স্মরণ : মানিক লাল তালুকদার।

স্মরণ : মানিক লাল তালুকদার।

সুশান্ত দাস প্রশান্ত, লন্ডন থেকে।

পুরো নাম মানিক লাল তালুকদার। জন্মসূত্রে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার হলেও ছাত্রজীবন থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটিয়েছেন সিলেটে। স্থায়ি নিবাসও করেছেন সিলেটে শহরের বাগবাড়িতে। আট ভাই ও এক বড় বোনের মাঝে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

সত্তর দশকে রেকর্ড সংখ্যক লেটার মার্কস নিয়ে সিলেট এমসি কলেজে অধ্যায়নের পাশাপাশি ব্যবসায় জড়িয়ে, হয়ে যান সিলেট শহরের অধিবাসী। তারমানে এই নয় বাড়ি বিচ্ছিন্ন। বাড়িতে দূর্গাপূজা,বিয়ে সাদি আচার অনুষ্ঠানে সব ভাই-বান্ধব মিলে হতেন উপস্থিত। বাবা ছিলেন ধনাঢ্য ব্যক্তিত্ব বাবু সুরেশ তালুকদার। গ্রামের নাম ছিল জয়শ্রী সুখাইড় বাগবাড়ী। হাইস্কুলে পড়ার সময়ে গরু রাখাল নিয়ে লজিং বাড়িতে থাকতেন। কারন খাওয়াতে কাঁসার বাটিতে হাত ডুবিয়ে দুধ পান ও শাইল ধানের আতপ চালের ভাতের সাথে ঘি না-খেলে খাওয়াতে রুচি হতো না,পড়ায় মন বসতো না। তাই তাঐ বাবু বাধ্য হয়ে একটি বাচুর সহ গরু এবং একজন রাখাল উনার লজিং বাড়িতে দিয়ে রাখতেন।মানিক বাবুর ব্যবসা ছিল তখনকার সিলেটের লামাবাজার পয়েন্টে। নাম ছিল ‘মুন লাইট ট্র্যাভেলস’।

অত:পর ডিলাক্স ফার্নিসার,স্টীল এজেন্ট,বিদেশী গরুর ফার্ম সহ করেছেন অনেক কিছু। এতোসব ব্যবসার মধ্যে এক সময়ে সব কিছু হারিয়ে হয়ে যান নি:স্ব।তখনকার সিলেট বলার কারন হলো ঐ সময়টাতে(আশির দশক)উনি থাকতেন কাজল শাহ্ অঞ্চলে। তখন কাজল হতে মেডিকেলে যেতে মূল রাস্তা ঘুরে আজকের মতো যাওয়া লাগতো না। সরাসরি মেডিকেলের বাউন্ডারী ওয়ালের নীচ দিয়ে মানুষ যাতায়াত করতে পারতো। নির্দিষ্ট গুটা কয়েক বাসা ছাড়া সারা কাজল শাহ্ ছিল উর্বর ধানী জমি।কাজল শাহ হতে রিকাবী বাজার(রিকাই বাজার)হয়ে লামা বাজার আসলে চোখে পড়ার মতো জুগলটিলার আখড়া(বর্তমানে ইস্কন)মধুশহীদ মাজার,খোলা পুলিশ লাইন(কোন ওয়াল ছিল না),বাঁশের তৈরি ধারার ছাউনি দিয়ে রিকাই বাজারের সবজি বাজার,একটা পুরাতন ব্যাকারীর ফেক্টরী,আনোয়ার রেস্টুরেন্ট,ঠিক এর বিপরীতে স্টেডিয়ামের মূল গেইট ও গ্যালারী,রাস্তা ঘেষা দুতলায় সৈকত রেস্টুরেন্ট(তখনের সময়ে স্ট্যান্ডার্ড রেস্টুরেন্ট)এরপর মূল রাস্তার পূর্বপ্বার্শে বাঁশের আড়ত ও মদন মোহন কলেজের পুরাতন (মাঝে-একটু ভাজ/বাঁকা প্রকৃতির)শহীদ মিনার।

অত:পর লামাবাজার প্রায় পয়েন্টে পূর্বদিকে শ্যামল ভিডিও,মুন ট্রেইলার্স এবং পশ্চিম প্বার্শে ছিল ‘মুন লাইট ট্র্যাভেলস’ ও আরেকটি প্রতিষ্ঠান ব্যাকারী ফেক্টরী যার নাম ছিল মনেহয় সিঁতারা। লামা বাজার পয়েন্ট হতে একটি পূর্বদিকে জল্লারপাড় রোডের দিকে আগালেই হাতের বাম কোনে পড়তো জালালাবাদ ব্যান্ডপার্টি।ছাত্রা জীবন থেকে এই মুন লাইট ট্র্যাভেলস ব্যবসায় জড়িত থাকায় এই লামাবাজার অঞ্চলের স্থায়ী ব্যবসায়ীদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক হয়ে যায়। একে অপরের আত্মীয়র সাথে হয়ে উঠে পরিচিত। কোন এক দুপুরে মানিক বাবুর সহকারী মুশাহিদ সাহেবের সংগে যাওয়া পড়ে ট্র্যাভেলসে। তখন ছিলাম অনেক ছোট শিশু বয়স। ট্র্যাভেলসে ঢুকার পর মূল অফিসের ভিতরে ঠিক মানিক বাবুর কাছে আরেকটা হাইফাই বড় ছোফার চেয়ারে আমাকে বসানো হলো। নানান ধরনের খাবার বিস্কিট,মিষ্টি,চানাচুর দিয়ে আমার টেবিলের সামনা ভরিয়ে দিল।

এমন সময় মানিক বাবুর কোন এক বন্ধু আমার পরিচিতি বাবুর ‘শ্যালক’ পরিচিত করায় আমিতো ক্ষেপে যাই। আমাকে সবাই অনুনয় বিনয় করেও ক্ষেপা হতে সরাতে পারেনি। অবশেষে মুশাহিদ আবার আরেকটা রিক্সায় আমাকে বাসায় দিয়ে যান। সন্ধ্যায় মানিক বাবু বাসায় ফিরলে আমাকে শ্যালক হিসাবে গালি দেওয়ার জন্য দু:খ প্রকাশ করে রাতে খাবারের সময়ে এক টুকরো বড় মাছের ভাজা খাওয়াইয়ে মিমাংসা করলেন।তাঁর বড় সন্তান মানসী তালুকদার (অ্যানী)জন্মের সময় কাজল শাহর বাসাতে হয়েছিল সিপিবি,ছাত্র ইউনিয়নের এক ঝাঁক মেডিকেল ডাক্তারদের(ডা:নুরুল আম্বিয়া,ডা:শিকদার অনেকের নাম মনে নেই)আনন্দবেশ।

মানসীর জন্ম থেকে ছইট্টারা( ছয় দিন গতে নাম রাখার দিন)পরে ত্রিশদিনের দিন ব্রতের আলোকে মহা আড়ষ্টে হয় ভোজন সেবা।মানিক বাবু আমাদের বাড়ির দামান হয় আশি দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তখন তাঁকে দামান হিসাবে নির্বাচিত করার দায়িত্ব পড়ে আমাদের পূর্বর্তী ৩য় প্রজন্ম মানে বাবার বাপ-কাকাগনের মধ্য থেকে বাবার কাকা ভাটির ধনাঢ্য খ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্র বাবু মহেন্দ্র মাস্টার মহাজনের উপড়(ভাটির অঞ্চলের আলোকবর্তিকা গিরিধর হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা-১৯৫৮)।

উনি মানিক বাবুকে দেখে সিলেট হতে ফিরে আসার পর বাড়িতে বাবা-কাকারা জানতে চাইলে বললেন দ্যাখ তোরা – ওর সাথে কথা-বার্তা,জ্ঞান-গরীমা,আচার-ব্যবহারের কথা আর কি-বলবো! ব্যাটা(মানিক বাবু)ছোট-মোট হলেও ওযেনো নাগা-মরিচের মতো বাত্তি । আর তোরা যে আমারে মাজন মাজন (মহাজন) বলে ডাকিস, হে(মানিক বাবু) রাতে আমারে যে একটা বিছানায় ঘুম পাতাইছে তাতো আমার ছায়ার হাওরের এক কোনা বেচলেও আমি একটা তার মতো বিছানা কিনতে পারতাম না”! এমন সময় বাবা জিজ্ঞাসা করলেন তাহলে কাকাবু তাঁর কাছে মেয়ে বিয়ে দেওয়া যায়? ধমকের সুরে বললেন ‘বিয়ে দেওয়া যায় আবার জিগায়? বল আগে এই ছেলে বাড়িতে আসলে কিভাবে ইজ্জ্বত দেওয়া যায় সেটা ভাব। এই তো ভরা বর্ষার ভাসান হাওরে শ্রাবনের শেষদিনে মানিক বাবু যথাযোগ্য মর্যাদায় লঞ্চ যোগে বাড়ির দামান হিসাবে অভিহিত হন।

মহাজন মহেন্দ্র বাবুর পরিপূরক নাতিন জামাই সেজে ঐ জালালাবাদ ব্যান্ডপার্টি নিয়ে হাওরে ঢাক-ঢোল পিঠিয়ে চার গ্রামের স্নান(আঙ্গারুয়া,সুখলাইন,হরিনগড় ও নওয়াগাঁও) যথা সাদরে মিষ্টি আপ্যায়ন করে ঠিক মহেন্দ্র মাস্টরের ইজ্জ্বত কে জাহির করলেন।আজ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বার বার অতীতকে নাড়া দিচ্ছে । আমার কলেজ জীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপূর্ণ জীবনটাই উনার কাছ থেকে কাটিয়েছি। শুধু আমাদের পরিবারের দিক থেকে নয় উনার পরিবারের দিক হতেও কাউকে কোন কিছুতে “না” বলতে শুনিনি। ছোট বেলায় টিভিতে ধারা বাহিক সিরিয়্যাল ম্যাকগাইভার দেখতে উনি আমাকে বুঝিয়ে দিতেন। আশির দশকের শেষ বা নব্ব্ই দশকের হুমায়ুন আহমদের আলোচিত নাটক সহ ৭৫এর ১৫ই আগষ্ট,জিয়া, এরশাদের রাজনীতি নিয়ে আমাদের চুল ছেড়া বিশ্লেষন করে শুনাতেন। ছিলেন রাজনীতি সচেতন ব্যবসায়ি।

সত্যি অর্থে ছিলেন বিশাল মনের মানুষ ও ভদ্র। মানবিকতায় ছিলেন উন্নত মাফকাঠিকর। দেখতাম মধ্য বয়সে টাই,স্যাুট কোট পড়তে বেশ ভাল বাসতেন। কাজের প্রতি ছিলেন যত্নশীল। আমি যে দু-একজন হতে কাজের প্রতি যত্নশীলতা শিখেছি তাঁদের মধ্যে একজন ডাক্তার জালাল(স্যার) ও অন্যজন ছিলেন মানিক বাবু। তিনি অবসরে প্রচুর বই পড়তেন। বাংলা ও ইংরেজীতে হাতের লেখা ছিল ভীষন সুন্দর। স্মার্টলি বলতে পারতেন ইংলিশ। সিগারেট পছন্দ করতেন গোল্ডলিফ যদিও অবশেষে ছেড়ে দিয়েছেন।ক্রিকেট খেলা ভীষন প্রিয় হলেও দাবা ও তাস খেলায়ও ছিলেন পটু। জীবনের ভাবটা ছিল কবি মাইকেলের মতো। ভাল থাকুন মানিক বাবু!

Leave a Reply