মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া :  চূড়ান্ত পর্বে লড়ছেন বাংলাদেশি কিশোয়ার
কিশোয়ারের কল্যাণে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সব পদ নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হবে। আর মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার কল্যাণে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়।

মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া : চূড়ান্ত পর্বে লড়ছেন বাংলাদেশি কিশোয়ার

কাউসার খান,সিডনি, অস্ট্রেলিয়া :

বিশ্বের রান্নাবিষয়ক জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়েলিটি শো মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়োদশ আসরের মূল পর্ব শুরু হয়েছে ২০ এপ্রিল, সোমবার। নর্দার্ন টেরিটরিতে চলছে এই প্রতিযোগিতা ও তার দৃশ্যধারণ। বাছাইপর্ব পেরিয়ে ২৪ জন অংশ নিচ্ছেন চূড়ান্ত পর্বে। এই দলে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী।

মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার ত্রয়োদশ আসরের বাছাইপর্বে কিশোয়ার চৌধুরী রান্না করেন বাংলাদেশি পদ। সেই রান্নার ঝলক দেখানো হয়েছে প্রথম পর্বে। এর আগে বাছাইপর্বে পরিচিতি পর্ব এবং প্রথম পদ রান্নার একটি দীর্ঘ পর্বও প্রচারিত হয়েছে। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার সেরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় আপাতত সপ্তম স্থানে আছেন কিশোয়ার।

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গণমাধ্যমে এরই মধ্যে সাড়া পড়েছে তাঁকে নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে সমর্থন করতে সরব হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা। কিশোয়ারের হাতে বাংলাদেশের নানা স্বাদের ঐতিহ্যবাহী পদগুলো শিগগিরই দেখা যাবে আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে।

বিশ্বের রান্নারবিষয়ক টেলিভিশন রিয়েলিটি শোর মধ্যে মাস্টারশেফ অন্যতম। প্রায় ৪০টি দেশ তাদের নিজস্ব মাস্টারশেফ আয়োজন করে থাকে। তবে জনপ্রিয়তার দিক থেকে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া রয়েছে তালিকার শীর্ষে। এমনকি অনুষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়ার সর্বাধিক জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান। ২০১০ সালে প্রচারিত মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া সিজন টু দেশটির টেলিভিশন ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দেখা ধারাবাহিক অনুষ্ঠান। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার বাছাইপর্বে কিশোয়ারের পরিবেশনা এরই মধ্যে দর্শক, অন্যান্য প্রতিযোগী ও বিচারকদের কাছে আলোচিত এবং সমাদৃত হয়েছে ।

বাংলাদেশি খাবার রান্না ও পরিবেশনা নিয়ে খুবই উৎসাহী কিশোয়ার। বাছাইপর্বে তাঁর স্বপ্ন নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে আবেগাপ্লুত কিশোয়ার বলেন, ‘আমার স্বপ্নটা খুব সাধারণ, বাংলাদেশি খাবার তেমন একটা উপস্থাপন করা হয় না। আবার যাও হয়, তা ভারতীয় খাবারের সাথে মিশে যায়। আমার বাবা-মা প্রায় ৭০ বছর বয়সী। কিন্তু তাঁরা এখনো বাংলাদেশে রেখে আসা ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে রাখতে প্রচণ্ড ভালোবাসেন। তাঁরা এখনো নিজেরাই বাজারে যান শুধু করলা কিংবা চালকুমড়ার মতো কিছু বাংলাদেশি সবজি এনে রান্না করার জন্য। রান্না নিয়ে আমার স্বপ্ন হলো বাংলাদেশি একটি রান্নার বই লিখে যাওয়া। কারণ, আমি যদি এটা আমার সন্তানের জন্য রেখে না যাই, তবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া বাংলাদেশের সেই ঐতিহ্য আমার সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে।’

চূড়ান্ত পর্বের প্রতিযোগীদের সঙ্গে কিশোয়ার

কিশোয়ারের এমন স্বপ্ন আর সাবলীল বাচনভঙ্গি বিচারক থেকে দর্শক সবার মন জয় করেছে। তবে শুধু কথায় নয়, রান্নায়ও পটু তিনি। বাছাইপর্বে কিশোয়ারের মাছ আর কাঁচা আমের টক দেখে বিচারকেরা কেবল মুগ্ধ হননি; বরং তাঁর স্বাদে বিমোহিত হয়েছেন। বিচারক জক জনফ্রিলোর মন্তব্য ছিল, আমি কল্পনা করতে পারছি এই রেসিপিটি তৈরি করা কতটা কঠিন। তবে এ বছরের আমার খাওয়া এটাই সেরা রেসিপি।

মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার এবারের আসরের পুরস্কার থাকছে আড়াই লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার। কেবল এই অর্থই নয়, বিজয়ীর সম্মননা অর্জনের জন্য প্রতি সোমবার হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। আপাতত হবে দলীয় প্রতিযোগিতা; সবচেয়ে নিচের অবস্থানে থাকা দলকে মঙ্গলবার আবারও লড়তে হবে; আর হারলেই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যাবে। এ ছাড়া প্রতি বুধবার থাকছে রহস্য চ্যালেঞ্জ। এরপর সেরা ১২ জন প্রতিযোগী বৃহস্পতি ও রোববার এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন টিকে থাকার জন্য।

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের মেলবোর্নের বাসিন্দা কিশোয়ার চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়াতেই। পেশায় কিশোয়ার একজন ‘বিজনেস ডেভেলপার’। দুই সন্তানের মা কিশোয়ার সন্তানদের জন্য বাংলাদেশি খাবার রান্না করতে গিয়েই পরিবারের কাছ থেকে শিখেছেন নানান রেসিপি। তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশিদের মতোই গর্বিত তাঁর পরিবারও। কিশোয়ার চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়া এবং সমাজসেবার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত মুখ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী কামরুল হোসাইন চৌধুরী ও লায়লা চৌধুরীর মেয়ে।

মেয়ের গৌরবোজ্জ্বল কৃতিত্বের কথা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন কামরুল হোসাইন চৌধুরী। তিনি বলেন, গত নভেম্বর মাস থেকেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চলে গিয়েছে কিশোয়ার। এই প্রতিযোগিতার জন্য বর্তমানে কিশোয়ারসহ সব প্রতিযোগী রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার নর্দান টেরিটরি রাজ্যে।

নিজের মেয়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে, এ নিয়ে গর্বের শেষ নেই তাঁর। বললেন, ‘আমি যা পারি নাই, নূপুর (কিশোয়ার চৌধুরীর ডাকনাম) তা করে দেখিয়েছে; আমার দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি যে ভালোবাসা, আমার মেয়ে সেটা এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। আপনারা সকলে নূপুরের জন্য দোয়া করবেন।’

কোনো সন্দেহ নেই কিশোয়ারের কল্যাণে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সব পদ নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হবে। আর মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার কল্যাণে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। বাংলাদেশ পরিচিত হবে নতুনভাবে, বাংলাদেশি কুইজিনের সৌন্দর্য আর আস্বাদে। কিশোয়ার চৌধুরীর জন্য শুভকামনা।

Leave a Reply