বিশ্বে রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা ও রাষ্ট্রহীনতার কারণ কী?
বিশ্বে রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা ও রাষ্ট্রহীনতা

বিশ্বে রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা ও রাষ্ট্রহীনতার কারণ কী?

ইমিগ্রেশন নিউজ : একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বাড়ছে রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা। বাড়ছে অমানবিকতা ও বৈষম্য। বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশেই আছে দেশ বা রাষ্ট্রহীন মানুষ।
জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর-এর হাই কমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডি প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ট্রেন্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে দেশহীন মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি ৮০ লাখের অধিক হয়ে গেছে। গত সাত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০১৭ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখ বেশি। প্রতিদিন বিশ্বে ৩৭ হাজার মানুষ বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। আর এর ফলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার তুলনায় রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে।  এই তথ্য আরও বলা হচ্ছে, ২০১৮ সালে যে পরিমাণ মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়েছে তা ১৯৫১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত রাখা হিসাব মতে সর্বোচ্চ। জাতিসংঘের মতে বিভিন্ন কারণে বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যথা-

*যুদ্ধ, সংঘাত ও নিপীড়ন: এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক একটা বিষয় যে, বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সংঘাত ও নিপীড়নের ফলে ক্রমাগত বেড়েছে দেশহীন মানুষের হার।  ২০১৮ সালে এই শ্রেণির শরণার্থী সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৯ লাখ। এর মধ্যে ৫৫ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী।

*অর্থনৈতিক সংকট : অর্থনৈতিক মন্দায় উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন অনেকে। ফলে এরা পড়ে যান রাষ্ট্রহীনতায়। জাতিসংঘের হিসাবে ২০১৮ সালে এই সংখ্যাটি ৩৫ লাখ। যদি ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক সংকটের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার ফলে দেশত্যাগ করা প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে এই তালিকায় ধরা হয়নি। এই শ্রেণির শরণার্থী মূলত তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত জীবিকা প্রত্যাশী মানুষ।

*বৈষম্য :  ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ৪ কোটি ১৩ লাখ। এই শ্রেণির শরণার্থীরা নিজ রাষ্ট্রে থাকলেও সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় এদের নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা অনেক কম এবং আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় যে সব শিশু জন্ম নিচ্ছে এদের যথাযথ হিসাব রাষ্ট্রের কাছে না থাকায় শিশুরা অনিবন্ধিত থাকছে; ফলে রাষ্ট্র কর্তৃক শিশুদের জন্য যে অধিকারগুলো দেওয়া হয় তা থেকে এরা বঞ্চিত হচ্ছে।বিশ্বজুড়ে এসব শরণার্থীর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার ও সোমালিয়া এবং আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চল থেকে এসেছেন।

*জাতিগত বিদ্বেষ : জাতিগত বিদ্বেষ ও তার ফলে নিধনের সবচেয়ে দৃষ্টান্ত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জাতি। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে মিয়ানমারের জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে রাখাইন রাজ্য থেকে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা  রাষ্ট্রহীন হয়ে  বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশ্বের অন্যতম রাষ্ট্রহীন একটি জাতি রোহিঙ্গা। আবার তার চেয়েও বড় রাষ্ট্রহীন জাতি রয়েছে বিশ্বে। আফ্রিকায় ২০১৮ সালে ইথিওপিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ১৫ লাখের বেশি  রাষ্ট্রহীন হয়েছেন।

*জলবায়ু পরিবর্তন : বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনকেও রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। পরিবেশের বিপয, প্রাকৃতিক দুযোগ, ঘুর্ণিঝড় ইত্যাদির ফলেও বিশ্বব্যাপী মূলত রাষ্ট্রহী-পরিচয়হীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

*ঝুকিপূর্ণ অভিবাসন : বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসংখ্য অভিবাসী উন্নত জীবনের আশায় নিজ দেশ ছেড়ে যায় যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তারা হারিয়ে বসেন নিজেদের সম্মান, সঙ্গে যান-মাল। এমনকি রাষ্ট্রও হারিয়ে বসেন। পরিচয়হীন থেকে দেশ-থেকে দেশে ঘুরে বেড়ান।

২০১০ সাল থেকে ১০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে করা একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১শ কোটি মানুষ রাষ্ট্র পরিচয়হীন। বিশ্বব্যাংকের করা হিসাবের মধ্যে ইউএনএইচসিআর-এর উল্লিখিত ৭ কোটি ৮০ লাখ রাষ্ট্রহীন মানুষও বিদ্যমান।
রাষ্ট্রপরিচয়হীন মানুষ বৃদ্ধির ফলে তারা দেশে এবং অন্য দেশে আশ্রয় জীবনেও মানবিক ও বিভিন্ন সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশ্বব্যাংক ও ইউএনএইচসিআর বলছে, বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রপরিচয়হীন মানুষের সংখ্যা এভাবে বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। বাড়ছে অমানবিকতা ও সহিংসতা।

Leave a Reply