১৫ জনের দলে বেঁচে ছিল মাত্র দুজন
মরুভূমিতে যখন কেউ পড়ে যায়, বাকিরা তাকে ছেড়ে এগিয়ে যায়। একটা সময়ের পর আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পড়ে যেতে থাকে।

১৫ জনের দলে বেঁচে ছিল মাত্র দুজন

ইমিগ্রেশন নিউজ ডেস্ক :

আবুবকরের বয়স তখন মাত্র ১৫। উন্নত জীবনের আশায় একদিন ঘর ছাড়ে। এরপরের কাহিনি এক ভয়াবহ সময় পাড়ির, মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার। গিনির নাগরিক এই কিশোর পাড়ি দেয় এক বিপদসংকুল পথ। যে পথে প্রতি মুহূর্তে ছিল মত্যুর হাতছানি। দেখেছে সঙ্গীদের করুন মৃত্যু। আলজেরিয়া, লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির লাম্পেদুসায় এসে পৌঁছায় সে। এর মধ্যে লিবিয়ার মরুভূমিতে ১৫ জনের দল হয়ে যায় মাত্র দুজন। তা সৌভাগ্য সে বেঁচে গিয়েছিল, ব্যস এইটুকু।

যেভাবে মৃত্যুর পথে

২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে আলজেরিয়ার মরুভূমি হয়ে লিবিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু। পাঁচ-ছয়টা গাড়ি মিলিয়ে আমরা মোট ৯০ জন ছিলাম। দালালরা আমাদের বলে, লিবিয়া সীমান্তে পৌঁছাতে বড়জোর একদিন লাগবে। তারা বলে ‘আমরা আজ রাতে বা কাল সকালে পৌঁছাবো।’ আমাদের শুধু কিছু খাবার পানি আর বিস্কুট নিতে বলে তারা। কিন্তু আমাদের মরুভূমিতে দুই সপ্তাহ কাটাতে হয়েছে। দালালরা আমাদের মিথ্যা বলেছিল।

সারাদিন আমরা গাড়ি চালাতাম। আর যখন রাত হতো, তখন দালালরা আমাদের লুকিয়ে রেখে চলে যেত। পরের দিন সকাল ৬টায় আসত। এভাবেই দুই সপ্তাহ চলেছি আমরা। ৯০ জনের মধ্যে ৬০জন আগে টাকা দেয়নি বলেই দালালরা আমাদের জন্য ফিরে আসত। যদি টাকাটা আমরা আগেই দিয়ে দিতাম, তাহলে আর তারা আমাদের জন্য আসতো না, ছেড়ে চলে যেত।

আমরা জানিনা কত কত কিলোমিটার আমাদের চলতে হয়েছে, কয়েক হাজার তো হবেই। আমার মনে হয় সেটা দালালরাও নিশ্চিতভাবে জানত না, কারণ দূরত্বগুলো তাদেরও জানা ছিল না।

একদিন দালাল ‍উধাও

এক সকালে, যখন আমরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পথ চলছি, দালালরা আমাদের নিতে আসেনি। তার ঠিক আগেই আমরা সীমান্ত পার করানোর টাকার অর্ধেক দিয়ে ফেলেছিলাম। তখন পথ দেখানোর জন্য কেউ না থাকায় আমরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যাই। কেউ কেউ ফিরে যেতে চাইছিল। আমি পায়ে হেঁটেই এগিয়ে যেতে চাইলাম। আমাদের বলা হয়েছিল, ‘১৫ জনের বেশি একসাথে কখনোই হেঁটে যাওয়া উচিত নয়, তাতে করে ধরা পড়া সম্ভাবনা বেশি’। তাই আমরা ১৫ জন একসাথে হাঁটতে শুরু করলাম।

টানা পাঁচদিন আমরা হেঁটেছি। সকাল ১১টা পর্যন্ত টানা হেঁটে আমরা বিশ্রামের জন্য থামতাম। পথে একটা ছোট গ্রাম পেরোই আমরা, যেখান থেকে পানি নিয়ে আমরা আবার চলতে শুরু করি। আমার কাছে একটা ছোট ব্যাগ ছিল যেখানে আমি শুধু দুই বোতল পানি নিতে পারতাম। খাওয়ার জন্য কিছু ছিলো না। মরুভূমিতে দিনের বেলা খুব বেশি গরম পড়তো আর রাতের বেলা প্রচণ্ড শীত। খুব বেশি ঠাণ্ডা পড়লে আমরা একে অন্যের কাপড় পুড়িয়ে নিজেদের উষ্ণ রাখতাম। আমি আমার একটা জ্যাকেট ও একজোড়া প্যান্ট পুড়িয়েছি।

যখন সঙ্গীদের ছেড়ে যেতে হয়

একটা সময়ের পর আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পড়ে যেতে থাকে। কী কারণে তা হয়েছিল, অনাহার, ক্লান্তি না কি জ্বর, তা জানি না। মরুভূমিতে যখন কেউ পড়ে যায়, বাকিরা তাকে ছেড়ে এগিয়ে যায়। মাঝে মাঝে, সকালের দিকে, কেউ কেউ আমাদের বলতো যে তারা আর উঠতে পারছে না। তারা আমাদের বলতো তাদের ছাড়াই এগিয়ে যেতে। আর আপনি সেই সময়ে কোনো সাহায্যও করতে পারবেন না তাদের। আমি জানতাম যে আমার সাথে এমনটা হলে, আমাকেও তারা ছেড়ে যেত। কোনো সাহায্য ছাড়া এভাবে কাউকে পড়ে যেতে দেখা সত্যিই কষ্টকর। আমার এখনও সেই দৃশ্যগুলো স্বপ্নে আসে।

যারা মারা গিয়েছিল তারা কারা, সেটা আমার জানা নেই। আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিল, হয়ত ১৮-১৯ বছর বয়সি, বাকিদের বয়স ২০ বছর৷ গিনি, আইভরি কোস্ট ও বিশ্বের আরো বহু জায়গা থেকে তারা এসেছিল। কিন্তু আমি অত জানি না, কারণ আমরা অত কথা বলতাম না। মরুভূমিতে শক্তি নষ্ট করার কোনো মানে হয়না, কারণ বেশি কথা বললে শক্তি খরচ হবে। মরুভূমিতে কোনো মানবিকতা নেই।

শেষ দিনে ১৫ জনের মধ্যে আমি ছাড়া আর একজন বেঁচে ছিল ৷ তার সাথে এবিষয়ে আমি কোনো কথা বলিনি, কারণ আমরা দুজনেই খুব চিন্তিত ও ক্লান্ত ছিলাম। আমরা শুধু একটা থাকার জায়গার খোঁজ করছিলাম, যেখানে কোনো খাবার পাওয়া যাবে। দালালরা অবশেষে আমাদের লিবিয়াতে নিয়ে আসে, সেখানে আমাদের মারধোর করে জেলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে আমরা খাবার জন্য রুটি ও পানি পেয়েছিলাম।

আবুবকর এখন ফ্রান্সে

শরণার্থী আবুবকরের বয়স এখন ২০৷ এখন আছেন ফ্রান্সের মার্সাই শহরে। বর্তমানে তিনি ইলেক্ট্রিশিয়ান হওয়ার জন্য একটি কোর্সে পড়াশোনা করছেন। আবুবকর জার্মানিতে দুই বছর থাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে। এখন আবুবকরের একটাই ইচ্ছা – ফ্রান্সের সমাজে মিশে গিয়ে নিজের ব্যবসা দাঁড় করানো। পাশাপাশি, অবসর সময়ে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা করে এমন একটি সংস্থায় উপ-সভাপতির কাজও করে আবুবকর। বর্তমানে আবুবকর একটি সাধারণ জীবন কাটায়, অন্যদের দিকেও নজর দেয়।

(তথ্যসূত্র ইনফো মাইগ্রেন্টস)

Leave a Reply