দর এই বাংলাদেশ। আর্মেনীয়দের মুখে মুখে এই বাংলাদেশের নাম। কিন্তু সেখানকার বিলবোর্ডে এমন কোনো নাম লেখা নেই। মূলত অফিসিয়াল নাম মালাতিয়া-সাবাস্তিয়া। অথচ বাসযাত্রী, দোকানদার, সাধারণ মানুষ, পুলিশসহ যাকেই বলুন না কেন সবাই চেনেন বাংলাদেশ নামেই। সবার মুখে মুখে বাংলাদেশ। কিন্তু কী কারণে এই নামকরণ?

স্থানীয় এক নৃবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক লিলিথ মারজান মনে করেন, ওই এলাকাটি আর্মেনিয়ার রাজধানী থেকে তুলনামূলক নিচুতে, দরিদ্র এবং তুলনামূলক সবুজ। যা ভারতের পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের মতো। তাই এর নাম বাংলাদেশ।

আরেকটি ধারণা প্রচলিত যে, এই এলাকার নাম ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এছাড়া আর্মেনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করার প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান থেকেও এমন নামকরণ করা হতে পারে বলে ধারণা।

তবে মূলত ঐতিহাসিক বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ঢাকায় আর্মানিটোলার একটি ঐতিহাসিক ধারা এখানে ভূমিকা রেখেছে।অষ্টাদশ শতকে যারা ব্যবসা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কারণে আর্মেনিয়ায় গিয়েছিলেন তারা সম্ভবত আর্মেনিয়ায় এই নামকরণ করেন। যে কারণেই নামকরণ করা হোক না কেন, ভিন দেশের মাটিতে যে আরেকটি বাংলাদেশ নাম রয়েছে, এটাই আনন্দের- গর্বের।

‘কাশ্মীরে ‘বাংলাদেশ গ্রাম’

‘কাশ্মীরে ‘বাংলাদেশ গ্রাম

ভূস্বর্গ কাশ্মীর! আর এই কাশ্মীরেই আছে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি গ্রাম। শুনে অবাক হলেও এটি সত্য। গ্রামটির চারদিকে পানি। পেছনে সুউচ্চ পর্বত মিলিয়ে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য!

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, বিখ্যাত উলার হ্রদের তীরে গ্রামটি অবস্থিত। কাশ্মীরের বান্ডিপুরা জেলার আলুসা তহশিলে এ গ্রামের নাম বাংলাদেশ। বান্ডিপুরা-সোপুরের মাঝ দিয়ে মাটির রাস্তা ধরে ৫ কিলোমিটার হাঁটলেই পাওয়া যায় গ্রামটি।

১৯৭১ সালে জুরিমন নামে একটি গ্রামের ৫-৬টি ঘরে আগুন লাগে। গৃহহীন হয়ে পড়ে নিরীহ সাধারণ মানুষ। তখন পুড়ে যাওয়া জায়গা থেকে কিছুটা দূরে পার্শ্ববর্তী ফাঁকা জায়গায় সবাই মিলে ঘর তোলেন। সে বছর নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। একই সময় গৃহহীন মানুষগুলো দুঃসময় মোকাবেলা করতে শুরু করে। তাই তারা তাদের নতুন গ্রামের নাম রাখে ‘বাংলাদেশ’। ২০১০ সালে বান্ডিপুরার ডিসি অফিস ‘বাংলাদেশ’ নামক গ্রামটিকে আলাদা গ্রামের মর্যাদা দেয়। ৫-৬টি ঘর দিয়ে শুরু হওয়া গ্রামে এখন পঞ্চাশেরও বেশি ঘর রয়েছে।

বাংলাদেশ নামক সেই গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা হচ্ছে মাছ ধরা। পাশাপাশি পানি বাদাম সংগ্রহ করাও গ্রামবাসীর অন্যতম প্রধান কাজ।। বাংরাদেশ থেকে এই বাংলাদেশ গ্রামের দূরত্ব খুব বেশি নয়। ভারতের নিকটেই। যে কেউ চাইলে ঘুরে আসতে পারেন অবসরে। এক বাংলাদেশ থেকে গিয়ে আরেক বাংলাদেশের স্বাদ আস্বাদনের অনুভূতিটা গ্রহণ করাই যায়।

দক্ষিণ সুদানে‘ বাংলাদেশ সড়ক’

আফ্রিকার দক্ষিণ সুদানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বাংলাদেশ রোড’

সুদূর আফ্রিকার দক্ষিণ সুদানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বাংলাদেশ রোড’। অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে সড়কটির উদ্বোধন করা হয় সুদানে। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সম্মানে দক্ষিণ সুদানের এই সড়কের নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ রোড’ নামে। সড়কটি নির্মাণও করেছেন সেখানে দায়িত্বরত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী ব্যান-ইঞ্জিনিয়ার (কনস্ট্রাকশন)১৯। সড়কটি অনলাইন ডিজিটাল ম্যাপ ও UNMISS অফিশিয়াল ম্যাপেও সংযুক্ত করা হয়েছে।

জানা যায়, বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট-১৯ দেশটির ২৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মুন্দ্রি-মারিদি-ইয়াম্বিয় নামের প্রধান মহাসড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের দায়িত্ব পায়। কাজ চলাকালে মুন্দ্রি কাউন্টির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর তাবান জ্যাকসন ক্যাম্প কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং স্থানীয় কিছু গ্রামভিত্তিক অনুন্নত এলাকার সঙ্গে ‘মুন্দ্রি-মারিদি’ মূল সড়কের সংযোগ সড়ক নির্মাণের অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার কন্টিনজেন্ট-১৯ স্থানীয় জনসাধারণের সাহায্যার্থে ‘হাই তিরিরি’ নামের গ্রাম ও ‘মুন্দ্রি-মারিদি’ মূল সড়কের মাঝে একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে দেয়। এর ফলে হাই তিরিরির সঙ্গে মুন্দ্রি শহরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পরে এই সড়কটিরই নাম রাখা হয় ‘বাংলাদেশ রোড’।

Leave a Reply