সিঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিক পরিবহনে লরির ব্যবহার নিষিদ্ধের আহ্বান
লরিতে যাতায়াত করার ফলে প্রায় সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পতিত হন শ্রমিকরা।

সিঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিক পরিবহনে লরির ব্যবহার নিষিদ্ধের আহ্বান

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :
সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশেও অভিবাসী শ্রমিকদের কঠিন জীবন পার করতে হয়। অনেক সময় লরিতে যাতায়াত করার ফলে প্রায় সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পতিত হন শ্রমিকরা। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে ঘটে যাওয়া লরি দুর্ঘটনার পর অভিবাসী শ্রমিকদের পরিবহন সুযোগ-সুবিধা ও সুব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। ওই দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত ও ২০ জনের মতো শ্রমিক আহত হয়েছেন।

এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ১০ মে আসন্ন সংসদীয় অধিবেশনে শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন সুপারিশনামা উপস্থাপন করবেন এমপি এলেক্স ইয়াম। যার মধ্যে থাকছে লরিতে শ্রমিক যাতায়াত বন্ধ, সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিতকরণ সহ বাস এবং মিনিবাসের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব।

এর আগে ২০১২ সালেও তিনি এ প্রস্তাব তুলেছিলেন। যার ওপর প্রেসিডেন্ট হালিমা ইয়াকোব এমপি ক্রিস্টোফার দে সৌজা এবং সাবেক এমপি লাম পিন মিন ও এ বিষয়ে তাদের মতামত প্রদান করেন। পাশাপাশি ব্যরিস্টার মহল থেকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে।

তাঁরা প্রত্যেকে মনে করেন, লরি মূলত মালামাল স্থানান্তরের জন্য, মানুষ পরিবহনের বাহন নয়। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের মতো একটি উন্নত দেশে শ্রমিকদের অবহেলিত পরিবহন ব্যবস্থা কাম্য নয় বলেও তারা মতামত দেন। এছাড়াও ভুমি স্থানান্তর কতৃপক্ষের কাছে ১৫ হাজারের বেশি মানুষের স্বাক্ষর অনুমোদিত একটি আবেদনের মাধ্যমে এ বিষয়ে দাবি আরও জোরালো হয়।

অভিবাসী শ্রমিকদের পক্ষে তাদের আইনজীবী ড. স্টেফ্যানি চক লরিতে শ্রমিকদের এ যাতায়াত এর প্রতি বিরূপ মন্তব্য প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানানো হলেও তা বন্ধ হয়নি। এ ধরনের শ্রমিক যাতায়াতকে তিনি অনৈতিক ও অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরও বলেন, যেখানে বাহরাইন কিংবা অন্যান্য দেশে এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ আইন বিরোধী। সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে তা আসলেই মেনে নেওয়া যায় না।

বিভিন্ন গুণীজনদের মতামত ছাড়াও অভিবাসী কর্মীরা তাদের দুর্দশার বর্ণনা দিয়েছেন। মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন নামের একজন অভিবাসী কর্মী তার ডায়েরিতে লিখেছেন, মৃত্যুকে এভাবে বরণ করার জন্য একজন কর্মী হিসেবে আমি সর্বদা প্রস্তুত থাকি। আবার সাইফ তমাল এসব ট্রাকে চলাচলকে ‘ডেথ ট্র্যাপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এসব মতামত কিংবা চেষ্টার ফলে শ্রমিকদের নিজেদের অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তন হলেও, তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো অপরিবর্তনীয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা সমূহ পূর্ববর্তী বছরগুলোতে মৃত এবং আহতের সংখ্যা মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা সাপেক্ষে , দ্য স্ট্রেইট টাইমসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রায় ৫ হাজার কর্পোরেট মেম্বার সমন্বয়ে গঠিত সিঙ্গাপুর ম্যানুফ্যাকচারিং ফেডারেশন জানায়, কাজের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ হতে হবে পূর্বশর্ত। যদিও এক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে যায়।

সিঙ্গাপুর কন্ট্রাক্টর অ্যাসোসিয়েশন এ ব্যাপারে মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মীর মাথা পিছু খরচ বেড়ে যাবে এবং এ খরচ বেড়ে যাওয়ার দরুন বাস বা মিনিবাস চলাচলের বিষয়টিকে কিছুটা অবাস্তব বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকগুলোতে শ্রমিক যাতায়াতের ফলে শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোনো খরচ বহন করতে হয় না। কিন্তু বাস কিংবা মিনিবাস চালু করলে প্রত্যেকবার যাতায়াতে ৮০-২০০ ডলার খরচ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রমিকদের জন্য বাসসমূহ ক্রয় একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার।

মাল্টিন্যাশনাল সিঙ্গাপুর বেজ্ড একটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুই ইউ কোহ জানিয়েছেন, সময় এবং জায়গার ভিন্নতা বিবেচনায় বাসের ব্যবস্থা করা হলে তা কিছুটা ক্ষতি বয়ে আনবে। যেহেতু অধিকাংশ সিট ফাঁকা থেকে যাবে। বর্তমান কোভিড ১৯ মহামারীর কারণে তা আরও সম্ভব না। সাধারণ জনগণের ওপরও এটির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এছাড়া এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের ওপর মালিক সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে লরিতে সিট বেল্টের প্রস্তাবনা ও ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চালকদের দায়ী করে তাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি অব স্যোশাল সাইন্স এর অর্থনীতি বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ওয়াল্টার থেসিরা বলেন, এক্ষেত্রে চালকরা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখলেও পুরো ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ভিন্ন প্রকল্প বাদ দেয়া যাবে না। বাসের সিট কাঠামো এমন যে এটি যাত্রী শ্রমিকদের আহত বা মৃত্যুর সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। বাসগুলো সেভাবেই তৈরী করা হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এতসব দিক বিবেচনা করে মালামাল পরিবহনগুলো তৈরী হয়না যার ফলে এগুলো শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ নয়।

এটি স্পষ্ট যে মালিক সম্প্রদায় বা শিল্পকারখানা গুলো তাদের লাভ ক্ষতির হিসাব করছে। কোনোরকম ব্যয়ের বোঝা না বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা চালাতে উদ্যত। এছাড়া যেকোনো ধরনের পরিবর্তন তা আইনানুগ হওয়াও জরুরি। এসব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে অন্তর্ভুক্ত সব ধরনের কোম্পানিকে ভাগাভাগি করে ব্যয় বহন করার আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপত্তা অফিসার মি. আরজুন নাইর। শ্রমিকদের এ অসুবিধাকে মানবিক দিক দিয়ে বিবেচনা করতে বলেছেন তিনি।

Leave a Reply