যে বাঙালির রান্নায় মুগ্ধ মার্কিন ফাস্ট লেডিসহ হলিউড তারকারা
মাস্টারশেফ নাজিম খানের কথা

যে বাঙালির রান্নায় মুগ্ধ মার্কিন ফাস্ট লেডিসহ হলিউড তারকারা

এস এম সাদেক, ইমিগ্রেশন নিউজ :

পুরান ঢাকার উর্দু রোডে জন্ম। বায়ান্নবাজার-তিপ্পান্ন গলির আনাচেকানাচে কেটেছে শৈশব। এসএসসি ও এইচএসসিও শেষ করেছেন ঢাকায়। এরপর পাড়ি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেটি ১৯৯২ সালের কথা। যদিও এতটা সহজ ছিল না। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই ব্যবসায় প্রশাসনে পড়ার জন্য ভর্তি হন জর্জিয়া কলেজে। কিন্তু বাধ সাধে পরিস্থিতি। পড়ে যান আর্থিক টানাপোড়েনে। বিরতি দেন পড়ালেখায়। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে চলে যান নিউ ইয়র্কে। ১৯৯৭ সালে নিউইয়র্কে শুরু করেন জাপানি রেস্টুরেন্টে কাজ। সেই শুরু। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। একাগ্রতা কর্মনিষ্ঠার সঙ্গে পোক্ত করেছেন নিজেকে। এই বাংলাদেশি হয়ে উঠেন বহুজাতিক সমাজের রুচিসম্মত রন্ধনশিল্পী।

বলছিলাম সার্টিফাইড মাস্টারশেফ নাজিম খানের কথা। নিউ ইয়র্কের নামকরা হোটেলে শেফ হিসেবে কর্মজীবনের শুরু। সে সময়ই উন্নত ও স্বাস্থ্য সম্মত রান্নার প্রস্তুতি-প্রণালি শিখে নেন। একে একে কাজ করেন টাইমস স্কোয়ারের ম্যারিয়ট মারক্যুইস, লং আইল্যান্ড ম্যারিয়ট, ডাউনটাউন ম্যানহাটানের ব্যাটারি পার্কে রিটজ কার্লটন, ডাবল ট্রি হিল্টন হোটেলের প্রধান শেফ হিসেবে। এরপর ২০১২ সালে বসন্ত এবং গ্রীষ্মে এডজাঙ্কট টিচার হিসেবে রন্ধন শেখান অনেক আমেরিকানদের। তারপর আবারও দায়িত্ব পালন করেন আন্তর্জাতিক মানের হোটেলে চিফ শেফ ও এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে। এ সময়ের মধ্যে সুযোগ হয়েছে সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামার জন্যও বিশেষ একটি রান্না করার। নিকোল কিডম্যান এবং অ্যালেক বল্ডউইনের মতো হলিউডের খ্যাতনামা অভিনেতারাও প্রশংসা করেছেন নাজিম খানের রান্নার। এভাবেই নিজের স্থান করে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র কুলিনারি ফেডারেশনেও।

এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে সুযোগ হয়েছে সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামার জন্যও বিশেষ একটি রান্না করার। নিকোল কিডম্যান এবং অ্যালেক বল্ডউইনের মতো হলিউডের খ্যাতনামা অভিনেতারাও প্রশংসা করেছেন নাজিম খানের রান্নার। এভাবেই নিজের স্থান করে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র কুলিনারি ফেডারেশনেও।

এই ফেডারেশন তাকে ‘সার্টিফাইড এক্সিকিউটিভ শেফ’ উপাধি দেয় ২০০৭ সালে। এরপরই বিশ্বের সেরা রন্ধনশিল্পী’র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পথ সুগম হয় নাজিম খানের। ‘সার্টিফায়েড মাস্টার শেফ’ মূলত রন্ধনশিল্পের একটি বিশেষ সনদ, যা বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ থেকে দেওয়া হয়। নাজিম খান এই সনদ অর্জন করেছেন ফ্রান্সের ওয়ার্ল্ডশেফ অর্গানাইজেশনের কাছ থেকে। ২০১৫ সাল থেকে নাজিম খান নেব্রাস্কার ব্রায়ান হেলথ মেডিকেল সেন্টারের (যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হেলথ সায়েন্স কলেজ) রান্নাঘর সামলাচ্ছেন এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে। তার অধীনে এখন প্রায় ৩০০ কর্মী (কুক ও শেফ) সেখানকার চিকিৎসক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, রোগী ও অতিথিদের জন্য খাবার তৈরি করেন।

অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন এ কুলিনারি শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছে ইমিগ্রেশননিউজ২৪কম। কথা কথায় তুলে ধরেন নিজের অভিজ্ঞতা, মাস্টারশেফ ও কুলিনারি নিয়ে নিজের ভবিষ্যত ও বাংলাদেশের জন্য এই পেশার গুরুত্ব সম্পর্কে।

 ‘সার্টিফায়েড মাস্টার শেফ’ মূলত রন্ধনশিল্পের একটি বিশেষ সনদ, যা বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ থেকে দেওয়া হয়।

ইমিগ্রেশন নিউজ : সার্টিফাইড মাস্টারশেফ সম্পর্কে কিছু বলুন!

নাজিম খান: সার্টিফাইড মাস্টারশেফ দু’রকমের হয়ে থাকে। একটা হচ্ছে, কোনশেফ যদি কোনো রেস্টুরেন্টে মিশেলিন স্টার পায়, তাহলে সে অটোমেটিক সার্টিফাইড শেফ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আরেকটা হচ্ছে, যেখানে পরীক্ষার মাধ্যমে মুনশিয়ানাটা প্রমাণ করতে হয়। আমার ওয়ার্ক ইথিকস, অভিজ্ঞতা, কাজের কৌশল ইত্যাদি সবকিছু দিয়ে স্টেপ বাই স্টেপ আমাকে আগাতে হবে পরীক্ষার মাধ্যমে। এভাবে মাস্টারশেফে সার্টিফাইড হতে হয়। বিভিন্ন দেশে টিভিতে মাস্টারশেফ শো হয়। এসব টিভি সেলিব্রেটি মাস্টারশেফ কম্পলিটলি আলাদা একটি বিষয়। এটার মানে হচ্ছে একটি শো শুরু হয়েছে, সেখানে যেকোনো দেশ থেকে ২৪ জন অংশগ্রহণকারী থেকে একজন প্রথম হয়, যাকে মাস্টারশেফ ঘোষণা করা হলো। এটা পুরোপুরি করা হয় চ্যানেলগুলোর প্রচারণার জন্য। কিন্তু এরা সার্টিফাইড মাস্টারশেফ না। আমাদের দেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে মাস্টারশেফ নিয়ে ভুল তথ্য সংবলিত সংবাদ প্রকাশ করে অনেক সময়। এই বিষয়ে যদিও আমি নির্দিষ্ট করে বলতে চাই না। এটি তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে হয়ে থাকে। এতে করে মাস্টারশেফ সম্পর্কে আমরা ভুল তথ্য পেয়ে থাকি। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সঠিক তথ্য সরবরাহে সঠিক জায়গায় যেতে হবে।

ইমিগ্রেশন নিউজ: কুলিনারিশিল্প এবং মাস্টারশেফ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য আপনার ভাবনা কী?

নাজিম খান: বাংলাদেশে কুলিনারিশিল্প এবং মাস্টারশেফ নিয়ে অনেক কিছু করা আছে। আমার ইচ্ছা, বাংলাদেশকে জানানো যে কিচেনের স্ট্র্যাটেজিটা কি, নাইফের স্ট্র্যাটেজিটা কি, কুলিনারি নলেজ, হেলথি ফুড কীভাবে হয়, এসব নিয়ে সঠিক ধারণা প্রদান করা। দেখা যায় যে, পাশ্চাত্য দেশের মত বাংলাদেশের হাসবেন্ড-ওয়াইফ দুজনই এখন বাইরে কাজ করছেন। যখন আমরা কাজ শেষ করে বাসায় ফিরি, তখন কি খেলে আমরা ভালো নিউট্রিশান পাবো, কিভাবে দ্রুততার সঙ্গে খাবার তৈরি করা যায়, স্বাস্থ্যকর খাবার, সাপ্তাহিক মেনু প্লানিং, নিউট্রিশন ইত্যাদি পদ্ধতিতে কাজ করা জরুরি। এই বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার নিজের পেজ থেকে নিয়মিত লাইভ প্রোগ্রাম ও লেখালেখির মাধ্যমে ধারণা দিচ্ছি। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অংশ নিচ্ছি এই বিষয়ে কথা বলতে। সামনে থেকে আমি ছোট ছোট একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। প্রথমে কিচেন ব্যবস্থাপনা ও সেফটি নিয়ে কথা বলা। এরপর কুকিংয়ের ডিটেলস নিয়ে কথা বলতে হবে।

ইমিগ্রেশন নিউজ: বাংলাদেশে কি কিচেন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে?

নাজিম খান: আমার মনে হয় না সঠিক নিয়মে কিছূ আছে। তবে রান্নাবান্নার যে স্কুলগুলো এখন হচ্ছে, সেগুলোতে বেসিক শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু সে শিক্ষার মধ্যে অনেক ভুল-ত্রুটি থেকে যায়। দেখা যায়, এখানে সবাই কাজ করে একটা টেকনিকে, চাইনিজ কিংবা এশিয়া টেকনিকে। তবে অন্য যে টেকনিকগুলো আছে, যেমন ইউরোপিয়ান, আমেরিকান, বৈজ্ঞানিক টেকনিকগুলো এখনো বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে আসেনি বলে আমার ধারণা।

ফেডারেশন তাকে ‘সার্টিফাইড এক্সিকিউটিভ শেফ’ উপাধি দেয় ২০০৭ সালে।

ইমিগ্রেশন নিউজ: ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটিগুলোতে এ বিষয়ের কোন ডিপার্টমেন্ট, কোর্স কিংবা ইনস্টিটিউশন চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা?

নাজিম খান: অবশ্যই। বিশাল সম্ভাবনা আছে। যেমন আমেরিকাতে কুলিনারি স্কুলের জন্য আলাদা প্রোগ্রাম আছে, যেখান থেকে এসোসিয়েট ডিগ্রি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটিগুলোতেও কুলিনারি ডিপার্টমেন্ট হতে পারে। কুলিনারি আর্টসের একটা স্কুল হতে পারে, যেখানে আমরা দু’বছরের একটা এসোসিয়েট ডিগ্রি দিতে পারি। ইউরোপ আমেরিকা সব জায়গাতেই এরকম আছে। বাংলাদেশকেও কানেক্টেট হতে হবে। ওদের কারিকুলামগুলো ফলো করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশের মানুষও সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হতে পারবেন। দুই বছরের কোর্সে একটা সঠিক অবস্থান তৈরি হতে পারে। তিন বা ৬ মাসের কোর্সে কখনই মাস্টারশেফের জায়গাতে পৌছানো সম্ভব না।

ইমিগ্রেশন নিউজ: বাংলাদেশে মাস্টারশেফের ভবিষ্যত কোথায় দেখতে পাচ্ছেন?

নাজিম খান: অনেক বেশি সম্ভাবনা রয়েছে এক্ষেত্রে। ক্যারিয়ারও উজ্জ্বল। দেশ যতো এগিয়ে যাবে ততো বেশি স্বাস্থ্যকর খাবার এবং রন্ধনশিল্প জনপ্রিয় হবে এবং এখানে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি হবে। যেকোনো পেশারই একটি সর্বোচ্চ চূড়া থাকে। মাস্টারশেফটা তেমনই একটা চূড়া। এখানে উচ্চবেতন ও উচ্চ অবস্থান ও সম্মান আছে। বাংলাদেশে এটার যথেষ্ট সুযোগ আছে। আগে শুধু শেরাটন হোটেল এবং প্যানসফেসিফিক সোনারগাঁতে রেস্টুরেন্ট ছিল। কিন্তু এখন অনেক আন্তর্জাতিক মানসম্মত হোটেল হয়েছে দেশে। সবাই নিজের দেশের ফুড খেতে ভালোবাসে। তেমনি ইউরোপ-আমেরিকার মানুষজন যদি বাংলাদেশে আসে, তখন তারাও তাদের দেশের ফুড খেতে চাইবে। বাংলাদেশের কেউ যদি মুনশিয়ানা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন তারা অবশ্যই অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারেন।

ইমিগ্রেশন নিউজ: এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?

নাজিম খান: আমি চাই বাংলাদেশও ভারত শ্রীলঙ্কা ও অন্য দেশের মতো কুলিনারি ইন্ডাস্ট্রিতে এগিয়ে যাক। এটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য আমি ইতিমধ্যে একটি পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। সেটি হচ্ছে ওয়ার্ল্ড শেফ এসোসিয়েশনের ছাতার নিচে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে চাই। এ জন্য যে যে কাজগুলো করা দরকার সেগুলোর প্রসেস চলছে। ওয়ার্ল্ড শেফস অর্গনাইজেশনের হাই লেভেলের লোকদের সাথে আমার কথা হয়েছে যে, কীভাবে বাংলাদেশের নামটা ওখানে নিতে পারি। যখন নিতে পারব তখন বাংলাদেশও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো স্বীকৃত হবে।

এখন পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড শেফ এসোসিয়েট কান্ড্রিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেরনাম নেই। এই প্রথম ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওয়ার্ল্ড শেফস সেমিনারে আমি নিয়ে যাব। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করব আমি। আমার আরেকটি স্বপ্ন হলো, কুলিনারি স্কুল যদি করতে পারি দেশে একটি সেটা হবে বড় পাওয়া। সেটা অনলাইন ভিত্তিক কিংবা সরাসরি। অথবা দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের সঙ্গে যুক্ত হয়েও করা যেতে পারে। এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে।

Leave a Reply