সাহসিকা অরুণা হায়দার , ভালবাসা বিলাসিনী
মঞ্চে নৃত্যরত অরুনা হায়দার

সাহসিকা অরুণা হায়দার , ভালবাসা বিলাসিনী

হিমাদ্রী রয়, টরন্টো।

শিল্পীদের তৈরি করা হয় না তারা জন্মগ্রহণ করে কথাটি সর্বৈব সত্যি প্রমাণ করেছিলেন বিশ্বনন্দিত নৃত্য শিল্পী উদয় শঙ্কর। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী হয়েও তার অনন্য শৈলি দিয়ে পাশ্চাত্য কে মুগ্ধ করেছিলেন।তিনি আধুনিক উপস্থাপনাকে গ্রহণ করেছিলেন ভারতের চেতনা দেখানোর জন্য,পশ্চিম কে নিয়ে গিয়েছিলেন পূর্বের কাছে। তিনি ছিলেন সত্যের নির্বাচক,সৌন্দর্য্যের নির্বাচক, তাঁর কথায় যা সুন্দর তাই শিল্প। শিল্পের অনন্য মাধ্যম হলো নৃত্যকলা। নৃত্য হলো এমন এক ধ্যান যা দেহ আর মনকে এই সুত্রে বাঁধে। এ হলো ভৈরবের শিল্প, অন্তরের সাধনা দেহে প্রবাহিত হয় কখনো শান্ত, স্বর্গের উদ্যান কিংবা ইন্দ্রের সভা আলোকিত করার মত।আবার কখনো ক্ষিপ্র, উগ্রা শিবদূতি, নৃমুন্ডমালিনী চামুন্ডা।

সুকণ্যা নৃত্যঙ্গন এর পরিবেশনা

আমাদের যাপনের প্রতিটি ভাললাগা মুহুর্তের আনন্দ-উৎসবের বহিঃপ্রকাশই নৃত্য। প্রতিটি নৃত্য একটি অনুভূতির গল্প যা পড়ে নিতে হয়। যেমন আদিবাসীরা বেলা ডুবলে শ্রান্ত ক্লান্ত দিনের শেষে, আঙিনায় আগুন জ্বালিয়ে, তাকে ঘিরে যে উচ্ছ্বাসের তরঙ্গ লীলায়িত করে সেও একটি সুন্দর নৃত্যের আকার ধারণ করে।অনেকে নিজের অজান্তেই আমরা নৃত্য করি। ‘প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনা মাঝে গৌর চাঁদ নাচিয়া বেড়ায় রে’। শ্রী চৈতন্যের প্রেমভাবশ্রিত যুগল চরণ,ঊর্ধ মুখি হাত, আর নৃত্যের উন্মাদনায় জাত-পাত ভুলে প্রেমরসাশ্রিত হয়েছিল সমাজ, সেওতো নৃত্য যা আজো পুলক জাগায় মনে কোন কারণ ছাড়াই। রবীন্দ্রনাথের কথায় “স্নিগ্ধ শ্যাম পত্রপুটে আলোক ঝলকি উঠে পুলক নাচিছে গাছে গাছে”।

আবেগপূর্ণ নৃত্য রস বন্ধনহীন মুক্ত বিহঙ্গের মত মনের আকাশে বিশ্বাসী উড়াল।’মন মাতালে মাতাল করে আর মদ মাতালে মাতাল বলে’। বিহঙ্গের মতই ডানায় উড়াল হয়ে বাংলাদেশের পাবনা থেকে এই টরন্টো শহরে আসে এক অসামান্যা নৃত্যপটীয়সী মা সুলতানা হায়দারের, অসামান্যা মেয়ে অরুণা হায়দার। সংস্কৃতি চর্চার ধ্যান আর নিমগ্নতায় ধিরে ধিরে হয়ে উঠে ভালবাসা বিলাসিনী রাই আমাদের। যে পুর্বের সংস্কৃতি কে নিয়ে এসেছে পশ্চিমে। বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে কাজ করছে প্রতিদিন।মঞ্চে তার মুদ্রার ঝংকার আমার হৃদয়ে পুলক জাগায়। “যতো হস্তস্ততো দৃষ্টিষতো দৃষ্টিষতো মনঃ। যতো মনস্ততো ভাব যতো ভাবস্ততো রসঃ”। যেখানে হস্ত সেখানে দৃষ্টি,যেখানে দৃষ্টি সেখানেই মনের গতি,যেখানে মনের গতি সেখানেই ভাব আর সেখানেই রসের উৎপত্তি।

অরুণার নৃত্যশৈলির রসের ধারায় হৃদি ভেসে যায় অলকা নন্দায়। এই জলধারা টরন্টো শহরের বাঙালি কমিউনিটিতে,প্রবাহমান নদীর মতো ভাসিয়ে রেখেছে বাঙালি সংস্কৃতিকে, পনেরো বছরেরও অধিক সময় ধরে।কবিতা,নাটক, নৃত্য একি অঙ্গে এত রুপ মানায় অরুণাকে। বলছি অরুণা হায়দার এর কথা। বাংলাদেশ থিয়েটারের প্রযোজনায় লাশ নাটকে তার সাথে আমার প্রথম মঞ্চে অভিনয়, চেনা শিল্পী অরুণাকে, খুব কম সময়ে জানাতে গড়ায়। নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা তার নৃত্যাঙ্গন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে, বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন মঞ্চে তাদের প্রতিভার সাক্ষর রাখছে।নিজের জীবন এবং জীবিকার ব্যাস্ততা কে মানিয়ে, প্রজন্মকে শিল্পের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখায় প্রশিক্ষিত করতে সে নিবেদিত প্রাণ। বছর ব্যাপি অনুশীলন আর অধ্যবসায়ের সফলতম নিবেদন ২০১৯ সাউন্ড অফ ঘুংরু ছিল এক মাইলস্টোন। সমাজের হিংসা,ক্লেদ,বিদ্বেষে যখন মন খারাপের কফিনে বন্দি ভালবাসা, অরুণা তার সর্বজনীনতার মন্ত্রে সবার চৈতন্যে রস সঞ্চার করে সেই ভালবাসাকে জাগিয়ে রাখে। এই শহরের প্রতিটি সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও তাকে গ্রহণ করেছে পরম মমতায়। কিন্তু কখনো আমাদের কঠিন সময়ের মধ্যে পাড়ি দিতে হয় জীবনের ভ্রমণ। দুর্যোগ সময়কে থমকে দিতে চায় দুঃখ দিয়ে,জড়া দিয়ে,ব্যাধি দিয়ে। এখন পর্যন্ত আটটি কিমো থ্যারাপিতে আরুণা আজ ক্লান্ত, সামনে অপারেশন এবং এর পর রেডিয়েশন এটি দীর্ঘ এক বছরের প্রসেস।কিন্তু সে আতঙ্কিত নয়,সচেতন হয়ে লড়ছেন স্তন ক্যান্সারের সাথে।

শিল্পী অরুনা হায়দারের সাথে লেখক

নিয়তি পরীক্ষা নেয় তাদেরই যারা কঠিন সময় কে বহন করে সাঁতার কাটতে জানে উজানে। যে অনেকের দুঃখকে আপন করে জীবন কাটিয়েছে শক্তিশালী হয়ে উঠাতো তার নিয়মে। চিকিৎসার এই দীর্ঘ সময়কেও সময় দিতে হবে।আমি বিশ্বাস করি সময় নিয়ে যা কিছু তৈরি হয় তা লম্বা সময় পর্যন্ত বানিয়ে রাখে। প্রজন্মের অনেক শিশু কিশোরদের গুরু মা অরুণা একদিনে তৈরি হয়নি সাধনার মধ্যদিয়েই সংস্কৃতির অনেক শাখায় সে আমাদের আপনজন। তাই চিকিৎসার পুরো প্রসেস এর সময়টুকু ধৈর্য নিয়ে সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে হবে এবং তুমি পাড়বে। এখন তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন,তুমি নিঃসঙ্গ নও, শুধু এতদিন আমরা একসঙ্গে হেঁটেছি এখন আমরা তোমার জন্য হাঁটবো, আমরা সবাই তোমার পাশে লড়াকু সাহসিকা।

বিশ্বব্যাপি করোনা যুদ্ধে লড়ে চলা সম্মূখ যোদ্ধাদের একজন অরুণা। শুরু থেকেই কাজ করছিলেন টরন্টোর একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্টানে। নিজের জীবনে এই নতুন সংকট তাকে দুর্বল করেনি, নিজেকে ভিন্নভাবে প্রস্তুত করেছেন অরুণা। আমরা এই সাহসিকার পাশে আছি। এ যুদ্ধে জয়ি হবেন অরুণা, তার জীবনীশক্তি লাখো অরুণাকে প্রেরণা যোগাবে। ‘একদিন ঝড় থেমে যাবে পৃথিবী আবার শান্ত হবে’ মিলিত হবো গান,কবিতা,নুপুরের ছন্দে প্রাণের উৎসবে। আবার সাজবে মঞ্চ, পড়বে ঘুংরু তোমার কৃষ্ণকোমল পায়ে,দৃষ্টিতে আকৃষ্ট হবে মন, নবরসে চাঁদের অধরে যেন তোমার হাসি মুখটি সাজে। মায়ে-ঝিয়ে নানা আর দাদীতে বসে দর্শক সারিতে দেখবো আবার তোমার হাতের মুদ্রা আর পদদ্বয়ে ঘুংরুর ঝংকার,ফিরবে আবার ভালবাসা বিলাসিনী রাই আমাদের অরুণা হায়দার।

‘মদিরা ভরা দুই নয়নে, নাচের তুফান জাগেরে বুঝি তাই প্রেমের সাড়া জাগে, নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক পায়েলখানি বাজে,মাদল বাজে সেই সঙ্গেতে শ্যামা মেয়ে নাচে’।

হিমাদ্রী রয়। টরন্টো। সংস্কৃতি কর্মী, লেখক, আবৃত্তিকার।

Leave a Reply