মানবপাচারের চিত্র, ধরন ও সচেতনতার উপায়

মানবপাচারের চিত্র, ধরন ও সচেতনতার উপায়

আধুনিক সভ্যতায় নতুন দাসত্বের নাম মানবপাচার! একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এসেও মানুষ মানুষকে দাসত্বের শিকল পরিয়ে দিচ্ছে পাচারের মধ্যদিয়ে। শুধু নারী-শিশু নয়, মানবপাচারের শিকার হচ্ছে অনেক সচেতন ব্যক্তিও। অনেকে বুঝে উঠতেই পারেন না যে, তিনি কোনো না কোনোভাবে পাচারের শিকার। সমাজে এমন অনেক মানুষও আছেন যে, মানব পাচার আসলে কী সে বিষয়েও জ্ঞাত নন। কিন্তু দিনের পর দিন তার শিকার হয়ে চলেছেন।

মানবপাচারের চিত্র

জাতিসংঘের হিসাব মতে, বিশ্বব্যাপী অন্তত ৪ কোটি মানুষ এমন দাসত্বের শিকার, যার মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি নারী এবং যাদের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যৌন নির্যাতনের কিংবা কারো না কারো লালসার শিকার হচ্ছেন। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার মতে, মানবপাচারের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম উৎসদেশ। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ পাচারের শিকার হন।যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটা অগ্রগতি অর্জন করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রতিবছর ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি)’ শীর্ষক ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘পাচার নির্মূলের ন্যূনতম মানসমূহ’ মেনে চলার ক্ষেত্রে পূর্বের বছরের দ্বিতীয় স্তরের ওয়াচ লিস্ট থেকে উন্নীত হয়ে বাংলাদেশ এবছর দ্বিতীয় স্তরে স্থান অর্জন করেছে।

মানবপাচার কী?

২০১২ সালের মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন অনুযায়ী, মানবপাচার অর্থ কোনো ব্যক্তিকে-ভয়ভীতি প্রর্দশন বা বলপ্রয়োগ করে বা প্রতারণা করে বা আর্থ-সামাজিক বা পরিবেশগত বা অন্য কোনো অসহায়ত্ব কাজে লাগিয়ে বা অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা লেনদেন করে ওই ব্যক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন ব্যক্তির সম্মতি গ্রহণ করে, দেশের বাইরে বা অভ্যন্তরে যৌনশোষণ বা নিপীড়ন বা অন্য কোনো শোষণ বা নিপীড়নের উদ্দেশে নির্বাসন বা  স্থানান্তর, চালান বা আটক করা বা লুকিয়ে রাখা বা আশ্রয় দেওয়াকে বুঝানো হয়।

আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান আরেক ব্যক্তিকে নানা কৌশলে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাকে স্বাধীন চলাচলে বাধাগ্রস্ত করে, জোরপূর্বক কোনো অপকর্ম নিয়োগ করে, আঘাত করে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষতি সাধন করে তখন তাকে মানবপাচার বলা হয়।

কারা পাচারের শিকার হয়?

পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই ভালো চাকরি বা বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন বা প্রবঞ্চনায় পড়ে, কাউকে কাউকে অপহরণ, বল প্রয়োগ করে অথবা ভীতি প্রর্দশন করে পাচার বা কেনাবেচা করা হয়। অথবা ঋণ-দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি খেলোয়াড় সাজিয়েও মানবপাচারের মতো ভয়াবহ দৃষ্টান্তও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আছে।

সাধারণত, নারী ও কিছু শিশু পাচার করা হয় তাদের অভাবগ্রস্ত পরিবারের নীরব সম্মতিতে। এ ছাড়াও বিভিন্ন কারণে মানুষ পাচারের ঝুঁকিতে পড়ে। দারিদ্র, নিরক্ষরতা, সচেতনতার অভাব,বেকারত্ব, বৈষম্য, পারিবারিক নির্যাতন,পাচার বিরোধী উপযুক্ত ফৌজদারি বিচার কার্যকরের অভাব এবং প্রাকৃতিক বিপযয়ও অনেক সময় কারণ হয়ে থাকে।

কোন কাজে ব্যবহৃত হয়?

মানবপাচার করে সাধারণত, পতিতাবৃত্তি, যৌনশোষণ বা নিপীড়ন, গৃহস্থালি কিংবা অন্য দাসত্বমূলক কাজে ব্যবহার, প্রতারণার মাধ্যমে বিবাহ, জোরপূর্ব বিনোদন বা ব্যবসায় ব্যবহার, ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা, ব্যবসার উদ্দেশে অন্যত্র বিক্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

পাচারকারী কারা?

মূলত শ্রমিকদের ঠিকাদার, যারা শ্রমিকদের কাজে বা পেশায় যুক্ত হওযার প্রতিশ্রুতি দেয়, লোভ দেখায় ও দায়িত্ব গ্রহণ করে।বিভিন্ন কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েদের অপকর্মে নিয়োজিত করে, দালালদের বিক্রি করে দেয় কিংবা কোনো পতিতালযে নিয়ে যায়। পাচারকারীর ভূমিকা নারী-পুরুষ উভয়কেই দেখা যায়।

কীভাবে বুঝবেন যে আপনি পাচার হয়েছেন?

অনেকে পাচার হওয়ার পর বুঝতে পারেন যে, তিনি পাচার হয়ে গেছেন, যেমন-

ক.  আপনি বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশে  বাসা থেকে বের হয়েছেন ।কিন্তু সঠিক গন্তব্যে না গিয়ে আপনি ৩-৪ দিন যাবৎ বিমান বন্দরে অথবা নৌকায় বা জাহাজেই আছেন। (বিমানে করে বিদেশ গেলেও পাচার হয় এক্ষেত্রে কাগজপত্র সঠিক আছে কিনা যাচাই করে নিতে হবে)।

খ. নিয়োগকৃত  স্থান থেকে কোনো কারণ ছাড়া একাধিক জায়গায় বারবার স্থানান্তর করলে অর্থাৎ একাদিক মালিক বদলালে, আপনাকে যে কাজের কথা বলে বিদেশে পাঠিয়েছে সে কাজে নিয়োগ না দিয়ে জোরপূর্বক অন্য কাজ করালে বিশেষ করে যৌন কর্ম এবং/অথবা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মে নিযুক্ত করতে চাইলে।

গ. জোর করে গৃহবন্দী করে রেখে শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতন করলে

ঘ. এছাড়াও মাসের পর মাস আপনি কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু আপনাকে কোন বেতন দিচ্ছে না অথবা বেতন চাইতে গেলে আপনাকে মারধোর করছে।

এই অবস্থায় আপনি বুঝতে পারবেন যে, আসলে আপনি মানবপাচারের শিকার। কঠিন এই মুহুর্তে আপনার যেকোনো উপায়ে স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অথবা কোনো আত্মীয়কে আপনার দু:সময়ের বিষয়ে অবগত করতে হবে।  

Leave a Reply