ভিসা গ্যারান্টি প্রতারণা- যেসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে

ভিসা গ্যারান্টি প্রতারণা- যেসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে

ইউরোপের উন্নত দেশে চাকরি স্বপ্ন নিয়ে নৌপথে যাত্রা শুরু করেছিলো ফরিদপুরের শাহ আলম (ছদ্মনাম)। এর আগে ঘুরতে হয়েছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। কখনো বিমানে, কখনো নৌকা বা জাহাজে, কখনো বাসে বা অন্য কোনো বাহনে৷ কখনো পায়ে হাঁটিয়েও তাকে নিয়ে যাওয়া হয়৷ অতিক্রম করতে হয় পাহাড়, বন, সমুদ্র কিংবা মরুভূমি৷ পথ চলতে হয় যানবাহনে ঝুলে ঝুলে, যেতে হয় নৌকা বা জাহাজের খোলে লুকিয়ে। এতো দুর্গম পথ পাড়ি শেষে নৌকাযুগে ইটালির সীমান্তে পৌঁছান শাহ আলম ও তার সহযাত্রীরা। কিন্তু কপাল খুলেনি বরং উল্টো আটকে যায়।ঠাঁয় হয় আশ্রয় কেন্দ্রে।পরে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার সহযোগিতায় কোনো রকমে জীবন নিয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হয় দেশে।স্বপ্ন তো গেছেই। জমি-জমা বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে যে মোটা অংকের টাকা ব্যয় করেছিলেন, তাও গেছে জলে।

মাদারিপুরের কবির হোসেনও(ছদ্মনাম) শিকার প্রায় একই রকম চক্রের ষড়যন্ত্রে। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে দালাল ধরে মালয়েশিয়ার ভিসা করেন তিনি। মালযেশিয়ায় পৌঁছতেও সক্ষম হন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন কবির হোসেন জানতে পারেন, তাকে যে ভিসা দেওয়া হয়েছে সেটা সাত দিনের ভ্রমণ ভিসা। ফলে তিনি সাতদিন পর আটক হন মালয়েশিয়া পুলিশের হাতে। শিকার হন চরম নিযাতনের। পরে দীর্ঘ দুই/তিন মাস কারাভোগ করে ফিরে আসেন দেশে। এভাবে অর্থ-বিত্ত, সম্মান ও সময় সবই খোয়া যায় কবির হোসেনের।

এমন নির্মমতার গল্প শুধু শাহ আলম কিংবা কবির হোসেনের নয়। হাজার হাজার তরুণ এভাবে হারাচ্ছে স্বপ্ন, এমনকি জীবনও। দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে হাজারো সাধারণ মানুষ।একটু সচেতনতার অভাবে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদেরকে।

সাধারণত নিজ দেশ থেকে বিদেশে যেতে প্রয়োজন ভিসা। এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবেশের এটাই মাধ্যম। এটি একটি প্রবেশপত্র। বিভিন্ন ভিসা প্রচলিত থাকে। যেমন স্টুডেন্ট ভিসা, ভিজিট ভিসা, কনফারেন্স ভিসা, জব ভিসা, বিজনেস ভিসা, সাংবাদিক ভিসা, স্বাস্থ্য ভিসা ইত্যাদি।

তবে প্রতারক চক্রের দ্বারা ইউরোপ সহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করানোর ক্ষেত্রে নানা রকম ভিসা দেখা যায়, যেমন-টারজান ভিসা, ডলফিন ভিসা, ফ্রি ভিসা, বডি ভিসা প্রভৃতি। এধরনের ভিসাগুলো দালাল ও প্রতারকচক্র সংগ্রহ করে মানবপাচার করে থাকে, যার কবলে পড়ে সর্বস্ব হারায় বিদেশগামী মানুষ।

জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়সে ভেলের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৯০-এর দশকে বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডের জঙ্গল দিয়ে মানবপাচার করা হতো৷ ২০১৫ সালে সমুদ্রপথে ডলফিন ভিসার নামে পাচার করা হতো৷ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ফ্রি ভিসার নামে মানব পাচার হয়েছে৷ এখনো বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ওমান, ইরাক, গ্রিস, মেসিডোনিয়া, ক্রোয়েশিয়ার বন-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা হয়। ইউরোপের অনেক দেশে ট্রলিতে করে তুরস্ক থেকে ইউরোপে কিংবা মেক্সিকো থেকে আমেরিকার সীমান্তে পাচারের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনো ভিসা থাকে না৷ জাল ভিসা বা পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন দেশের ভিসা ব্যবহার করা হয়৷ যারা এর মধ্যদিয়ে ধুকতে ধুকতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন তাদেরও নানা কৌশলে ওইসব দেশে থাকতে হয় বা কাজ করতে হয়। এটা পুরোপুরি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন প্রক্রিয়া।

এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ গমন না করতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে সরকার, বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থারও। বিশেষজ্ঞরাও এক্ষেত্রে একই মত ব্যক্ত করেছেন। এরপরও প্রলোভনের শিকার হয়ে কিংবা দেশের আর্থিক দৈন্যদশা কিংবা পারিবারিক সংকটে পড়ে অনেকে দালালচক্রের হাতে ধরা পড়ে যায়। এমতাবস্থায়  ভিসা গ্যারান্টি অপকৌশল থেকে বিরত থাকতে কোন ধরনের পদক্ষেপ ও সচেতনতা অবলম্বন করা যেতে পারে?

নিজের কাজ নিজে করা

একজন বিদেশগামীর প্রথম কর্তব্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা কর্তৃপক্ষ ও তাদের ওয়েবসাইট সার্চ করা। সেখানে ভিসা আবেদন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও আবেদনের নিয়মাবলি উল্লেখ করা থাকে। প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকতে এবিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। নিজে ওয়েবসাইট সার্চ করতে না পারলেও নিকটাত্মীয় কাউকে দিয়ে কাজটি করানো যেতে পারে।

দালাল থেকে দূরে থাকা

প্রতারণা ও জালিয়াতি থেকে সুরক্ষিত থাকার প্রধান উপায় হলো-দালাল থেকে দূরে থাকা। কেননা, দালালরা উচ্চ অর্থের লোভে প্রায় সময় মিথ্যা-ভ্রান্ত তথ্য দেয় ও প্রতারণা করে।সাধারণত বাংলাদেশে অগণিত ভিসা কনসালিং ফার্ম আছে। এক্ষেত্রে কোন ফার্মটি নির্ভরযোগ্য সেটা খুঁজে বের করা একজন বিদেশগামীর মূল্যবান দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।  ভ্রাম্যমাণ কোনো অফিস বা ব্যক্তি অথবা ভার্চুয়াল কারো প্রলোভন বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা

সশরীরে কোনো প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানকার প্রধান কর্মকর্তার সাথে আলাপ করুন। সার্বিক দিক সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করুন। তাদের পূর্বকাজের ও সফলতার বিষয়ে তথ্য নিন।তাদের চুক্তিবদ্ধ ইমিগ্রেশন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবী আছে কিনা খবর নিন।

বিদেশগামীদের এই বিষয়ে মনে রাখতে হবে যে, নিজের ভিসা করার জন্য নিজেই যোগ্য ও যথেষ্ট। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রেখে কাজ এগিয়ে নিতে হবে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে রাখতে হবে যে, কোনো কনসাল্টিং ফার্ম বা ব্যক্তি ভিসা দিতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা সেন্টার কর্তৃক সে দেশের দূতাবাসই ভিসা দিতে পারে। কাজেই ভিসার জন্য দালাল নয়, কারো দ্বারা প্ররোচিতও হওয়া যাবে না। সচেতন থাকুন, সচেতনতার বিকল্প নেই।

মনে রাখবেন, আপনার ভিসার জন্য আপনিই যথেষ্ট। কোনো কনসাল্টিং ফার্ম বা ব্যক্তি ভিসার মালিক নন। শুধু অ্যাম্বাসিই ভিসা দিতে পারে। কারো প্রলোভনে নয়, নিজে একটু ভাবুন। পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন।

Leave a Reply