মানব পাচার মামলা ৯৮% আসামিই খালাস
গণমাধ্যমে অভিবাসন

মানব পাচার মামলা ৯৮% আসামিই খালাস

ইন্দ্রজিৎ সরকার

২৭ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক সমকাল। 
মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার প্রায় ৯৮ ভাগ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। সাজা হচ্ছে মাত্র দুই ভাগের। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে নিষ্পত্তি হওয়া ১৪টি মামলার তথ্য বিশ্নেষণ করে মিলেছে এমন চিত্র। দেখা যায়, নিষ্পত্তি হওয়া মাত্র একটি মামলায় একজনের দণ্ড হয়েছে। বাকি ১৩ মামলার ৪৩ আসামি খালাস পেয়েছেন। এ জন্য তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষী হাজির করতে না পারা ও আদালতের বাইরে বাদী-বিবাদীর সমঝোতাকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে পুলিশ বলছে, পারিপার্শ্বিক নানা বাস্তবতায় তদন্ত শেষ করতে বেগ পেতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর নির্বাহী পরিচালক ড. সি আর আবরার সমকালকে বলেন, মানব পাচার স্পর্শকাতর ও গোপন বিষয় হওয়ায় সাধারণত এর কোনো দলিল বা নথিপত্র থাকে না। সামাজিক কারণে ভুক্তভোগীদের অনেকে সামনে এগিয়ে আসতে চান না। অল্পসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রের কাছে প্রতিবিধান চাইছেন। তারাও যদি বিচার না পান, সেটা খুবই পরিতাপের বিষয়। আমাদের মানব পাচার আইনটি আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু আইন বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা না গেলে কোনো লাভ নেই। এ জন্য বিচারক, আইনজীবী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সবাইকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সাক্ষীদের সুরক্ষা দিতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের দিক থেকেও গুরুত্ব দিয়ে এই মামলাগুলোর পর্যালোচনা করা দরকার যে, কেন এমন হচ্ছে? প্রয়োজনে সংশ্নিষ্টদের সহায়তা দেওয়া দরকার। নইলে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হবেন। বিচার ব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি আস্থা কমে যাবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক সোহেল রানা সমকালকে বলেন, দুর্বল তদন্তের বিষয়টি অত্যন্ত অস্পষ্ট অভিযোগ। তদন্ত কর্মকর্তা সবসময় একটি ভালো মানের তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। তবে মামলার প্রকৃতি, সাক্ষ্যপ্রমাণের অপ্রতুলতা ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার কারণে অনেক সময় সফলভাবে তদন্ত সম্পন্ন করতে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাকে বেগ পেতে হয়। আবার সাক্ষী হাজির করতে না পারার অভিযোগটিও ঢালাওভাবে সঠিক নয়। সাক্ষীকে হাজির করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তারপরও অনেক সময় সাক্ষ্যের তারিখ ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে একবার হাজির হওয়া সাক্ষী বারবার হাজিরা দিতে রাজি থাকেন না। এ ছাড়া আর্থসামাজিক ও বাস্তব নানা কারণে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হন না।

সংশ্নিষ্টরা জানান, মানব পাচার ঠেকাতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের পরও থেমে নেই পাচারকারীরা। বিদেশে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এরপর অবৈধভাবে তাদের পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। সেখানে গিয়ে তারা নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। কাগজপত্র ঠিক না থাকায় অনেককে কারাবাস করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গোপন স্থানে জিম্মি করে স্বজনের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা মুক্তিপণ আদায় করছে দুর্বৃত্তরা। করোনাকালেও এই চিত্রের বিশেষ হেরফের হয়নি।

সাক্ষ্যপ্রমাণ ঠিকমতো হাজির করা হয় না: পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ৪৪৩টি মানব পাচারের মামলা হয়েছে। আগের তদন্তাধীন মামলাসহ মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৮৬। তবে এর বাইরে অক্টোবর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলা ছিল ৪ হাজার ১৬৩। এ সময়ে ১০ হাজার ৫৪০ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জানুয়ারি মাসে একটি মামলায় একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া অপর মামলাগুলোয় সব আসামি খালাস পেয়েছেন।

কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক সমকালকে বলেন, প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা অনেক সময় ফৌজদারি মামলার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত অপরাধী দু’জন হলে মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়। এখানে পুলিশের অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। সেইসঙ্গে পুলিশের তদন্তে দুর্বলতার কারণে মূল আসামি ছাড়াও অন্যদের আসামি করা হয়। পরে সাক্ষ্যপ্রমাণ ঠিকমতো আদালতে হাজির করা হয় না। সঠিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া এবং সাক্ষী ও প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব পুলিশের। এ ছাড়া মানব পাচার ও অর্থ পাচার আইনে দুর্বলতা রয়েছে। এই আইনগুলোয় মামলা করা সহজ। তবে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন। এসব কারণে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন।

সমস্যার নাম ‘সমঝোতা’: পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনাকালে এপ্রিল ও মে মাসে মানব পাচার মামলা কিছুটা কম ছিল। জানুয়ারিতে ৫১, ফেব্রুয়ারিতে ৫৫, মার্চে ৬০, এপ্রিলে মাত্র পাঁচটি, মে মাসে কিছুটা বেড়ে ১২, জুনে ৪৩, জুলাইয়ে ৪৯, আগস্টে ৫০, সেপ্টেম্বরে ৬৫ ও অক্টোবরে ৫৩টি মামলা হয়েছে। এ সময় মোট ৪৪৩টি মামলার মধ্যে ২১৩টির চার্জশিট এবং ৩৭টি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত ও বিচারাধীন মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৭৯৯টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু সমকালকে বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু তদন্তে অনেক সময় দুর্বলতা থাকে, চার্জশিট নির্ভুল হয় না। ঘটনাটি যারা ভালোভাবে জানেন এমন সাক্ষী পাওয়া যায় না। সাক্ষী এসে উল্টাপাল্টা বলেন। আলামতসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করা হয় না। ফলে অপরাধ প্রমাণ কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, তদন্তে বেশি সময় নিলে বিচারেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। দেখা গেল, যাকে সাক্ষী করা হয়েছে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। ঠিকানা বদলে তিনি অন্য কোথাও চলে গেছেন। এ জন্য তদন্তে অতিরিক্ত সময় নেওয়া ঠিক নয়। আরেকটি বড় সমস্যা হয় সমঝোতা নিয়ে। ভুক্তভোগী নিজেই বাদী- এমন মামলার ক্ষেত্রে অনেক সময় আদালতের বাইরে দুই পক্ষের মীমাংসা হয়ে যায়। ফলে বাদী আর আদালতে উপস্থিত হন না। এ ধরনের আপসরফাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। সেইসঙ্গে মিথ্যা সাক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

পারিবারিক-সামাজিক চাপে ভুক্তভোগীরা: ভালো বেতনের চাকরি বা উন্নত জীবনমানের প্রলোভন দেখিয়ে নারী-শিশুদের প্রতিবেশী দেশসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়। সেখানে তাদের বিভিন্ন যৌনপল্লিতে বিক্রি বা জিম্মি করে অসামাজিক কাজে বাধ্য করা হয়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তাদের অনেককে পরে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এমন কাজ করে আসছে বেসরকারি সংস্থা রাইটস যশোর। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক সমকালকে বলেন, যাদের প্রত্যাবসন করা সম্ভব হয়, তাদের সবাই মামলা করেন না। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার পরপরই যদি পুলিশ জবানবন্দি নেওয়ার ব্যবস্থা করত, তাহলে অনেক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যেত। কারণ সময় যত গড়াতে থাকে ভুক্তভোগীরা পারিবারিক বা সামাজিক চাপে অনেক কথা বলেন না। তা ছাড়া মামলায় যথাযথ ব্যক্তিদের সাক্ষীও করা হয় না।

তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালের একটি মামলায় সম্প্রতি আদালত আমাকে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আদালতই প্রশ্ন তুলেছেন, আমাকে বাদ দিয়ে কীভাবে সাক্ষী তালিকা করা হয়েছে? অনেক মামলায় পিপির ভূমিকা থাকে প্রশ্নবিদ্ধ। আইনজীবীই ভুক্তভোগীকে মীমাংসার পথে হাঁটতে চাপ দেন বা উদ্বুদ্ধ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলার এজাহার নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে। সংশ্নিষ্ট সবাইকে নিয়ে পর্যালোচনার পর এজাহার লিখলে কিন্তু ভুলত্রুটির সুযোগ আর থাকে না। তখন আদালতও এজাহারের দুর্বলতা বা ত্রুটি পাবেন না।’

বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ভুক্তভোগী বা সংশ্নিষ্টদের অনেক সময় সাক্ষী দিতে দেওয়া হয় না। মামলা যখন নিশ্চিত সাজার দিকে এগোয়, তখন ভুক্তভোগীসহ সংশ্নিষ্টরা টাকা নিয়ে পিছু হটেন। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িতদের গ্রেপ্তারের পরও শেষ পর্যন্ত তারা খালাস পেয়ে যায়। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ তথ্য-প্রমাণ আদালতে দাখিল করতে না পারলে কীসের ভিত্তিতে বিচার হবে?

তদন্তে আলাদা কর্মকর্তা দরকার: ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী হয়। অন্যদিকে ভুক্তভোগী থাকেন দুর্বল। বিচারের সময় দেখা যায়, আদালতে সাক্ষী উপস্থিত হচ্ছেন না। প্রভাবশালীরা তাদের ম্যানেজ করে ফেলেন। এ ছাড়া পুলিশের তদন্ত ও চার্জশিটে দুর্বলতা থাকে। আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না। তবে তদন্তের মান উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। থানায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে তদন্তে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিটি থানায় শুধু মানব পাচার মামলা তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া দরকার। সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ জনকে হত্যার ঘটনায় সংশ্নিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত যথেষ্ট ভালো ছিল। তদন্তের মান বাড়াতে সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকাও জরুরি।

নির্মম নির্যাতন, প্রাণহানি: মানব পাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে বিভিন্ন সময়ে হয়রানি ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকে। এমনকি মাঝেমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। গত ২৮ মে লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদাহতে অভিবাসনপ্রত্যাশী ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে পাচারকারীরা।

ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একজনের কাছ থেকে জানা যায়, ইউরোপে যাওয়ার জন্য লিবিয়ার দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছিলেন ৩৮ বাংলাদেশি। বেনগাজি থেকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তাদের ত্রিপোলি নিয়ে যাচ্ছিল চক্রটি। ঘটনার দিন মিজদাহতে লিবিয়ার মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে জিম্মি হয় দলটি। তখন পাচারকারীরা আরও টাকা দাবি করে বসে। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার মধ্যে আফ্রিকার মূল পাচারকারীকে মেরে ফেলা হলে তার পরিবারসহ চক্রের অন্য সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে বাংলাদেশিসহ মোট ৩০ জনকে হত্যা করে। আহত হন ১১ জন। ওই ঘটনায় মানব পাচার ও সন্ত্রাস দমন আইনে বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৬টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বি.দ্রঃ প্রতিবেদনটি ২৭ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক সমকাল প্রকাশিত হয়েছে।  

Leave a Reply