শুভ নববর্ষ : আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে
চারদিকে মৃত্যুভয়ে আক্রান্ত মানুষ, যন্ত্রণাক্লিষ্ট অসুস্থ শরীর আর উদ্বেগের মধ্যেও এসেছে আমাদের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ।

শুভ নববর্ষ : আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে

ইমিগ্রেশন নিউজ :  নববর্ষ আজ এসে গেছে বাঙালির ঘরে ঘরে।  চারদিকে মৃত্যুভয়ে আক্রান্ত মানুষ, যন্ত্রণাক্লিষ্ট অসুস্থ শরীর আর উদ্বেগের মধ্যেও এসেছে আমাদের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ। তাই বলি, আনন্দধ্বনি হয়তো বেজে উঠবে না বটতলায় হাটখোলায়। কিন্তু প্রাণ সে কি মানে কোনো বাঁধ কিংবা বাধা। তাতে ঠিকই বাজবে আনন্দধ্বনি। সবাই হয়তো একবার হলেও গেয়ে উঠবে- এসো হে বৈশাখ এসো এসো। 

যা কিছু জীর্ণ-পুরোনো,অশুভ ও অসুন্দর,তা পিছে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে বাঙালি বরণ করে এই দিন। উদযাপনে না হলেও বাঙালির প্রাণের বাদনে শুরু হলো আরও একটি নতুন বছর, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। 

বাঙালির নববর্ষ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যময় উৎসব। কেননা, পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। 

মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। দিনে দিনে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব। এমন অসাম্প্রদায়িক উৎসব সত্যিই পৃথিবীতে বিরল।

বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি যখন তাদের অন্যায়-অন্যায্য শাসনকে ন্যায্যতা দিতে ধর্ম ব্যবহার করতে চেয়েছে,তখন এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে বেগবান করেছিল। সেই একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রেরণা জুগিয়েছিল ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামেও।

স্বাধীনতার পর পয়লা বৈশাখ পেল সাধারণ ছুটির দিনের মর্যাদা। ধীরে ধীরে বাংলা নববর্ষ হয়ে উঠল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উৎসবের দিন।

পয়লা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। গ্রামীণ মেলা,লোকজ নানা ধরনের খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল এর প্রধান আকর্ষণ। দিনে দিনে এই উৎসব শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে এবং এখন পয়লা বৈশাখের উৎসবের আড়ম্বর শহরগুলোতেই বেশি লক্ষ করা যায়।

রমনার অশ্বত্থমূলে সেই ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট আয়োজন করে আসছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। বাংলা নতুন বছরের প্রথম সূর্যের আলো ফোটার ক্ষণটিতে সমবেত কণ্ঠে শিল্পীরা প্রতিবছর গেয়ে ওঠেন আবাহনী গান। গত বছরের মতো এবারো রমনার অশ্বত্থতলায় কোনো আয়োজন নেই। মাহামারির আগ্রাসনে মানুষের পদস্পর্শশূন্য উদ্যানের ঘাসগুলো বাড়ছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আর ছায়ানট বেছে নিয়েছে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম।

জরাজীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা আর কূপমুন্ডকতাকে ধূলিস্মাৎ করে দিতে বছরের প্রথম দিনটি অর্থবহ করে তুলতে আয়োজন হয় মঙ্গলশোভাযাত্রা। প্রতিবছর মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার সীমিত পরিসরে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন করা হবে। মহামারি পরিস্থিতি বিবেচনা করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সীমিত পরিসরে আয়োজন করা হবে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই শোভাযাত্রা। এ আয়োজনে চারুকলা অনুষদ চত্বরে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাত্র ১০০ জন অংশ নিতে পারবেন।

তবুও জোর আশা, মানুষ নিশ্চয়ই বিজয়ী হবে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে। আবারও বাঙালি মুখর হবে উৎসবের ছন্দে। ছায়ানটের ৫৪তম বর্ষবরণের আয়োজনে রমনার বটমূল উজ্জীবিত না হলেও ৫৫তম বর্ষে এসে সুরের আগুন লাগিয়ে দেবে সবার মনেপ্রাণে। বৎসরের আবর্জনা দূর করে নববর্ষে নতুন আশা,নতুন স্বপ্ন আর নতুন সংকল্পে বাঁচি সবাই।

Leave a Reply