মহামারীর মাঝে মৃত্যুঝুঁকি পূর্ণ রুটে ইউরোপমুখী অভিবাসীদের যাত্রা বেড়েছে

মহামারীর মাঝে মৃত্যুঝুঁকি পূর্ণ রুটে ইউরোপমুখী অভিবাসীদের যাত্রা বেড়েছে

জীবন বাঁচানোর তাগিদে বা উন্নত জীবনের আশায় মানব সভ্যতার প্রাচীন কাল থেকেই এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষের অভিযাত্রা চলমান, তবে প্রাচীনকালে যেমন খাদ্যের অন্বেষণে নতুন অঞ্চলে পাড়ি জমাত এই যাত্রা ধীরে ধীরে পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়ে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন স্বার্থসিদ্ধি এবং ভ্রমণে রূপান্তরিত হয়েছে। সেসকল ইতিহাস আমরা সকলেই জানি তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অভিবাসীদের যাত্রা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নতি বা উন্নত জীবন যাপানের জন্যই হয়ে থাকে মূলত। 

তেমনি ইউরোপ অভিবাসীদের জন্য বিশ্বের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় আশ্রয়স্থল  এরই প্রেক্ষাপটে ইউরোপ অভিমুখে অভিবাসীদের যাত্রা ধারাবাহিকভাবে চলমান রয়েছে, মহামারী পৃথিবীকে থামিয়ে দিয়েছে, বস্তুত পুরো পৃথিবী এখন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মাঝে আছে, তবে গত ২০১৯ সালের ইউরোপ অভিমুখে অবৈধভাবে ইউরোপের সীমানা অতিক্রম করে অনুপ্রবেশের সংখ্যা ১,৪১,৮৪৬ হলেও বর্তমান ২০২০ সালের প্রথম ১১ মাসে সংখ্যাটা ১,১৬,৮৪০ জন। মোট সংখ্যাটা একটু কম দেখালেও ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের হিসাবটা এখনো বাকি।

মোট চারটি রুটে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ ঘটে উক্ত চারটি রুট হচ্ছে :  পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল,মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল,  স্থলপথে পশ্চিম বলকান অঞ্চল। 

তবে এই চারটি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হচ্ছে, সমুদ্রপথে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবংস্থলপথে পশ্চিম বলকান অঞ্চল। লিবিয়া এবং তিউনিসিয়া উপকূল হয়ে  সমুদ্রপথে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল  বসনিয়া হয়ে ক্রোয়েশিয়া সীমান্ত অতিক্রম রুট হচ্ছে স্থলপথে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পশ্চিম বলকান অঞ্চল।

অথচ মহামারীর মাঝে এই দুটি মৃত্যু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল দিয়ে অভিবাসীদের যাত্রা বিপুল সংখ্যক হারে বেড়েছে গত ২০১৯ সালের তুলনায় যেমন গত বছর নভেম্বরে এর তুলনায় এবছর ১৫৫ শতাংশ বেড়েছে একই চিত্র পশ্চিম বলকান অঞ্চলে  ১০৫% বেশি। অক্টোবর মাসের দিকে তাকালে যথাক্রমে ১৩৭ এবং ১২২ শতাংশ, সেপ্টেম্বর মাসে উভয় অঞ্চলে ১০০% এর বেশি।

বর্তমান ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর সমুদ্রপথে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে এ পর্যন্ত  ৩৪ হাজার ১৮৭ জন এবং পশ্চিম বলকান অঞ্চল দিয়ে ২৪ হাজার ২৫৯ জন  সীমানা অতিক্রম করেছেন। তবে গত বছর ২০১৯ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে সর্বমোট ১৪ হাজার ০০৩ জন এবং পশ্চিম বলকান অঞ্চল দিয়ে সর্বমোট ১৫ হাজার ১৫২ জন। 

সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে এই দুইটি রুটে আমাদের বাংলাদেশীদের যাত্রা সবচেয়ে বেশি, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে গত ২৪ শে ডিসেম্বর এই রুটে নৌকা যোগে ইউরোপে পাড়ি জমানো কালে নৌকাডুবে গেলে ২০ জনের পানিতে ডুবে মারা  যায় এবং তাদের মধ্যে ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এর মাঝেও কোন বাংলাদেশী থাকতে পারে। যদি লাশ উদ্ধার করা যায় হয়তো বা কিছুটা শনাক্ত করা সম্ভব হয় অনেক ক্ষেত্রেই অচেনা হিসেবে দাফন করা হয়, তবে লাশ না পাওয়া গেলে কোনোভাবেই তা খবর আসে না। আর বসনিয়া সীমান্তের খবর তো আমরা সবাই জানি গহীন জঙ্গলে মানবেতর জীবন,  অবশেষে বর্তমান ঋনাতক তাপমাত্রায় দুঃসহ যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে সীমানা অতিক্রম করার জন্য অপেক্ষা।

যুদ্ধ-বিগ্রহ চলাকালীন দেশের অভিবাসীদের জন্য পরিস্থিতিতে দেয়ালে পিঠ ঠেকার মতো হলেও আমাদের দেশের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন , লাখ লাখ টাকা খরচ করে এই ইউরোপ নামক মৃত্যু যাত্রা এরা শামিল হয় ।

প্রতিটি দেশই তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য দেশের সীমানায় অস্ত্রসহ সুসজ্জিত সৈন্যদল প্রস্তুত করে রাখে। তবে তাই বলে থেমে নেই মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সেই প্রাচীন যাত্রা বিভিন্ন কৌশলে চৌকস সীমান্ত বাহিনী কে ফাঁকি দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গহীন জঙ্গল বা অথৈই সমুদ্রে পাড়ি জমায়, কেউ সফল হয় আবার কারো ভাগ্যে জোটে সমুদ্রে ডুবে বা জঙ্গলে ক্লান্তিময় দেহে করুণ মৃত্যু।

লেখক: ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী, পর্তুগাল সমাজকর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক fahmedkb@yahoo.com

Leave a Reply