ভালো নেই প্রবাসীরা!

ভালো নেই প্রবাসীরা!

আল আমিন নয়ন :

বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে ভালো নেই প্রবাসীরা। বিশেষ করে যারা শ্রমিক ভিসায় কিংবা ফ্রী ভিসায় বিদেশে অবস্থান করছে। অধিকাংশ প্রবাসী এখন কর্মহীন সময় কাটাচ্ছেন। অনেকেই তিন বা চার মাস ধরে বেতনও পাচ্ছেন না। লকডাউনের কারনে বাইরে বের হতে না পারায় অনেকে অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন।

এদিকে দীর্ঘদিন যাবত বেতন না থাকার কারনে অনেক প্রবাসীর পরিবার দেশেও অনাহারে অর্ধাহারে জীবন যাপন করছেন। স্বজনরা প্রবাসে থাকার কারনে সরকারি সাহায্য সহায়তা পাচ্ছে না প্রবাসীদের পরিবার। কুয়েত, কাতার, ওমান, সৌদি আরব, বাহরাইন, লেবানন, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, লিবিয়া, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থা অনেকটাই শোচনীয়। অনেকে হতাশা আর দুশ্চিন্তায় থেকে মৃত্যুরবণ করেছেন বলে জানা গেছে। করোনার প্রভাবও পড়েছে রেমিটেন্সের উপর। প্রবাস থেকে বেশ কয়েক লাখ প্রবাসীকে দেশে ফেরত পাঠানোর খবরে নানা উদ্বিগ্ন আর উৎকন্ঠার মধ্যে দিয়ে প্রবাসে জীবন যাপন করছেন আমাদের রেমিটেন্স যোদ্ধারা। সবার প্রশ্ন একটাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তো?

চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক প্রবাসীর অভিযোগ, দূতাবাসগুলোতে মোবাইল, ফোন, মেসেজ, ইমেইলে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাচ্ছে না। পাশাপাশি নেই কোনো রকম সাহায্যও। প্রবাসে থাকা এসব মানুষ বেকার সময়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অধিকাংশই পরিবার-পরিজন কীভাবে চলবে সে চিন্তায় উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ২ শত কোটি টাকা প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই প্রণোদনায় বিদেশ ফেরতরা সুবিধা পেলেও প্রবাসে থাকা বেকার শ্রমিকরা কোনো সুবিধা পাবে না বলে জানা গেছে। এই মহামারির কারনে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসী শ্রমিকরাই বেশি বিপাকে পড়েছেন। শ্রমিকরা জানান, সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে থাকা শ্রমিকরা ঘরে বসে বেকার সময় কাটাচ্ছেন। কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তারা যে বেতন পেতেন অনেকেই তা পাচ্ছেন না। পরিবারের জন্য দেশেও টাকাও পাঠাতে পারছেন না। এভাবেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছিলেন আঠারো বছরের রেমিটেন্স যোদ্ধা সৌদি আরব প্রবাসী শরিফ খান। তিনি বলেন, কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়েনি। করোনার কারনে গত তিন মাস যাবত কর্মহীন, পরিবারের কাছে কোন টাকা পাঠাতে পারেননি তিনি। তিনি বলেন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে তিনিসহ তার পরিবারকে। আরো বলেন, আমি এতো বছর ধরে বিদেশে থাকার কারনে আমার পরিবার কারো কাছে সাহায্য চাইতে পারছেনা কারন এতদিন আমরা মানুষকে সাহায্য সহায়তা করেছি আর এখন আমরা কি ভাবে হাত পাতবো।

বাহরাইন প্রবাসী সাইফুল ইসলাম চার বছর আগে গিয়েছিলেন বাহরাইনে। সেখানে একটি সাপ্লাই কোম্পানিতে কাজ করতেন। প্রতিমাসে চল্লিশ হাজার টাকা আয় করতেন তাদিয়ে সেখানে রুম ভাড়া আর খাবার বাদে দেশে বিশ হাজার টাকা পাঠাতেন পরিবারের খরচ বাবদ। তার ৮ সদস্যের পরিবারের তিনি একমাত্র উপার্জন ব্যক্তি। গত তিন মাস যাবত কোন কাজ নেই বেতনও নেই। পরিবারের পাড়াতে পারননি কোন খরচের টাকা। সাইফুল বলেন জানিনা কপালে কি আছে আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে। দেশ থেকে ঋন করে টাকা নিয়ে খাবার ও ঘরভাড়া পরিশোধ করেছি।

কাতার প্রবাসী আবুল খায়ের চার বছর ধরে ড্রাইভিং ভিসায় কাতার গিয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে গাড়ি চালানো যায়না নিজে কোনরকমে চলতে পারলে বিপাকে পড়েছে তার পরিবার, হিমসিম খেতে হচ্ছে তাকে, কবে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে আর কবে বাড়িতে টাকা পাঠাবে পারবে। মালয়েশিয়া প্রবাসী মোঃ রুবেল হোসেন ২০১৮ সন থেক কোম্পানির ভিসায় গিয়ে কাজ করেন পাম বাগানে। দীর্ঘদিন লকডাউনে থাকায় ছয়জনের পরিবার নিয়ে খুব চিন্তিত তিনি। কোম্পানি বেসিক দেয়ার কথা বললেও এখনও দিচ্ছে না আর বাড়িতেও টাকা দিতে পারছে না এশিয়ার ছোট্ট দেশ মালদ্বীপ। কিন্তু দেশটিতে অনেক বাংলাদেশি কাজ করে। করোনার কারণে তারা এখন চোখ-মুখে অন্ধকার দেখছে। বিশেষ করে দেশটিতে থাকা অবৈধ কর্মীরা।

নরসিংদী সদর উপজেলার জাহাঙ্গীর ভুইয়ান মালদ্বীপে পাড়ি জমিয়েছেন আড়াই বছর আগে। কোম্পানির চুক্তি অনুযায়ী রিসোর্ট পিকআপ ড্রাইভার হিসাবে কাজও করেন তিনি। করোনার আগে প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দেশে পাঠাতেন। কিন্তু মহামারি করোনার কারনে কোম্পানির কাজ বন্ধ। ক্যাম্পে বন্দী জীবন যাপন করছেন জাহাঙ্গীর। দুই মাস যাবত কোম্পানি বেতনের টাকা পরিশোধ করেনি। তাই দেশে টাকা পাঠাতে পারেননি তিনি। পরিবারের ছয় সদস্য জাহাঙ্গীরের বেতনের উপর নির্ভরশীল, বড়ই বিপদেই আছে জাহাঙ্গীর। আরেক জন কাওসার জানান, গত বছর এসেছি। কিছুদিন ধরে কোম্পানি বন্ধ। খাওয়ার টাকাও শেষ। কী করব বুঝতে পারছি না। ওমান প্রবাসী সুজন মিয়া বলেন, তিন মাস ধরে কাজ নেই, এখানে আবার লকডাউন চলে, কাজ বন্ধ, কোম্পানি কোন টাকা পয়সা দেয়না, খরচ করার মত কোন টাকা নেই কাছে নিজের কাছে আর পরিবার তো দূরের কথা। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষন ব্যুরোর তথ্য মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখের মতো কর্মী করোনাভাইরাসের প্রভাবে নানা সঙ্কটে রয়েছে।

অনেকের কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। তারা বেকার হওয়ায় অনেকেই খাদ্য ও অর্থ সঙ্কটে পড়েছে। প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান আপনারার সেদেশের সরকারের নির্দেশনা মেনে চলবেন আর আপনাদের মধ্যে কেউ অসুস্থতা অনুভব করে সেদেশে করোনা মনিটরিং সেলে বা স্বাস্থ্য বিভাগে যোগাযোগ করবেন।

যে কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে সেদেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে আর সেখানে সম্ভব না হলে প্রবাসীদের যে কোন তথ্য বা জিজ্ঞাসার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ওয়েজ আর্নার্স কল্যান বোর্ডের প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার +৮৮০১৭৮৪ ৩৩৩ ৩৩৩/ ০১৭৯৪ ৩৩৩ ৩৩৩ অথবা +৮৮ ০২ ৯৩৩ ৪৮৮৮ এই নাম্বারে সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘন্টা যোগাযোগ করতে পারন অথবা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম হটলাইন নাম্বার ০৮০০০১০২০৩০ এই নাম্বারেও যোগাযোগ করতে পারেন। নিরাপদ থাকবেন। আবার মানুষ ফিরবে তার কর্ম চাঞ্চল্য জীবনে। নিরাপদে থাকুন সুস্থ থাকুন এই শুভকামনা রইল।

আল আমিন নয়ন, অভিবাসী কর্মী।

Leave a Reply