মরিলে কান্দিস না আমার দায়…
মরমিকবি গিয়াসউদ্দিন আহমদ (১৪ আগস্ট ১৯৩৫-১৬ এপ্রিল ২০০৫)।

মরিলে কান্দিস না আমার দায়…

সুমনকুমার দাশ :

বহুলশ্রুত ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানের কথা মাথায় রেখেই বলতে চাই, এর চেয়েও প্রাণসঞ্চারী ও মনোউদ্দীপক গান রচনা করেছেন গিয়াসউদ্দিন আহমদ (১৯৩৫-২০০৫)। সুর কিংবা গায়ন-ভঙির কারণেই হয়ত গানটির আবেদন এ-ধারারই ‘শেষ বিয়ার সানাই বাজিল’, ‘কর্ণে শুনাইও বন্ধুর নাম গো’ কিংবা ‘সাদা কাপড় দিয়া পুটুলা বান্দিয়া’-সহ আরও গোটা কয়েক গানকে ছাপিয়ে গেছে। লেখার শুরুতে উল্লিখিত গানটির শেকড়-বাকড় এতটাই ডালপালা বিস্মৃত করেছে যে, বাংলাভাষী মানেই এ গানের সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। অন্যদিকে, সমপর্যায়ভুক্ত হলেও বাদবাকি গানগুলো ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানের নিচে চাপা পড়ে অনেকটাই চিঁড়েচ্যাপটে, আরেকটু স্পষ্ট করে বলা ভালো গানগুলো এতটা প্রচলিত হতে পারেনি! অথচ সমকক্ষতার বিচারে, প্রতিটি গানই বিশিষ্টতার দাবি রাখে। একই রকম ধরে ধরে আরও গোটা বিশেক প্রচলিত ও বহুশ্রুত গানকে অপ্রচলিত ও তুলনামূলকভাবে কম শ্রুত গানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যাবে, যেখানে যুক্তিতর্ক দিয়েই প্রমাণ করে দেওয়া সম্ভব এসব গানও একই উচ্চতায় আসীন হওয়ার দাবি রাখে।
এতটুকু বাতচিতের পর এ-আর বলার নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই যে, গিয়াসউদ্দিন আহমদের কিছু গানের ব্যাপক প্রচলন হলেও সার্বিক-অর্থে তাঁর সমগ্র সৃষ্টি এখনও সমভাবে প্রচার পায়নি, এটি এক অত্যাশ্চর্য ঘটনাই বটে! অথচ হওয়া উচিত ছিল এর উলটো।

দুই
সুনামগঞ্জে জন্ম গিয়াসউদ্দিন আহমদের। একই মাটির সন্তান মরমিসাধক হাসন রাজা, বৈষ্ণব সহজিয়া ভাবুক রাধারমণ, বাউল-গীতিকার শাহ আবদুল করিম ও দুর্বিন শাহ প্রমুখ প্রথিতযশা গীতিকারের সার্থক উত্তরসূরি তিনি। তাঁর ছাতক উপজেলার শিবনগর গ্রামের পাশ দিয়ে বহে যাওয়া ভটের খাল নদীর অপর পাশে যে কৃষ্ণনগর গ্রাম রয়েছে, সেখানেই রয়েছে কিংবদন্তিতুল্য সাধক-ফকির আফজল শাহের কবর, আস্তানা। তাই নাগরীলিপিতে (বাংলা ভাষার বিকল্প বর্ণমালা) রচিত আফজল শাহের ‘নূর পরিচয়’ শুনতে-শুনতে বেড়ে ওঠা গিয়াসউদ্দিনের। সুনামগঞ্জের মরমিয়া-ফকির-বাউল-বৈষ্ণব মতানুসারীদের চর্চিত গানের আবহে শৈশব-কৈশোর-যৌবনের বাড়বাড়ন্ত দিনগুলো অতিবাহিত হয়েছে তাঁর। তাই গিয়াসউদ্দিন আহমদ যে পরবর্তী সময়ে একজন সুপরিচিত গীতিকার হিসেবে পরিচিতি পাবেন, সেটার বীজ মূলত সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান আর আলো-বাতাসেই রোপিত ছিল।
ষাটের দশকের গোড়ায় গিয়াসউদ্দিন আহমদের বয়স যখন পঁচিশ, তখন মালজোড়া গানের শৌখিন শিল্পী হিসেবে তাঁর সংগীত-জীবনে প্রবেশ। এর কিছুকাল পর, আরও অন্তত বছর তেরো অতিবাহিত হলে তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটবে সুরকার বিদিতলাল দাস (১৯৩৮-২০১২) ও তাঁর সঙ্গী রাসবিহারী চক্রবর্তী, রামকানাই দাশ (১৯৩৫-২০১৪), আকরামুল ইসলাম, এ কে আনাম (১৯৪০-২০০৮), হিমাংশু গোস্বামী, হিমাংশু বিশ^াস, সুবীর নন্দী (১৯৫৩-২০১৯), দুলাল ভৌমিক, জামালউদ্দিন হাসান বান্না, ফজল মাহমুদ, রাখাল চক্রবর্তী, সুরজিৎ দে মিলন, সাহাবুদ্দীন আহমদদের। মূলত বিদিতলাল দাস ও তাঁর সঙ্গীদের প্রভাব গিয়াসউদ্দিনের সংগীতজীবনে দারুণভাবে রেখাপাত ঘটাবে এবং তিনি মধ্য সত্তরের দশক থেকে হয়ে উঠবেন বাংলা লোকগানের অমর স্রষ্টাদের একজন। এমনকী জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) ইচ্ছাপোষণ করবেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁর শবদেহের পাশে বসে কেউ গভীর আবেগে গাইতে থাকেন গিয়াসউদ্দিনের লেখা ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানটি।
হলোও ঠিক তাই। দেখা গেল, মধ্য সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে গিয়াসউদ্দিনের সৃষ্টি সিলেটের লোকগানকে আচ্ছাদিত করে ফেলল। বিদিতলাল দাস ও তাঁর সঙ্গীদের সুবাদে রেডিও-টিভি-মঞ্চ দখল করে নিলো গিয়াসউদ্দিনের গান। হুমায়ূন আহমেদও তাঁর ‘চলে যায় বসন্তের দিন’ বইয়ের উৎসর্গলিপিতে ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’ গানটি নিয়ে ব্যক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশের পাশাপাশি মৃত্যুর পর এ গানটিই যেন তাঁর শবদেহের পাশে বসে কেউ গভীর আবেগে পরিবেশন করেন, সে আকুতিই তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের কাছে জানিয়েছেন।
গিয়াসউদ্দিন আহমদ মৃত্যুর আগে তাঁর ২৫ থেকে ৩০টি গানের তুমুল জনপ্রিয়তা দেখে গেছেন। কিন্তু এটা হয়ত তাঁর কল্পনাতেও ছিল না, তাঁর চলে যাওয়ার দেড় দশক পরেও জনপ্রিয়তার বিচারে তাঁর গানের সংখ্যা ঠায় দাঁড়িয়েই থাকবে! অথচ ‘গীতিসমগ্র’তে অন্তর্ভুক্ত তাঁর ৭৬৬টি গানের অধিকাংশই সংগীত-বিচারে অত্যন্ত উঁচুমানের এবং স্বাভাবিকভাবেই সেসব উচ্চসমাদর পাওয়ার দাবিদার। পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের (১৯০৩-১৯৭৬) গিয়াসগীতিতে মুগ্ধতা প্রকাশ কিংবা শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯), দুর্বিন শাহ (১৯২১-১৯৭৭), রামকানাই দাশ, সুষমা দাশ, বিদিতলাল দাস, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, দিলরুবা খান, শেফালী ঘোষ, সুবীর নন্দীদের দ্বারা গীত হওয়ার পরও কেন তাঁর অপরাপর গান জনপ্রিয়তা পেলো না? এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসলে উপর্যুক্ত শিল্পীরা ঘুরেফিরে কয়েকটি গানই বার বার গেয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরাও এসব গানই কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয়তার বিচারে ২৫ থেকে ৩০টি গানেই বৃত্তবন্দি থেকে গেছে গিয়াসউদ্দিনের রচনা। অপর গানগুলোর প্রচার-প্রসারে শিল্পীরা এগিয়ে এলে হয়ত এ খেদটুকু আর প্রকাশ করতে হতো না।

তিন
লোকগানের শিল্পী হিমাংশু গোস্বামী সংগ্রহ করেছিলেন ‘সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী’ গানের সুরসহ স্থায়ী অংশটুকু। এর অন্তরা অংশের সন্ধান বহু চেষ্টা করেও তিনি মেলাতে পারেননি। এখন এ গানটির তিন অন্তরার যে পুনঃলিখিত রূপ আমরা শিল্পীদের কণ্ঠে শুনি, এর প্রথম অন্তরাটি (‘লাউয়ে এত মধু করল জাদু/ লাউ করলাম সঙ্গের সঙ্গী’) গিয়াসউদ্দিন আহমদের রচনা। এ গান বাংলা লোকগানের অতীতের সব গানের জনপ্রিয়তাকে চুরমার করে দিয়ে নতুনভাবে গদিনসীন হয়। প্রায় একই ধারাবাহিকতায় গিয়াসউদ্দিনের লেখা ‘ছিলট পরথম আজানধ্বনি বাবায় দিয়াছে’, ‘প্রাণ কান্দে মন কান্দে রে, কান্দে আমার হিয়া’, ‘প্রেমের মরা জলে ডুবে না’, ‘বসন্ত আসিল গাছে ফুল ফুটিল’, ‘হুরু ঠাকুর আমারে লইয়া সিলট যাইবায়নি’-সহ গোটা পঞ্চাশেক গান স্বাধীনতা পরবর্তী এক দশকের মধ্যেই পাকাপোক্ত আসন গেঁড়ে নেয় লোকগানের অনুরাগীদের মধ্যে। এসব গানের বাইরেও তাঁর রচিত বহুসংখ্যক গান এক-দুইবার শিল্পীরা রেডিও-টিভি-মঞ্চে গাইলেও ধারাবাহিকতা না-থাকায় সেসব প্রচলিত প্রবহমান গানের তালিকার বাইরেই রয়ে যায়। ফলে, গিয়াসউদ্দিনের গানের বহুমাত্রিকতা ও জীবনমুখিতার অন্তঃস্রোত শ্রোতার কাছে অচেনা ভাষ্যের মতোই পড়ে আছে।

চার
গিয়াসউদ্দিন আহমদের সাংগীতিক চিন্তাভাবনা মূলত তাঁর পূর্বসূরি সাধক-মহাজনদের দার্শনিক পরিসরের পরিবর্ধিত-রূপই। রহস্যময় মানবজন্ম কিংবা মানবযন্ত্রণা যেমন তিনি গানে ধরতে চেয়েছেন, তেমনই তাঁর গানে সঞ্চারিত হয়েছে নিরন্তর নিজেকে জানার প্রচেষ্টা। তাঁর গানে শব্দ-উপমারা খেলা করে, উড়ে সৃষ্টি আর নিগূঢ়তত্ত্বের মায়াবী রহস্যও। তবে প্রথাগত-অর্থে প্রচলিত বিন্যাসে তাঁর গানগুলোকে বেশ কয়েকটি পর্যায়ে বিভাজন করা যেতে পারে। যেমন আল্লাহতত্ত্ব, রাসুলতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, মানুষতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব, সংসার ও সমাজতত্ত্ব, ধামাইল, ভাটিয়ালি, বারোমাসি, সারি, মুর্শিদি, কীর্তন, বিয়ের গীত, দেশাত্মবোধক, আঞ্চলিক প্রভৃতি। নিগূঢ়তত্ত্বের গানের পাশাপাশি তাঁর বিচ্ছেদ আর আঞ্চলিক পর্যায়ের কিছু গান উত্থিত হয়েছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে, পেয়েছে অমর-অক্ষয় জনপ্রিয়তা।
একটা সময় ছিল, সত্তরের মাঝামাঝি থেকে নব্বই পর্যন্ত, গিয়াসউদ্দিন আহমদ আর সিলেটের দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দির ছিদ্দিকুর রহমান (১৯২৬-২০০৫)-এর রচিত আঞ্চলিক গানই দখল করে রেখেছিল সিলেট বেতার। পরে, ধীরে ধীরে সিদ্দিকুর রহমানের গান রেডিওতে শিল্পীদের কণ্ঠে প্রায়-সরে যায়। তবে গিয়াসউদ্দিনের লেখা সিলেটের আঞ্চলিক গানের প্রাবল্য ঠিকই স্থিতিশীল থাকে, কেবল মাঝেমধ্যে শাহ আবদুল করিম, ছিদ্দিকুর রহমান ও এ কে আনামদের লেখা আঞ্চলিক গান অমাবস্যার চাঁদের মতোই আবির্ভূত হয় (বাজতে শোনা যায়)। ফলে, এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষলগ্নে গিয়াসউদ্দিনের সিলেটি আঞ্চলিক গান পিদিম যে জ¦ালিয়ে রেখেছে, এ-ও-বা কম কিসে?

পাঁচ
গিয়াসউদ্দিন-পুত্র মু. আনোয়ার হোসেন রনির জবানে এরই মধ্যে প্রকাশিত তথ্য, বাদ্যযন্ত্র ব্যাঞ্জো বাজিয়ে তাঁর আব্বা প্রায়ই সকালে নতুন গানে সুরারোপ করতেন।
মধ্য সত্তরের ঘটনার স্মৃতিচারণরত রনির জন্মেরও ছয় বছর আগে আরেকটু ফ্ল্যাশব্যাকে গেলে, ষাটের দশকের গোড়ায় সগ্রামবাসী সাধক আছদ উল্লাহর (যিনি কি না আফজল শাহের শিষ্য) কাছে গিয়াসউদ্দিনের সংগীত-শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি একতারা বাদন শেখারও ইতিহাস জানা যায়। ব্যাঞ্জোর পাশাপাশি একতারা বাজিয়েও গিয়াসউদ্দিনকে আগের রাতে লেখা গান পরদিন সকালে সুরারোপ করতে দেখা যেত। স্বাধীনতার পর পর সেই সুরারোপের ভার বিদিতলাল দাস তাঁর চওড়া কাঁধে বহনের দায়িত্ব নেন। বিদিতলালের করা সেই সুর সিলেট অতিক্রম করে দেশ ছাড়িয়েছে, বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষীরা কণ্ঠেও নিয়েছেন, তবে এর পরও রয়ে গেছে আক্ষেপ। এটা এমনÑগিয়াসউদ্দিন লিখছেন আর বিদিতলাল সুর করছেন। পাল্লা দিয়ে চলমান লেখা-সুরের এ খেলায় শেষ পর্যন্ত গিয়াসউদ্দিনের রচিত গানসংখ্যা কমবেশি আট শ-তে গিয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু বিদিতলাল প্রায় শতাধিক গানে সুর করে যেতে পারলেও বাদবাকি গান সুরহীন হয়ে কেবল গিয়াসউদ্দিনের ‘গীতিসমগ্র’-তে ‘টেক্সট’ হিসেবেই রয়ে গেছে। বিদিতলালের সঙ্গীদের একজন হিমাংশু বিশ^াস আর সংগীতজ্ঞ আলী আকবর খানসহ বেশ কয়েকজন শিল্পী অবশ্য গিয়াসউদ্দিনের কয়েকটি গান সুরারোপ করেছেন, যদিও তা গিয়াসউদ্দিনের সমগ্র সৃষ্টির তুলনায় একেবারেই অকিঞ্চিৎকর! এখন দেখার বিষয়, ঠিক কত বছর পর কে এসে আত্মমগ্ন হয়ে সুর বসাবেন গিয়াসউদ্দিন আহমদের বাদবাকি রচনায়?

লেখক : লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply