স্বপ্নের লন্ডন  যেন  লোবান গন্ধনগর
করোনায় প্রয়াত দেবাশীষ দাস এর শেষকৃত্য

স্বপ্নের লন্ডন যেন লোবান গন্ধনগর

জুয়েল রাজ, লন্ডন থেকে

যুক্তরাজ্য বা ইউনাইটেড  কিংডম,  আমাদের কাছে যার আরেক নাম বিলেত। সেই বিলেত কেই আমরা আবার চিনি লন্ডন শহরের নামে। কখনো  পুরো বিলাতের সমর্থক হয়ে উঠে লন্ডন শহরটি। আলো চাকচিক্যময়,  লন্ডন শহর,  জেগে থাকা  এক শহর, যে শহর ঘুমায় না। সারা পৃথিবীর কাছে  আকর্ষণীয়  শহর লন্ডন,  সেই লন্ডন দিনে দিনে রূপ নিচ্ছে মৃত্যুপুরীতে। নিঃশব্দ আততায়ী  কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ। লকডাউন থেকে জরুরী অবস্থা  সব ব্যবস্থাই নিচ্ছে সরকার, কিন্ত কোন ভাবেই মৃত্যু এবং করোনার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত বছর মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশী অধ্যুষিত  রয়েল লন্ডন হাসপাতালে  সর্বপ্রথম  করোনা পজেটিভ একজনকে সনাক্ত করা হয়। সংবাদটি শেয়ার করে লিখেছিলাম ” “ভয় তো এইখানে যে,  আজরাইল বাড়ি চিনে গেল” সেই মজা করে লেখাটা যে কঠিন সত্যি হয়ে ফিরে আসবে আমি নিজেও কল্পনা করনি।  

লন্ডনে এখন চলছে তৃতীয় দফায় লকডাউন। প্রথম দফায় যখন লকডাউন দেয়া হয়েছিল। ছুটে চলা জীবনে যেন মানুষের এক ধরণের ছুটির আমেজ ছিল। মানুষ অনলাইনে আড্ডায় মেতে উঠেছিল। বাসায় বাসায় নানা রান্নার রেসেপি, ছেলে মেয়েদের নিয়ে ঘরোয়া পার্টি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও সেই উৎসবের ছোঁয়া এসে লাগত। 

মৃত্যু হার তখন খুব একটা ছিল না। কোবিড নিয়ে নানা ধরণের অবিশ্বাস ও ছিল মানুষের মধ্যে। বয়স্ক লোকজন যারা নানা দীর্ঘস্থায়ী  রোগে আক্রান্ত তাঁদের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল বেশী। ধরে নেয়া হয়েছিল কোবিড শুধু বয়স্ক, অসুস্থ্যদেরই ঘায়েল করবে। 

ব্রিটেনের গবেষকগণ নানা ধরণের সতর্কবার্তা  দিচ্ছিলেন  ৪ মিলিয়ন মান্যষ  মারা যাবে, লাশ কবর দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে না। এইসব গবেষণা কে আসলে সাধারণ মানুষ খুব একটা আমলে নেয় নাই। কিন্ত দিন শেষে গবেষকদের সেই ধারনাই সত্য হয়ে ফিরে এসেছে।  লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে,  ইতমধ্যে  সেই সব লাশের সৎকারে ও দেখা দিয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। 

শীতে করোনার দ্বিতীয়  ঢেউ ভয়ংকর ভাবে ফিরে আসবে বলে যে ভবিষ্যৎ  বাণী করেছিলেন গবেষকগণ,  তাই সত্যি হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ টি মৃত্যু সংবাদ ভেসে  উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতাজুড়ে। এখন আমার পরিচিত গন্ডির ভিতরে যদি এই অবস্থা হয়  বাইরের চিত্রটা সহজেই অনুমেয়।

এই কয়দিনে করোনার আক্রমণে যারা গত হয়েছেন,  ব্রিটেনের বাঙালি  কমিউনিটি বিনির্মাণে এদের অনেকের ছিল  উজ্জ্বল ভূমিকা।  চারপুরুষ আগে ভাগ্যন্বষণে যারা পাড়ি দিয়েছিলেন সাত সাগর তের নদী,  একদিন তাঁদের ফিরে যাওয়ার কথা ছিল মাতৃভূমি তে। 

কিন্তু আর ফেরা হয়ে উঠেনি।  সুন্দর জীবনের জন্য উত্তর প্রজন্মের জন্য ব্রিটেনেই স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেন। 

বর্ণবাদ বিরোধী  আন্দোলন করে নিজেদের অবস্থান  অধিকার কে সুসংহত করেছেন, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে  বিশ্বজনমত গঠনে রেখেছেন উজ্জ্বল ভূমিকা। সেই সব আলোকিত মানুষগুলো একে একে যোগ দিচ্ছেন মৃত্যুর মিছিলে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ আছেন সেখানে। মৃত্যু সংবাদগুলো আসে আর ভাবী, এই মানুষগুলো যদি বাংলাদেশে ফিরে যেতেন তাহলে কী বেঁচে থাকতেন!  

শুধু যে প্রবীনরা প্রাণ হারাচ্ছেন তাই নয়। এই মৃত্যুর মিছিলে তাঁদের উত্তর প্রজন্ম এসে যোগ হচ্ছে, যারা ব্রিটেনে নানা সন্মানজনক পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন। অজানা, অচেনা কত মৃত্যু সংবাদ আমাদের অজানা থেকে যাচ্ছে। প্রতিদিনের  লাশের সংখ্যার সাথে হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশী মোট মৃতের পরিসংখ্যান  আমাদের কারো কাছেই নাই। 

লকডাউন, জরুরী  অবস্থা চালু থাকার পরেও বাঙালি কমিউনিটির  অধিকাংশ  মানুষ রেস্টুরেন্টের  ব্যবসা এবং কাজ করার কারণে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হচ্ছেন। আমার নিজের ও ব্যবসার কারণে,  ইচ্ছা না থাকলেও প্রতিদিন ঘর  থেকে বের হতে হয়। ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার ও উপায় নেই। কারণ আমি সহ আর ও ১০ জনের রুটি রুজি জড়িত সেখানে। প্রতিদিন ঘরে ফিরে এসে মনে হয় আরেকটা দিন বেশী  পৃথিবীর আলো বাতাস দেখার সুযোগ পেলাম হয়তো। এ যেন অদৃশ্য আততায়ীর  সাথে জীবন নিয়ে লুকোচুরি  খেলা। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী  সময়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ ব্রিটেন ছেড়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ থিংকট্যাংক পরিসংখ্যান। শুধুমাত্র লন্ডনেই আট শতাংশ মানুষ কমে গেছে জানিয়েছে পরিসংখ্যান অফিস। সেখানে করোনা এবং ব্রেক্সিট দুটিই প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ মিলিয়ন  মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন মারা গেছেন প্রায় একলক্ষ।  যা গোটা ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।গত কয়েক সপ্তাহে ব্রিটেনে করোনায় মৃত্যু একলাফে ১৬ শতাংশ বেড়েছে। হাসপাতালে করোনা রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। যেমনটা দেখা গিয়েছিল এপ্রিলে করোনার প্রথম ঢেউয়ে।নতুন বৈশিষ্টের করোনার সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গত  শুক্রবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে যে দুটি টিকা প্রয়োগের কাজ চলছে, তা করোনার এই নতুন স্ট্রেইনকে ঘায়েল করতে সক্ষম। সাংবাদিক সম্মেলনে জনসন আরও বলেন, আমাদের বলা হয়েছে করোনার এই নতুন স্ট্রেইন যেমন দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়, তেমনই এতে মৃত্যুর হারও বেশি।এরমধ্যে বড় সংখ্যক নার্স নিজেরা আক্রান্ত বা আইসোলেসনে থাকার কারনে সংকট দিন দিন বেড়েই চলছে। 

বাঙালি  অধ্যুষিত রয়েল লন্ডন হাসপাতালে অনেক রোগীকে  ভেন্টিলেশনে চিকিৎসা দেয়ার পরও উন্নতি না হওয়ায়, বিশেষ উপায়ে,  যাকে বলা হয় ECMO (Extracorporeal Membrane Oxygenation) চিকিৎসার জন্য,  ৬০ মাইল দূরবর্তী অক্সফোর্ডের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে  এয়ার এম্বুলেন্স  যোগে পাঠানো হয়।বর্তমান পরিস্থিতিতেঅনু্র্ধ ৫০ বছরেরে রোগীদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়, সেসব রোগীদের ভাগ্য  ভাল থাকলে ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে সুস্থ হতে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৫-৭ হাজার পাউন্ড যা টাকার হিসাবে  দাঁড়ায় প্রায় ৫ থেকে ৮  লক্ষ টাকা। সেই হিসেবে কোটি টাকার উপর সরকারের খরচ হয় মাত্র একজন রোগীর জন্য।

বিবিসই  সহ স্থানীয় টেলিভিশন  চ্যানেলগুলো ও কিছু সংবাদ প্রচারিত করেছে, নার্সরা কাঁদছেন, ডাক্তাররা কাঁদছেন, কি যে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য! নার্স ফোন করে এক রোগীর বাসায় কান্না জড়িত কন্ঠে মৃত্যু সংবাদ জানাচ্ছেন। মর্গে জায়গা নেই, তৈরী হচ্ছে অস্থায়ী মর্গ,  সৎকারের বুকিং পেতে  শুরু হয়ে দীর্ঘ অপেক্ষাডেথ সার্টিফিকেট ইস্যুতেও সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।  

এবং সবচেয়ে অবাক করার বিষয় ব্রিটিশ বাঙালিদের ৪২ শতাংশ মানুষ করোনার টিকা নিতে অনাগ্রহী! অনেকে ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে আবার আস্থা রাখছেন না এই ভ্যাকসিনের উপর। ধর্মীয়, সামজিক এবং ব্যাবসায়ী নেতৃবৃন্দ  যদিও বিভিন্ন ভাবে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ  মানুষকে  টিকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ  করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু আশ্চর্যজনক  বিষয় হল, এত মৃত্যুও মানুষকে থামাতে পারছে না। পুলিশ বাসায় বাসায় গিয়ে জরিমানা আদায় করার ঘটনা ও ঘটছে। বাসার বাগানে, ড্রয়িং রুমে লুকিয়ে চাপিয়ে মানুষ নানা উৎসবের আয়োজন করতে ও থামছে না।  চার শত লোকের উপস্থিতে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে জরিমানা করেছে পুলিশ, সেখানে ইহুদী ধর্মীয় অনেক নেতা ও উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছে ব্রিটেনের  সংবাদ মাধ্যমগুলো। 

প্রাথমিক ভাবে  ৮০ বছরের উপরে বয়স্কদের ৮০ থেকে ৯০ ভাগকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিভাগ। দিবারাত্রি  ২৪ ঘন্টা টিকা কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতি  মিনিটে দুইশত মানুষকে টিকা দেয়া হচ্ছে পর্যায়ক্রমে  সেই পরিমাণ আরো বাড়ানো হচ্ছে। আগামী মার্চের মধ্যে সবাইকে এই টিকা কর্মসূচীর আওতায় নিয় আসার পরিকল্পনা সরকারের। 

কতশত প্রিয়জন, যারা বিদেশে বিভুইয়ে   পরম মমতায়  আপন করে নিয়েছেন, অনাত্মীয় থেকে পরম আত্মীয় হয়ে গেছেন। তাঁদের অনেককেই হারিয়েছি করোনার করাল থাবায়। এমন এক অবস্থা দাঁড়িয়েছে, এমন কোন পরিবার নাই যে আক্রান্ত হয়নি অথবা প্রিয়জনকে হারায় নি। আমরা প্রতিদিন শুধু সংখ্যায় হিসাব করছি। কিন্তু যারা হারিয়েছে তাঁরা জানে সেই বেদনা। এমন ও পরিবার আছে একাধিক ব্যাক্তিকে হারিয়েছেন। 

স্বামী ভেন্টিলেশনে আছেন  জানেন না স্ত্রী গত হয়েছেন। স্ত্রী জানেন না স্বামী গত হয়েছেন। মা জানেন না সন্তানের চির বিদায়ের সংবাদ।  যারা করোনা জয় করে ফিরে এসেছেন তাঁরা ও যে খুব নিরাপদ সেটিও ঠিক নয়। সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসা প্রতি ৮ জনের একজন ১৪০ দিনের ভিতর মারা যাচ্ছেন বলে বলা হচ্ছে। 

বর্তমান করোনা গ্রহনকালে একদিনে সর্বোচ্চ ১৮২০ জন মারা গিয়েছে।আগামী ১৫-৩০ দিন আরও খারাপ খবর অপেক্ষা করছে ব্রিটেন  বাসীর জন্য। আগামী সাতদিনে মৃতের সংখ্যাটা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে হয়তো।  

এসবের মাঝেই  মিল্টিন কিংস নামক এক শহরে,  করোনাক্রান্ত এক যুগলের বিবাহ সম্পন্ন হয় হাসপাতালে। ফুল, কেক সবই যোগার  করেন সেখানকার  কর্তব্যরত নার্স। তাঁরাই ডেকে আনে নিকটবতী চার্চের পাদ্রীকে। ছেলের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায় ভেন্টিলেশনে রাখা ছাড়া উপায় ছিল না। বাঁচার সম্ভাবনাও কম ছিল। তাই মেয়েটির অনুরোধ রাখতেই নার্সরা এই ব্যতিক্রমধর্মী বিয়ের আয়োজন করে। সুখবর যে দুজনেই এখন সুস্থতার পথে। 

ব্রিটেনে আসার পর, বিভিন্ন পরামর্শকদের উপদেশে৷  ব্যয়বহুল  এই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম ওয়লেসের আইরিশ সাগরের পাড়ের ছোট এক শহরে । একটু স্বচ্ছলতার আশায়। কিন্তু দুই বছরের বেশী সেখানে থাকতে পারিনি। সব ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলাম লন্ডনে।  বন্ধু  বান্ধব, পরিচিত পরিজনের মাঝখানে। সেই প্রিয় শহরকে এখন বড় অচেনা লাগছে। সবার মাঝেই যেন মৃত্যু ভয় গ্রাস করছে। দিনদিন যেন এক অভিশপ্ত  নগরে পরিণত হচ্ছে। অদ্ভুত এক নীরবতা, কান্নার শব্দ ও শোনার উপায় নেই,  চারপাশে  শুধু লোবান গন্ধ। 

Leave a Reply