স্বাবলম্বী
ছোটগল্প : স্বাবলম্বী

স্বাবলম্বী

তানভীয়া আক্তার কেয়া :

আমার মা কখনো আমার স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে দেয়নি , এমনকি জামা জুতো মোজা ও পরিয়ে দিতো না স্কুলে যাবার আগে কিন্তু আমি আমার বাচ্চা কে ভীষণ ভালো বাসি তাই রোজ সকালে নিজের হাতে নাস্তা খাইয়ে আবার জামা, জুতো পরিয়ে স্কুলেও দিয়ে আসি ।
আজ স্কুল শেষে আমার মেয়ে নানুর বাসায় যেতে চাইলো ,তাই তার আবদার মেটাতে তাকে নিয়েও গেলাম কারন আমার মায়ের বাসা কাছেই । মার বাসায় আমাদের জামা কাপড় রাখাই থাকে যেন হুটহাট চলে আসতে পারি।
যাইহোক , মায়ের বাসায় ঢুকেই আমি নিজ হাতে আমার একমাত্র কণ্যার সকল পোশাক বদলে দেয়ার সময়, আমার মা দেখেই ,বলে উঠলো,
–তোর মেয়ের বয়স কত হলোরে, রেনু?
— কেন মা? তুমি জানো না? নয় বছর তো শেষ হয়ে যাচ্ছে।
— সে তো আমি ভালোভাবেই জানি । তোর মনে আছে নাকি তাই জানতে চাইলাম?
— আমি মা হয়ে জানবো না ,কি যে বলো না ,মা , তুমি?
— তাহলে  এখন ও ওর সবকিছু তোর করে দিতে হয় কেন? ওকে তো সাবলম্বীই হতে দিবি না? তোরাও তো দুই ভাই বোন ছিলি ,আমি কি পারতাম না তোদের সব কিছু করে দিতে ? পারতাম কিন্তু দিতাম না কারন যেন তোরা নিজের কাজ নিজেই করতে পারিস। কারো মুখাপেক্ষী হতে না হয় । কিংবা আমার কিছু হলে তোরা যেন একদম অথর্ব হয়ে না যাস। 
— মা, ও শিখে যাবে বড় হতে হতে।
— যাবে তো অবশ্যই কিন্তু শেখার সুযোগ টা তো তোকেই করে দিতে হবে। অতিরিক্ত ভালোবাসা ও কিন্তু সন্তান কে বিপথগামী করে তোলে জানিসই তো সব কিছু কিন্তু মানিস না, এটাই সমস্যা । দশ বছর বয়সে তোকে আমি রান্না ঘরে ঢুকিয়ে ছিলাম টুকটাক খাবার যেন নিজেই তৈরি করতে পারিস সেজন্য । আর আমি অসুস্থ থাকলে যেন তোদের নিজেদের কোনো সমস্যা না হয় । তোর ভাই টাকে ও সব শিখিয়েছিলাম বলে আজ বিদেশে একা একা সবকিছুই করতে পারছে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। ছেলে মেয়ে সবারই ছোট থেকেই সবকিছু শিখিয়ে দিলে আর বড় হয়ে কাজ নিয়ে এতো ঝামেলা হয়না।
আমার যেন হঠাৎ টনক নড়ে উঠলো,আসলেই তো মা আমার সব কাজ একটু একটু করে শিখিয়েছিলো সেই ছোট্ট থেকে আর আমি আমার মেয়ে কে একটা কাজ ও করতে দেইনা অতিরিক্ত আদর ভালোবাসা দেখাতে , স্কুলের শিক্ষকরাও প্যারেন্টস মিটিং এ আজকাল মাঝে মাঝে বলে দেয় কিন্তু পাত্তা দেইনি কারন এসব কথার কথা তো বলেই । 
আজ আমার কিছু হলে আমার সন্তান একদম অথর্ব হয়ে যাবে, কিচ্ছু করতে পারবে না।
ভাবতেই বুকের মধ্যে কেঁপে উঠলো,গতবছর যখন আমার জ্বর হয়েছিলো , মেয়েটা নিজের হাতে তো খেতে পারতোই না আবার বাসার কারো হাতে খেতে ও চাইতো না। ওর বাবা অনেক কষ্টে একটু আধটু খাইয়ে ছিলো।ব্যাপারটা সাময়িক ছিলো বলে সমস্যা হয়তো অতোটা হয়নি।
তবে কখন কি হয়ে যায়? মানুষের জীবনের তো কোন গ্যারান্টি নেয় । ওকে নিজে বেঁচে থাকা শেখাতে হবে , জীবনে যে কোনো সময় কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে সব কিছু বোঝাতে হবে । আর সময় নষ্ট করলে হবে না।
আর না ,আদর ভালোবাসার ও একটা নির্দিষ্ট সীমা থাকা দরকার। সন্তানকে সঠিক ভাবে শিক্ষা দিতে না পারলে সন্তানের ই ক্ষতি হবে।আর তখন নিজেরা ও বিপদে পড়বো আর সন্তান কে দোষারোপ করবো।
অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না ,সন্তান এর ভালো ভবিষ্যতের জন্য মাঝে মাঝে কঠোর ও হতে হয় যেটা আমার মা সেই কবেই শিখিয়েছে অথচ বেমালুম ভুলে বসে আছি।
শুধু আমি কেন ? আমরা অনেকেই ভুলে বসে আছি সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসার মোহে। স্কুলের ভাবীদের সাথে গল্প করতে বসলেই বোঝা যায়, আদরে আদরে আমরা বাচ্চা গুলো কে কি অথর্ব ই না তৈরি করছি নিজেদের অজান্তেই।

Leave a Reply