ভয় – ১
ভয় : সুশীল কুমার পোদ্দার

ভয় – ১

সুশীল কুমার পোদ্দার :
আমাদের শৈশবের দিনগুলো ছিল সাদাকালো ছবির মতো। আজকের জটিল জীবনের মতো সাদা কালোর মাঝে এতো বর্ণ ছিল না। আমরা সরল বিশ্বাসে সাদাকে সাদা ভাবতাম, কালোকে কালো। আমাদের সময় প্রকৃতিও ছিল সাধারণ। অপরাহ্ণের সূর্যটা একটু ম্রিয়মাণ হতেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসতো। আর সে অন্ধকারে ঘামটি মেরে বসে থাকতো কতশত ভয় – কোনটা পার্থিব, কোনটা অপার্থিব, কোনটা জুজু বুড়ির। রাস্তার ধারের লাইট পোস্টগুলোর অনুজ্জ্বল হলুদাভ আলো কিছুতেই সেই অন্ধকার দূর করতে পারত না। লাইট পোস্টের প্রলম্বিত ছায়া, এখানে সেখানে গাছ-গাছালী, ঝোপঝাড়ের বিচিত্র অবয়ব সে অন্ধকারকে আরও বেশী প্রগাঢ় করে তুলত। সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে ঘরের বাহির হতে গা অজানা আশংকায় ছমছম করে উঠতো। কারণে অকারণে কতো ভয় পেতাম আমরা!

আমাদের বাড়ীর গা ঘেঁসেই বিহারী পল্লী। সেই পল্লীর এক হালকা পাতলা লম্বাটে ছেলে নাঙ্কা। ছোট দাদার সাথে একসাথে খেলে বেড়াতো। একদিন দু’বন্ধু রেললাইন ধরে সন্ধ্যার প্রায়ান্ধকারে ঘরে ফিরে আসছে। হাট ফিরতি এক কৃষক এক বড়সড় বাঙ্গী নিয়ে ফিরছে ঘরে। ওদের খুব ইচ্ছে হোল বাঙ্গিটা খেতে। বাঙ্গীর দাম পাঁচআনা, কিন্তু ওদের পকেটে মবলোকে চার আনা। ওদের মনের কথা পড়ে হঠাৎ করে সেখানে আবির্ভাব হল শ্বেতশুভ্র পোশাকে শ্রশ্রুমন্ডিত এক দরবেশ। সে এক আনা পয়সা দিয়ে মিলিয়ে গেল। ওরা ভীষণ ভয় পেয়ে বাসায় ফিরল। নাঙ্কার নাজুক শরীর এ ভীতি সহ্য করতে পারল না। ও গভীর জ্বরে পড়লো; আর ফিরে আসতে পারলো না জ্বরের ঘোর থেকে। নাঙ্কার এ ভীতি সেই ছোটবেলায় আমার ভিতর সংক্রামিত হল। আমি সাদা পোষাকে শ্রশ্রুমন্ডিত কারোকে দেখলেই দ্বিতীয়বার তাকাতে ভয় পেতাম।

আরও ভয় পেতাম প্রতিধ্বনি শুনে, প্রতিবিম্ব দেখে। আমার মায়ের কাছে মাঝে মাঝে বাবার শৈশবের গল্প শুনতাম। গল্প শুনতাম কেমন করে মেছো পেত্নী কালো বিড়ালের রূপ ধরে প্রায়ান্ধকার রাতে হাত থেকে মাছ কেড়ে নিয়েছিল, কেমন করে বাবাকে কানা-কূহা ধরেছিল; বাবা সাড়া রাত একি রাস্তা ধরে ঘুরে ঘুরে রাত্রের শেষ প্রহরে বাড়ী খুঁজে পেয়েছিলেন। এমনি সব বিচিত্র গল্প শুনতে শুনতে অতীন্দ্রিয়, আধিভৌতিক, অন্ধবিশ্বাস; বিশেষ করে প্রেতাত্মাদের অস্তিত্ব বিহীন চেহারা একটা ভয়ঙ্কর অবয়ব নিয়ে আমার মনের মধ্যে জেগে থাকতো। কিন্তু কখনও কেউ সে ভয় ভাঙ্গানোর চেষ্টা করেনি, কেউ বলেনি এগুলো অন্ধবিশ্বাস, এগুলো যুগান্তরের লোকবিশ্বাস।

আস্তে আস্তে বড় হতে হতে জানতে শিখলাম, বুঝতে শিখলাম এ অন্ধবিশ্বাসকে। আব্রাহাম কভুর, প্রবীর ঘোষের বই পড়ে মনের ভ্রান্তি আস্তে আস্তে কাটতে লাগলো। একসময় ভাবলাম, আমি এই অন্ধবিশ্বাস কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। তাই কারণে অকারণে একে ওকে জ্ঞান বিতরণ করতে লাগলাম। মা বাড়ীর পেছনের দরজা খুলে একদিন চিৎকার করে ওঠেন। রাতের প্রায়ান্ধকারে আদালতের (শত্রুসম্পত্তি; স্বাধীনতা উত্তর অস্থায়ী আদালত) বদ্ধভুমির ভগ্ন দেয়ালের গা ঘেঁসে প্রেতাত্মাদের চলাফেরা অনেকের চোখেই পড়ে। আমি পরদিন যখন দেখিয়ে দিলেম আমাদের ঘরের স্বল্প আলোতে কলাগাছের প্রলম্বিত ছায়াই এর জন্য দায়ী, তখন নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস গেল বেড়ে। আমায় এক বদাভ্যাসে পেয়ে বসলো -যেখানেই দশটা মানুষের ভিড়, সেখানেই হুমড়ি খেয়ে পড়ি উপদেশ দেবার জন্য।

একদিন সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ীর সামনে বিরাট এক জটলা। টিউশন করে বাসায় ফিরছি। জটলা দেখে অসীম আগ্রহে এগিয়ে যাই। লোকজন বলাবলি করে ট্রাকে একটা রামছাগল কাটা পড়েছে। রামছাগলটা যে আমাদের তা বুঝতে পারিনি। ও আমাদের সূনু, আমার বোনের, আমাদের পরিবারের একজন নিকটতম সদস্য। ওর রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। তখনও আছে ধিকি ধিকি প্রাণ। ওর মাথাটা আমি কোলে তুলে নেই। ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। লোকজন ধরাধরি করে ওকে রিক্সায় উঠিয়ে দেয় হাসপাতালে নেবার জন্য। আমি খবরটা দিতে দৌড়ে বাসায় ফিরে যাই। আমার বোনটা বার বার জ্ঞান হারাচ্ছে। ওকে নিয়ে পরিবারের সবাই ব্যস্ত। ততোক্ষনে পথিমধ্যে সূনু শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। বাড়ীর বাহিরে ঘাসের মাঝে ও শুয়ে আছে। কিছু চর্মকার এসেছে টাকার বিনিময়ে ওর মৃতদেহ নিতে। কিন্তু চর্মকারদের ফিরিয়ে দিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সূনুকে সমাধিস্থ করা হবে আদালতের বদ্ধভুমিতে।

বোনটার জ্ঞান ফিরেছে। ও অবিরাম বিলাপ করে যাচ্ছে। ওকে অনেক সান্ত্বনা দিয়ে আমি আস্তে আস্তে আদালতে প্রবেশ করি। কাঠ মালতী গাছটা পার হতেই জমাট বাঁধা অন্ধকার। আমি আমার দাদাকে উচ্চস্বরে ডাক দেই। দাদার উত্তর ফিরে আসে, এইতো এখানে, এগিয়ে আয়। আমি অন্ধকারে পথ করে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসি বদ্ধভুমির সন্নিকটের সেই কাঁঠাল গাছটার নিচে। আবারো ডাক দেই – দাদা, দাদা, বলে… চারিদিকে সুমসাম নীরবতা। ঝিঝি পোকারা সমস্বরে ডেকে যাচ্ছে। কোথাও কেউ নেই। আমি মহাকর্ষের সমস্ত মায়ার বাধন ছেড়ে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছি। আমার মস্তিস্কের হিপোকাম্পাস আমায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সদ্য যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে। আমার চোখের সামনে কাঁঠাল গাছে ঝুলে আছে মানুষের কঙ্কাল। বৃষ্টির জলে ধসে যাওয়া বদ্ধভুমির মাটি ফুরে এখানে সেখানে মাথার খুলি, হাড়-হাড্ডি। চারিদিকে বীভৎস মৃত্যুর মর্মভেদী আর্তনাদ। আমি পালাতে চাই। আমি বাতাসে ভাসতে ভাসতে কখনও মাটিতে আছড়িয়ে পড়ি, কখনও এগাছ সেগাছের সাথে আঘাত খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে যাই। আমি বুঝতে পারি আমার মস্তিস্ক, আমার আমাগডিলা ট্রিগার চেপে দিয়েছে fight or flight এর। আব্রাহাম কভুর, প্রবীর ঘোষ কারোর নাম আর মনে পড়ে না। আমি হামাগুড়ি দিয়ে কাঠ মালতী গাছটার দিকে এগিয়ে চলি একটু আলোর প্রত্যাশায়…

Leave a Reply