ভয়ঙ্কর সেই কালরাত্রি
একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাত্রি

ভয়ঙ্কর সেই কালরাত্রি

শাওন মাহমুদ :

একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাত্রি। বাংলাদেশে গণহত্যা সংগঠিত হওয়ার প্রথম দিন। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এই কালরাত্রি আমাদের স্বাধীনতা ইতিহাসের সব থেকে ভয়াবহ ও বর্বর কালিমাময় সূচনার মুহূর্ত। ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর থেকেই নতুন করে সংকট শুরু হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা হিসেবে দাবি করেন। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান।

নির্বাচনের আগে শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রচারে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ‘সোনার বাংলা’ স্লোগানটি পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই স্লোগানের ভিত্তি ছিল ছয় দফা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সেই হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে যায় বাঙালির ঘরে ঘরে। স্বাধীন ভূখ-ের স্বপ্ন মনের গহিনে আঁকতে থাকে সাধারণ জনগণ- ১৯৪৮ সাল থেকে যে স্বপ্ন রোপিত হয়ে আসছিল ক্রমেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

নির্বাচনের সময় পুরো পূর্ব পাকিস্তানকে একটি প্রদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানকে চারটি প্রদেশে ভাগ করা হয়। ভুট্টো প্রশ্ন তোলেন- একটি প্রদেশে জয়ী হয়ে কীভাবে পুরো পাকিস্তানের শাসনভার শেখ মুজিবের হাতে তুলে দেওয়া যায়? ভুট্টোর এই অবস্থানের কারণে শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। শেখ মুজিবকে সরকার গঠনে আহ্বান করার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।

২ মার্চ থেকেই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় এবং নির্দিষ্ট স্থগিতকরণের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ৭ মার্চ ১৯৭১-এ একটি গণসমাবেশের আয়োজন করে। এখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। মাত্র ১৮ মিনিটের এক ভাষণ ছিল। বঙ্গবন্ধু তার সংক্ষিপ্ত তেজদীপ্ত ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতি ও বাঙালিদের বঞ্চনা ইতিহাসের ব্যাখ্যা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালিদের বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্বের উপস্থাপন, অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব ধরনের সমস্যার সমাধানে তার সর্বাত্মক চেষ্টা, সারাবাংলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ, প্রতিরোধ সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত, শত্রুর মোকাবিলায় গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন, যে কোনো উসকানির মুখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার পরামর্শদান ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেন। ভাষণের শেষে ঘোষণা করেন- ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।… এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

সমাবেশ ওই ভাষণের কারণে এতই সফল হয়েছিল যে, পাকিস্তান সরকার সেনাছাউনি ও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার‌্যাবলি সীমিত করে দিতে বাধ্য হয়। ক্রমেই সাধারণ জনগণ ও সেনাবাহিনী এবং বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যকার সংঘর্ষ প্রতিদিনকার সাধারণ ব্যাপার হয়ে ওঠে। এর পরিণতিতে ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার যুদ্ধ।

পাকিস্তানি পরিকল্পনাকারীদের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সশস্ত্র বাহিনীর যারা সামরিক শাসনকালে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জুগিয়েছে, তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। অপারেশনের সর্বোচ্চ সার্থকতার জন্য ধূর্ততা, চমকে দেওয়া, প্রবঞ্চনা, দ্রুতগতি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর জোড় দেওয়া হয়। নির্বাধ ও সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। সাধারণ জনবসতি ও হিন্দু এলাকাগুলোয় অনুসন্ধান এবং আক্রমণের কর্তৃত্বও প্রদান করা হয়। অপারেশন সার্চলাইটের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান, মূল আক্রমণ পরিকল্পনা করেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মেজর জেলারেল খাদিম হুসাইন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।

ঢাকা শহরে গণহত্যার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে। পরিকল্পনায় পূর্বনির্ধারিত আক্রমণাত্মক অপারেশন পরিচালনার জন্য চিহ্নিত স্থানগুলো ছিল ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেট। এসব স্থানে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদের সমাবেশ বেশি ছিল আগে থেকেই। ২৫ মার্চ রাত থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শুধু ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার বাঙালিকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। ২৬ মে পর্যন্ত পুরো দেশে এই পরিকল্পিত গণহত্যা সংগঠিত হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১১টায় পাকিস্তানের সেনারা সেনানিবাসে অতর্কিতভাবে বাঙালি সেনাসদস্যদের ওপর হামলা চালায়। তারা পিলখানায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক, খিলগাঁওয়ের আনসার সদর দপ্তরেও সশস্ত্র হামলা চালায়। তাদের হাতে বন্দি হয় ৮০০ ইপিআর অফিসার ও জওয়ান। তাদের অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বল্পসংখ্যক ইপিআর সদস্য রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যান এবং পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংক দিয়ে ঢাকা শহর ঘিরে রাখে। আন্দোলনরত জনতাকে প্রতিরোধের জন্য তারা রাস্তায় রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলে ও মেশিনগানের গুলিতে বাড়িঘর বিধ্বস্ত করে। তারা মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বাসভবন ও ছাত্রদের আবাসিক হলগুলোয় হামলা চালায়। এতে কয়েকশ ছাত্র এবং অনেক শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিহত হন। অনেক ঘরবাড়ি ও পত্রিকা অফিসে আগুন ধরিয়ে এবং মর্টার হামলা চালিয়ে বিধ্বস্ত করা হয়। অগ্নিসংযোগ করা হয় হিন্দু অধ্যুষিত শাঁখারীপট্টি ও তাঁতীবাজারের অসংখ্য ঘরবাড়িতে। ঢাকার অলিগলিতে বহু বাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঢাকায় তৈরি হতে থাকে একের পর এক বধ্যভূমি। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় সেই সময়ে। এই পরিকল্পিত গ্রেপ্তার করার কোড নেম ছিল ‘অপারেশন বিগবার্ড’।

হত্যাকা- শুরুর প্রথম তিন দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া ও অন্যান্য শহরে ৫০ হাজারেরও বেশি নরনারী এবং শিশু প্রাণ হারায়। ঢাকার প্রায় ১০ লাখ ভয়ার্ত মানুষ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয়। অপারেশন সার্চলাইট নামে অভিহিত গণহত্যার এই প্রথম পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের অবস্থান সংহত ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। পরবর্তী সময়ে তারা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর দেশব্যাপী সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধারা দখলদার বাহিনীর ওপর পাল্টা হামলা শুরু করে। এর প্রতিশোধ নিতে হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য আকাশপথে বিমান, নৌপথে নৌযান নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহরে হামলা চালায়। তারা শত শত গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়, হত্যা করে নিরপরাধ গ্রামবাসীকে, ধর্ষণ করে যুবতী-কিশোরীদের, লুণ্ঠন করে মূল্যবান সম্পদ। ভীতসন্ত্রস্ত ও অসহায় মানুষ আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী দেশ ভারতে।

অপারেশন সার্চলাইট শেষ হওয়ার পর চলতে থাকে অপরিকল্পিত গণহত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, হিন্দুদের ভিটা থেকে উচ্ছেদ ও ধর্মান্তরিত করার প্রক্রিয়া। সব মিলিয়ে এটিকে জেনোসাইড বলা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে রাজাকার, আলবদর, আলসামস সমানতালে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার শুরু করে। এই আক্রমণ চলে ডিসেম্বরের ১৭-১৮ তারিখ পর্যন্ত। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়। এর সঙ্গে যোগ হন দুই লাখের অধিক বীরাঙ্গনা ও প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু শরণার্থী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে নৃশংস হত্যাকা-, ধর্ষণ, লুট, উচ্ছেদ সংগঠিত হয়েছিল- তা পৃথিবীর সব যুদ্ধকালীন জেনোসাইড তালিকায় পঞ্চম স্থানে অবস্থিত। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীলগ্নেও এই জঘন্য নির্মম জেনেসাইডের জন্য পাকিস্তান আজ পর্যন্ত ক্ষমা চায়নি।

শাওন মাহমুদ : কলাম লেখক ও নগরচাষী

Leave a Reply