লোকবান্ধব সম্মাননা : অস্থির সময়ে দূর থেকে দেখা অনন্য আয়োজন
আলাউদ্দিন ফাউন্ডেশন আয়োজিত লোকবান্ধব সম্মাননা তেমনি এক নান্দনিক আয়োজন।

লোকবান্ধব সম্মাননা : অস্থির সময়ে দূর থেকে দেখা অনন্য আয়োজন

উজ্জ্বল দাশ, কানাডা থেকে,
বছর হতে চলেছে বিশ্বজোড়া চলমান আকালে দিশেহারা মানবকূল, আবার কবে ফিরবে সুদিন। জীবন মৃত্যুর দোলাচলে কাটানো যাপিতজীবনে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত মানসিক চাপ। এরমাঝেও আমরা ছোট ছোট আয়োজন স্বশরীরে কিংবা ভারচুয়াল মাধ্যমে উপভোগ করে প্রাণিত হই। গেল ০৯ জানুয়ারি, হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার আলাউদ্দিন ফাউন্ডেশন আয়োজিত লোকবান্ধব সম্মাননা তেমনি এক নান্দনিক আয়োজন। দূর থেকে দেখা এই ব্যতিক্রমী আয়োজন উপভোগ করার রেশটা লেগেই আছে।
স্কুল ছেড়ে আসার পর শিক্ষকদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ আমাদের মতো অভিবাসীদের জন্য অনেক কঠিন । সুদীর্ঘকাল পর আমার বিদ্যাপীঠ নবীগঞ্জ যুগল কিশোর (জে.কে) উচ্চবিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকদের এক সাথে দেখার, প্রিয় মানুষগুলোর কথা শুনার সুযোগ করে দিল এই লোকবান্ধব সম্মাননা আয়োজনে দেখা একটা দুপুর।

সহকর্মীদের মাঝে আলাউদ্দিন আহমেদ


বয়সের ভারে ন্যুজ আমাদের প্রিয় শিক্ষকদের একমঞ্চে দেখছি। আর নিজে ফিরে যাচ্ছি আমার হাইস্কুল পড়ুয়া সময়ে। ভেসে উঠছে স্কুলের বারান্দা,অলিগলি, প্রিয় শিক্ষকদের তেজোদীপ্ত মুখচ্ছবি। মঞ্চে আমার স্যারেরা শিশুর মতো অপার বিষ্ময়ে বসে আছেন। পরিতোষ চক্রবর্ত্তী, মোদাব্বির হোসেন, মাহবুব চৌধুরী, বজলুর রহমান, রথীন্দ্র দে, দাউদ মিয়া, হাফিজুর রহমান, দেওয়ান হুসেন আহমেদ, আব্দুল মালিক, আখলাকুর রহমান, মাহবুবুল আলম স্যারকে একসাথে দূর থেকে দেখার সুযোগটি ছিল অনন্য। শিক্ষকদের একত্রিত করে তাদের সোনাঝরা দিনগুলোর রোমন্থন ছিল আয়োজনের সবচেয়ে বড় আকর্ষনীয় পর্ব। পাশাপাশি গন্ধা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়া শিক্ষিকা সবিতা রায় মীরা ও গীতা রাণী কর দু’জন দিদিমনিকে বিদায় সংবর্ধনা প্রদান আয়োজনে যুক্ত করে নতুন মাত্রা।

লোকবান্ধব সম্মাননা-২০২০


বলে নিচ্ছি অল্পবিস্তর আয়োজক প্রতিষ্টান আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন সম্পর্কে। আমার শিক্ষক, নবীগঞ্জ জেকে হাইস্কুলের প্রাক্তন সহকারী প্রধানশিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক নবীগঞ্জ পৌরসভাধীন গন্ধা গ্রামে জন্ম নেয়া প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমেদ। শিক্ষক হিসেবে যেমন ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ তেমনি মানুষ হিসেবেও ছিলেন নিরহংকারী, অসাম্প্রদায়িক মানসচৈতন্যের অধিকারী। প্রয়াত এই মহান ব্যক্তিত্বকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে প্রয়াতের পরিবার তথা গোষ্টির সদস্যবর্গ এবং আত্নীয় স্বজন মিলে প্রিয় শিক্ষকের নামে শুরু করেছেন ‘আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন’ ।
সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই মানুষ গড়ার কারিগরের অনেকগুলি মানবিক গুণাবলীর কথা মাথায় রেখেই প্রতিষ্ঠানটি নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। তেমনি একটি প্রচেষ্ঠা লোকবান্ধব সম্মাননা। আমরা জানি, সমাজের এমনকিছু বিরল প্রতিভাধর মানুষকে আমরা কাছ থেকেও দেখিনা। তাদের মতো মানুষদের খুঁজে বের করে মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টায় উদ্যোগি হওয়া লোকের সংখ্যা নেহাতই কম। এখানেই ব্যতিক্রম আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তারা। সমাজকর্মে নিঃস্বার্থ ব্যক্তিদের মাঝ থেকে প্রতিবছর একজন গুণী ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে একটি বিশেষ সম্মাননা প্রদান করার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথম বারের মতো দেয়া হল লোকবান্ধব সম্মাননা-২০২০।

চারণ সাংবদিক মো: মছদ্দর আলী।

এই বছর সম্মানীত হলেন নাট্যকার, অভিনেতা, চারণ সাংবদিক মো: মছদ্দর আলী। স্নিগ্ধ আয়োজনের মাধ্যমে তাঁকে সম্মাননা হিসেবে একটি ক্রেস্ট, সম্মাননাপত্র এবং নির্দিষ্ট অর্থমূল্যের একটি চেক প্রদান করা হয। লোকবান্ধব সম্মাননাপ্রাপ্ত গুনী শিল্পী মছদ্দর আলীকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন ফাহমিদা আক্তার দীপা। আর্থিক সম্মাননার চেক হস্তান্তর করেন আলাউদ্দিন আহমেদের সহধর্মিনী বেগম রহিমা খাতুন। আলাউদ্দিন আহমেদের সহকর্মীদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, হোমল্যান্ড আাইডিয়েল স্কুলের প্রধান শিক্ষক ডা. তাপস আচার্য্য, সিলেট মদন মোহন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. সফিকুর রহমান ও নবীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী।

এদিকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, শিক্ষা,শিল্প সাহিত্য, সংস্কৃতি, জনসেবা, ক্রীড়া, চিকিৎসা,লোকশিক্ষা, লোকশিল্প, সঙ্গীত সাধনা অথবা জনহিতকর অন্য কোনো কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ প্রতিবছর এই সম্মাননা প্রদান করা হবে।
এছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জীবনের এক অমর আখ্যান।এই আখ্যান কত অগনন মানুষের রক্ত ঘাম আর শ্রমের বিনিময়ে রচিত হয়েছে যা পরিপূর্ণভাবে কোনোদিনও লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হবেনা। এইসব নিরব নিঃস্বার্থ এবং অস্বীকৃত কোনো অবদানের কথা যদি ফাউন্ডেশন অবগত হয় তবে ফাউন্ডেশন স্বীয় উদ্যোগে অবদানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের অনুসন্ধান করে সাধ্যানুযায়ী তাদেরও মূল্যায়ন করবে।
অচিরেই স্থানীয় পর্যায়ে স্কুল কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি প্রদান বা নগদ অর্থমূল্যের ‘ শিক্ষা সম্মাননা ’ প্রদান করে তাদেরকে শিক্ষা গ্রহণে অনুপ্রেরণা মূলক প্রচেষ্ঠা।

গহীনপুর’র পরিবেশনা


৯ জানুয়ারি সম্মাননা প্রদান উপলক্ষে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। যেখানে আলাউদ্দিন আহমেদের পুত্র শিল্পী আসাদ ইকবাল সুমনের গড়া ’গহীনপুর’ পরিবেশন করে নাটক-জাগো। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা করেছেন সাঈদ রিঙ্কু।
অনুষ্ঠানে ছিল প্রতীক থিয়েটার, চুনারুঘাট, আনন্দ নিকেতন, নবীগঞ্জ চলচ্চিত্র সংসদ নবীগঞ্জের তরুণ কুশলী সহ অনেকের পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক সহ অনেকেই। শিশু-কিশোরদের নিয়ে একটি র‌্যালী শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

অতিমারীর এই সময়ে নান্দনিক আয়োজনটি দেশে বিদেশে থাকা অনেককে নষ্টালজিক করে তুলেছিল। দূর থেকে দেখা এই আয়োজনের সুখস্মৃতি মনে থাকবে। এই প্রচেষ্টা দিনদিন অঞ্চলের তরুণদের মানসিক বিকাশে বলিষ্ট ভুমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস, প্রচেষ্টার শুরুটা ছিল অনন্য, জীবন ঘনিষ্ট। জয়তু; আমার পিতাতুল্য শিক্ষকের নামে গড়া আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন।

Leave a Reply